হাঁপাতে হাঁপাতে ফ্রান্সিস বলল—তোমরা এখানে থাকো। আমি সিনাৰ্কার সঙ্গে। একটা কাজের কথা সেরে আসি।
ফ্রান্সিস আবার ছাতের ভাঙা অংশের পাথরের পাটাতনের ওপর সাবধানে পা রেখে রেখে খাদটার গাছের ডাল ধরে ধরে নেমে এলো।
চলল সিনার্কার কাছে। সিনার্কা তখনও দু’জন অমাত্যকে নিয়ে গাড়িতে বসে আছে। ফ্রান্সিস তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বলল—মাননীয় সিনার্কা আমি দু’টো ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজেও রানী ইসাবেলার রত্নপেটিকা পাইনি।
—কিন্তু তোমার কাছে তো রানী ইসাবেলার আঁকা নকশাটা রয়েছে। সিনার্কা বলল।
—হ্যাঁ—কিন্তু নকশাটার রহস্যের সমাধান করতে পারিনি। ফ্রান্সিস বলল।
—চেষ্টা করো—দেখো। সিনার্কা বলল।
ফ্রান্সিস এবার মাথা ঝাঁকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। সিনার্কা রাজার মতো সম্মান পেয়ে খুব খুশি। বলল-কিছু বলবে?
—হ্যাঁ মহামান্য—বলছিলাম নকশাটার রহস্য সমাধান জানে একমাত্র রোক্কা। যদি রোক্কাকে আমি ঐ ঘরে নিয়ে যেতে পারি তাহলেই রত্নভাণ্ডার উদ্ধার করা সম্ভব। নইলে আমি একা পারবো না। ফ্রান্সিস বলল। সিনার্কা একটুক্ষণ চিন্তা করল। একদিকে মহামূল্যবান রত্নপেটিকা অন্যদিকে রোক্কার জন্য চিন্তা—যদি সুযোগ বুঝে পালিয়ে যায়। সিনার্কা বলল—রোক্কাকে সঙ্গে দিতে পারি কিন্তু যদি রোক্কা পালিয়ে যায়?
—আমরা রোক্কাকে পালাতে দেব না। ফ্রান্সিস বলল। সিনার্কা ইঙ্গিতে দলনেতাকে ডাকল। দলনেতা খোঁড়াতে খোঁড়াতে সিনার্কার গাড়ির কাছে এসে মাথা একটু ঝুঁকিয়ে সম্মান জানাল। সিনার্কা বলল–কয়েদঘর থেকে রোক্কাকে এখানে নিয়ে এসো। শুধু রোক্কাকে অন্য কোনো বন্দিকে নয়। দলপতি মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে চলে গেল।
একটু পরেই রোক্কাকে নিয়ে দলপতি ফিরে এলো। ফ্রান্সিস রোক্কাকে দেখেই বুঝল রোক্কা বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। কপালে মুখে খোলা হাতে তলোয়ারের কাটাগুলো ফুটে উঠেছে। দুতিনটে কাটা জায়গায় রক্ত জমে কালচে হয়ে উঠেছে। রোক্কার হাঁটতেও কষ্ট হচ্ছে। ফ্রান্সিস এবার চিন্তায় পড়ল—রোক্কার সঙ্গে ও যেরকম দুর্ব্যবহার করেছে। তাতে রোক্কা বোধহয় ওকে বিশ্বাসই করবে না। কাজেই ওর সঙ্গে যেতেও চাইবে না। ফ্রান্সিস বুঝতে পারল—অনেক সাবধানে ওকে এগোতে হবে।
রোক্কা কাছে আসতে ফ্রান্সিস বলল—দেখুন রোক্কা—যে নকশাটা আমি পেয়েছি সেটার সমাধান শুধু আপনিই জানেন। রোক্কা দুর্বল শরীরে যতটা পারে চেঁচিয়ে বলল নকশাটা একেবারে জালমিথ্যে। ইসাবেলা ওরকম কোনো নকশাই এঁকে জানালার গরাদ দিয়ে নীচে ফেলে দেন নি। ডাহা মিথ্যে এসব। ফ্রান্সিস বলল—আসলে এটা যে রত্নভাণ্ডার উদ্ধারের নির্দেশ আঁকা নকশা এটাই আপনারা বুঝতে পারেন নি।
—আপনি বুঝেছেন? অকৃতজ্ঞ ভাইকিং? গলায় বেশ জোর দিয়ে রোক্কা বলল।
—হ্যাঁ অনেকটা বুঝেছি। এবার আপনার সাহায্য চাই। ফ্রান্সিস বলল।
—আমি কোনোরকম সাহায্য করবো না। রোক্কা চেঁচিয়ে বলল।
সিনার্কা সঙ্গে সঙ্গে গাড়িতে উঠে দাঁড়িয়ে দলপতিকে বলল—রোক্কাকে গলায় মাথায় তলোয়ারের ঘায়ে আধমরা করে ফেল। তবেই কথা শুনবে। দলপতি তলোয়ার খুলে ছুটে এলো। তখনও রোক্কার হাত বাঁধা। ফ্রান্সিস দু’হাত তুলে বলল—এসবের কোনো দরকার নেই। আমি রোক্কাকে নিয়ে যাচ্ছি। আমি রোক্কার কাছ থেকে নকশার নির্দেশ বের করবো। আমাকে এ ব্যাপারে সাহায্য না করলে আমিই ওকে নিকেশ করবো। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল—প্রথমে যে করেই হোক রোক্কাকে নিয়ে ঘরটায় ঢুকতে হবে।
—কিন্তু রোক্কাকে পাহারা দেবার জন্যে দু’জন সশস্ত্র সৈন্য ওর সঙ্গে থাকবে যাতে রোক্কা পালাতে না পারে। সিনার্কা বলল।
—বেশ। এবার তাহলে আমাদের যাবার অনুমতি দিন। ফ্রান্সিস বলল।
রোক্কাকে সঙ্গে নিয়ে ফ্রান্সিস দুর্গের পেছনের সেই খাদের দিকে চলল। যেতে যেতে পাহারাদার সৈন্যদের স্পেনীয় ভাষায় বলল—তোমরাও কি দুর্গের ছাতে উঠবে? দু’জন পাহারাদার সৈন্য নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। ফ্রান্সিস নিশ্চিন্ত হল—এরা স্পেনীয় ভাষা জানে না।
এবার ফ্রান্সিস রোক্কাকে স্পেনীয় ভাষায় বলল—প্রথমেই আমি আপনার সঙ্গে যে দুর্ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছি তার জন্য—কথাটা বলে মাথা একটু নিচু করে বলল আমি ক্ষমা চাইছি। একজন দেশপ্রেমিক যোদ্ধা হিসেবে আমি আপনাকে শ্রদ্ধা করি। রোক্কা বেশ আশ্চর্য হল। ফ্রান্সিস কি তাহলে অভিনয় করেছিল?
রোক্কা বলল—আমার সঙ্গে ওরকম ব্যবহার করেছিলেন কেন?
—সিনার্কার মন পাওয়ার জন্যে। আমার ঐ ব্যবহারে সিনার্কা সন্তুষ্ট হয়েছিল। আমার কথাগুলো বিশ্বাস করেছিল। তাই আজকে আপনাকে আমার সঙ্গে আসতে দিল। ফ্রান্সিস বলল।
—রানী ইসাবেলার নকশা কী আমি তাই জানি না। রোক্কা বলল।
ফ্রান্সিস বলল—নকশাটা পুরো ধাপ্পাবাজি। নকশাটা আমিই দ্রুত হাতে এঁকেছি। তারপর ধুলোবালি মেখে ময়লা করেছি যাতে সিনার্কা মনে করে নকশাটা অনেক পুরোনো।
—তাহলে আমি কী করবো? রোক্কা বলল।
—আমি যখন যা বলবো আপনি তাই করবেন। ফ্রান্সিস বলল। রোক্কা মৃদু হেসে বলল—আপনি যে সিনার্কার জন্যে নিজের জীবন বিপন্ন করতে চলেছেন সেই সিনার্কা আপনাদের রাজকুমারী আর কামেরাতকে কয়েদঘরে বন্দি করে রেখেছে। ফ্রান্সিস চমকে উঠে বলল—সে কি। এসব কথা তো সিনার্কা বা দলপতি কেউ আমাকে বলে নি।
