—বললে আপনি যদি আর রত্নভাণ্ডারের খোঁজে না যান। তাই এ খবর আপনার ৩ কাছে গোপন করে রাখা হয়েছে। রোক্কা বলল।
ফ্রান্সিস দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল। রোক্কাকে পাহারাদার দুই সৈন্য ইঙ্গিতে অপেক্ষা করতে বলে ছুটে চলল সিনার্কার গাড়ির দিকে। সিনার্কা অমাত্যরা তখন রত্নভাণ্ডারের চিন্তায় মগ্ন। সবার মনেই সংশয়—এই বিদেশিটা কি রানী ইসাবেলার রত্নভাণ্ডার উদ্ধার করতে পারবে?
তখনই ফ্রান্সিস সিনাৰ্কার কাছে এসে দাঁড়াল। বলল—মহামান্য রাজা—আপনি এটা কী করলেন?
—কেন? কী হয়েছে? সিনার্কা ঠিক বুঝতে না পেরে বলল।
—আপনি রাজকুমারী আর কামেরাতকে কয়েদঘরে বন্দি করে রেখেছেন।
—হ্যাঁ হ্যাঁ। সিনার্কা বলল। ঠিক আছে রত্নভাণ্ডার উদ্ধার হলেই ওদের ছেড়ে দেওয়া হবে।
—না মহামান্য রাজা এতে আমার উদ্যম নষ্ট হয়ে যাবে। আমার বিনীত অনুরোধ রাজকুমারী আর কামেরাতকে আমার এই প্রচেষ্টা দেখতে দিন। পাহারাদার কয়েকজন ওদের পাহারা দিক। তারপর রত্নভাণ্ডার পেলে ওদের মুক্তি দেবেন। ফ্রান্সিস বলল।
—আর না পেলে? সিনার্কা বলল।
—তখন আবার আমাদের বন্দি করে রাখবেন। ফ্রান্সিস বলল। সিনার্কা একটু ভেবে নিয়ে পাশে বসা অমাত্যদের সব বলল। কী কথাবার্তা হল তাদের মধ্যে ফ্রান্সিস বুঝল না। সিনার্কা এবার বলল—দলপতিকে পাঠাচ্ছি রাজকুমারী আর কামেরাতকে নিয়ে আসতে। কিন্তু সঙ্গে প্রহরী থাকবে চারজন।
—বেশ তাহলে ওদের নিয়ে আসার ব্যবস্থা করুন মহামান্য রাজা। ফ্রান্সিস বলল। ফ্রান্সিস বার বার সিনার্কাকে মহামান্য রাজা বলাতে সিনার্কা খুশিতে আটখানা। সিনার্কা দলপতিকে ডেকে হুকুম দিল।
ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে রইল। কিছুক্ষণ পরে মারিয়ার হাত ধরে ধরে কামেরাত এলো। ফ্রান্সিস দেখল মারিয়ার চোখমুখের সেই ঔজ্জ্বল্য নেই। কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। ফ্রান্সিসের মন দুঃখার্ত হল। কিন্তু ও মন শক্ত করল। সকলের মুক্তি সম্পূর্ণ নির্ভর করছে ফ্রান্সিসের পরিকল্পনার ওপর। এখন কারো কোনো কষ্টের কথা ভাবতে গেলে চলবে না। সব দুঃখকষ্ট সহ্য করতে হবে। কিন্তু ফ্রান্সিসকে দেখে মারিয়া সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ল মাথা নিচু করল। ফ্রান্সিস বুঝল—মারিয়ার সঙ্গে যে ব্যবহার করতে ও বাধ্য হয়েছে তাতে মারিয়াকে এখন সামলানো মুস্কিল হবে। তাই ফ্রান্সিস মারিয়ার দিকে দু’হাত বাড়িয়ে বলে উঠল—মারিয়া আমাকে ক্ষমা করো। মারিয়া অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। ফ্রান্সিস বলল—আমি এখন যা বলছি সেইভাবে কাজ করো। লক্ষ্মীটি এখন রাগ করে থাকার সময় নয়। আমি কামেরাতকে নির্দেশ দিতাম কিন্তু সেটা দিতে গেলে আমাকে স্পেনীয় ভাষায় দিতে হবে। সিনার্কা বা অমাত্যরা সব বুঝে নেবে। আমাদের বিপদই বাড়বে তাতে। তাই তোমাকে আমাদের মাতৃভাষায় বলছি যা কেউ বুঝবে না। ফ্রান্সিস থামল। লক্ষ্য করল মারিয়া যেন একটু শান্ত হল। ফ্রান্সিস স্বস্তির শ্বাস ছাড়ল। বলল—আমি যখন রোক্কাকে নিয়ে ঐ ভূতুড়ে ঘরটায় ঢুকবো তখন সবাই ঐ দিকেই তাকিয়ে থাকবে। তোমাদের পাহারাদাররাও অন্যমনস্ক হবে। ঠিক তখনই ভিড়ের মধ্যে তুমি আর কামারেত একসঙ্গে মিশে মিশে থাকবে। যখন আমরা ঘরটায় ঢুকবো তখন পাহারাদাররা অন্যমনস্ক হবেই। ঠিক তখনই তোমরা ভিড়ের মধ্যে দিয়ে পালাবে। কামেরাতকে নিয়ে জাহাজঘাটায় পালিয়ে যাবে। দু’জনেই আমাদের জাহাজে উঠবে। আমাদের জন্যে অপেক্ষা করবে। আমরা কাজ সেরে ঠিক জাহাজে ফিরবো। এই নিয়ে একেবারে দুশ্চিন্তা করবে না। তুমি এখনও সম্পূর্ণ, সুস্থ নও। সাবধানে থাকবে। ব্যস আর কিছু বলার নেই। শুধু শেষ অনুরোধ আমার ওপর বিশ্বাস রেখো।
ফ্রান্সিস কথাটা শেষ করে মারিয়ার দিকে তাকাল। দেখল—মারিয়ার চোখেমুখে খুশির আভা। ফ্রান্সিস অনেকটা নিশ্চিন্ত হল। ওর এত কথা চারপাশের লোকেরা পাহারাদাররা সিনার্কা আর অমাত্যরা কিছুই বুঝল না।
ফ্রান্সিস রোক্কার কাছে এলো। বলল চলুন। মারিয়া মৃদুস্বরে ফ্রান্সিসের সব কথা কামেরাতকে বুঝিয়ে বলল।
খাদটার কাছে এলো দুজনে। ফ্রান্সিস পাহারাদার দু’জন সৈন্যের মুখের দিকে তাকাল। বুঝল—ওরা স্পেনীয় ভাষায় কথাবার্তা কিছুই বোঝে নি। ফ্রান্সিস একজন পাহারাদার সৈন্যের কোমরের খাপ থেকে এক ঝট্কা তলোয়ারটা খুলে নিল। অন্য সৈন্যটি সঙ্গে সঙ্গে তলোয়ার বের করল। ফ্রান্সিস হেসে হাত তুলে ওকে শান্ত করল। তলোয়ারটা দিয়ে রোক্কার হাতবাঁধা দড়িটা কেটে ফেলল। তলোয়ার ফিরিয়ে দিল।
ফ্রান্সিস বলল—রোক্কা—আপনাকে একটু কষ্টকরে দড়ি বেয়ে কিছুটা উঠতে হবে। পারবেন তো?
—হ্যাঁ পারবো-রোক্কা বলল—এখন আমি শরীরে মনে অনেক জোর পাচ্ছি।
দু’জনে খাদ থেকে দড়ি বেয়ে বেয়ে উঠতে লাগল। অসুস্থ শরীর নিয়েও রোক্কা দমল না। দড়ি ধরে উঠতে গিয়ে দাঁত চেপে কষ্ট, কাটা জায়গার জ্বালা সহ্য করল। দড়ির ঘন্টায় গালে কাটা জায়গাগুলো থেকে রক্ত পড়তে লাগল।
পাথরের ভাঙা পাটার ওপর দিয়ে সন্তর্পণে হেঁটে হেঁটে চলল দুজনে। প্রথমে ফ্রান্সিস পেছনে রোক্কা। ওদের দেখাদেখি পাহারাদার দুজনও উঠতে লাগল। পাহারাদার দুজন বুঝল—রোক্কাকে নজরের বাইরে যেতে দেওয়া হবে না। তাহলে সুযোগ পেয়ে রোক্কা নিশ্চয়ই পালাবে।
