এবার ফ্রান্সিস হ্যারি আর শাঙ্কোকে নিয়ে দুর্গের পেছনে এলো।
ওরা দুর্গের পেছনের খাদটায় এলো। দেখল শাঙ্কোর বাঁধা লম্বা কাছিটা তেমনি বাঁধা আছে। পড়ে থাকা দড়িটার একটা মুখ শাঙ্কো কোমরে বেঁধে নিল। কাছি বেয়ে বেয়ে তিনজনেই গাছের ডালপালা ধরে দুর্গের পেছনের স্তূপাকার খসে পড়া পাথর ক্রুপের ওপর উঠে এলো। পাথরের চাইয়ের সঙ্গে বাঁধা কাছিটার মুখটা ফ্রান্সিস কোমরে বেঁধে নিল। তিনজনে এবার খুব সাবধানে ভাঙা পাথরের ওপর পা রেখে রেখে চলল দুর্গের মাথার দিকে। দু’জায়গায় পাথর নড়ে গিয়ে ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। পড়লে গড়িয়ে খাদের মধ্যে গিয়ে পড়তো। প্রাণে বেঁচে গেলেও হাত পা ভাঙতোই। কোনোরকমে ভারসাম্য রাখল। আস্তে আস্তে তিনজন দুর্গের মাথায় উঠে এলো। ফ্রান্সিস পশ্চিমদিকে তাকাল। দেখল পশ্চিমে সমুদ্রের মাথায় লাল আর কমলা রঙের খেলা চলেছে। সূর্য অস্ত যাচ্ছে।
ফ্রান্সিস নীচের দিকে তাকিয়ে দেখল ভিড়ে ভিড়াক্কার। সারা বোনিফেসের লোকেরাই যেন হাজির হয়েছে। হ্যারি আর শাঙ্কোও এসে নীচের ভিড় দেখল। ফ্রান্সিসদের দুর্গের ছাদে দেখে নীচের ভিড়ের মানুষেরা চিৎকার হৈ হৈ শুরু করে দিল। সিনাৰ্কাও গাড়িতে উঠে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ল ফ্রান্সিসদের দিকে।
এবার ফ্রান্সিস চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল দু’তিনটে বড়ো বড়ো পাথরের পাটাতন পড়ে আছে। ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে ঐ পাটাতনগুলোর সঙ্গে দড়ির মুখটা বাঁধতে বলল। তিনজনে মিলে চেপে বাঁধল দড়িটা। দড়িটার অন্য মুখটা ফ্রান্সিস দুর্গের মাথা থেকে ঝুলিয়ে দিল। দড়ির সেই মুখটা দুর্গের পাথুরে দেয়ালের গা গিয়ে ঘেঁসে এলো জানালার কাছে। ফ্রান্সিস দড়িটা বের কয়েক টেনে দেখল। বেশ শক্ত করেই বাঁধা হয়েছে।
ফ্রান্সিস দড়িটা ধরে ঝুলে পড়ল। দুর্গের পাথুরে দেয়ালের গায়ে পা রেখে রেখে নামতে লাগল। দুর্গের পাথুরে গায়ে তখনও রোদ লেগে আছে। সূর্য অস্ত যেতে তখনও দেরি আছে। পাথুরে দেয়ালে পায়ের ভর রেখে রেখে ফ্রান্সিস জানালাটার সামনে এলো। কিন্তু জানালার লোহার গরাদ ধরল না। দেয়ালে পা রাখল। কারণ রোক্কা বলেছিল দু’জন লোক জানালার গরাদ ধরে টেনেছিল ঘরে ঢোকার জন্যে। জানালার মাথা থেকে আলগা পাথর খুলে পড়েছিল আর দু’জনই মাথা ফেটে মারা গিয়েছিল। ফ্রান্সিস দুপা দিয়ে দড়ি আঁকড়ে ধরে কোমরে বাঁধা কাছির মুখটা বের করল। খুব সন্তর্পণে আস্তে আস্তে গরাদগুলোর মধ্যে দিয়ে কাছির মুখটা ঢুকিয়ে বেশ শক্ত গেরো দিল। তারপর দড়ি বেয়ে বেয়ে দুর্গের মাথায় উঠে এলো। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল—শাঙ্কো কাছির অন্য মুখটা নীচে ফেলে দাও। শাঙ্কো কাছির অন্য মাথাটা টেনে আনল। তারপর দুর্গের মাথা থেকে নীচে ফেলে দিল। ফ্রান্সিস তখন নীচে দাঁড়ানো সিনার্কার সেই আটদশ জন সৈন্যকে কাছিটা ধরে টানতে বলল। সৈন্যরা বুঝল—ফ্রান্সিস কাছি টেনে জানালার গরাদগুলো ভেঙে ফেলতে বলছে।
সৈন্যরা কাছির মুখটা টেনে ধরল। তারপর মুখে শব্দ করে একসঙ্গে সবাই ভীষণজোরে টান মারল। সঙ্গে সঙ্গে জানালার মাথা থেকে বড়ো বড়ো পাথরের টুকরো বৃষ্টির মতো নীচে ছিটকে পড়ল। ধুলো বালি উড়ল। পাথর পড়তে দেখে নীচের লোজন ভয়ে ছুটোছুটি লাগিয়ে দিল। ফ্রান্সিস বুঝল—রানী ইসাবেলা কোনোভাবে জানালার মাথার পাথরগুলো আঙ্গা করে রেখেছিলেন যাতে কেউ যেন জানালার গরাদ ধরে দাঁড়াতে না পারে। যে দু’জন এসে গরাদ ধরে দাঁড়িয়েছিল তারা খসে পড়া পাথরে মাথা ফেটে মারা গিয়েছিল।
আবার ফ্রান্সিস কাছি টানার জন্যে সৈন্যদের ইঙ্গিত করল। আবার সৈন্যরা মুখে শব্দ করে একসঙ্গে হ্যাঁচকা টান দিতে লাগল। বারকয়েক টানতে হঠাৎ শব্দ তুলে গরাদগুলো ভেঙে গেল। ছিটকে নীচে পড়ল। সৈন্যরা দ্রুত সরে গেল। বাঁ পাশের একটা গরাদ ভাঙলো না বাঁধা ছিল না বলে।
এবার জানালা খোলা। ফ্রান্সিস আগের মতোই দড়ি বেয়ে বেয়ে জানালার কাছে এসে জানালার নীচের অংশে পা রাখল। দেখল একটু কাত হয়ে অনায়াসে ঘরটায় ঢোকা যাবে। ও শরীর একটু বেঁকিয়ে কাত হয়ে আস্তে আস্তে ঘরটায় ঢুকল।
নীচে থেকে সিনার্কা অমাত্যরা সৈন্যরা ভিড় করা বেনিফোসিওর লোকেরা সাগ্রহে তাকিয়ে রইল ঐ ভাঙা জানলাটার দিকে।
চারদিক নিস্তব্ধ। কোনো শব্দ নেই ভিড়ে জটলায়। শুধু সমুদ্রের মৃদু গর্জন শোনা যাচ্ছে।
বেশ কিছুক্ষণ পরে ফ্রান্সিস ভাঙা জানালাটা দিয়ে মুখ বাড়াল। নীচের ভিড়ে চিৎকার হৈ হুল্লা শুরু হল। ফ্রান্সিস হাত বাড়িয়ে ঝুলন্ত দড়িটা ধরল। তারপর বেরিয়ে এলো জানালাটা দিয়ে। কিন্তু ফ্রান্সিসের হাতে কিছুই নেই। বোনিফেসিওর লোকেরা হতাশ হল। ওরা আশা করেছিল প্রায় একশো বছর যাবৎ প্রচলিত লোকগল্পে শোনা রানী ইসাবেলার রত্নভাণ্ডার ঐ দুঃসাহসী বিদেশিটা উদ্ধার করতে পারবে। কিন্তু ওর হাতে কোথায় সেই রত্নভাণ্ডারের পেটিকা। ছাত থেকে হ্যারি আর শাঙ্কোও দেখল—ফ্রান্সিস খালি হাতে দড়ি বেয়ে বেয়ে উঠে আসছে। ওদের মনে তখন একটাই চিন্তা—তাহলে ফ্রান্সিস কি এবার ব্যর্থ হলো? এই প্রথম হার স্বীকার করল?
দড়ি বেয়ে বেয়ে ফ্রান্সিস আগের মতো দুর্গের ছাতে উঠে গেল। হ্যারি আর শাঙ্কো রত্নভাণ্ডারের ব্যাপারে ফ্রান্সিসকে কিছুই জিজ্ঞেস করল না। ওরা জানে ফ্রান্সিস ঠিক সময়মতো সব বলবে।
