গরাদ বসানো জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ফ্রান্সিস সময় অনুমান করল। আর দেরি নয়। ফ্রান্সিস বলল—হ্যারি বসে থেকো না। শুয়ে একটু বিশ্রাম করে নাও। তারপরেই তোমাকে যেতে হবে। বার্গ পাহাড়ে বিদ্রোহীদের আস্তানায় গিয়ে বন্ধুদের বলবে তারা যেন সদর রাস্তা নয়—ঝোঁপ-জঙ্গল পাথুরে মাটির ওপর দিয়ে এসে জাহাজে চলে যায়। শুধু বিস্কো জাহাজে উঠবে না। তির-ধনুক নিয়ে আলোকস্তম্ভের আড়ালে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করবে। শুধু শাঙ্কোকে তুমি এখানে নিয়ে আসবে।
কিছুক্ষণ পরে দলপতি এসে ঘরে ঢুকল। নকশার কাগজটা কোমরের ফেট্টি থেকে বের করে হেসে ফ্রান্সিসকে ফেরৎ দিল। নকশাটা নিয়ে ফ্রান্সিস এমনভাবে নকশাটা খুঁটিয়ে দেখতে লাগল যেন খুব মূল্যবান কিছু দেখছে। তখনই একবার হ্যারিকে বলল—দলপতির কাছ থেকে একটা ঘোড়া চেয়ে নাও। এতটা পথ তুমি হাঁটাহাঁটি করলে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়বে। এখন ক্লান্ত হওয়া চলবে না। অনেক কাজ সামনে।
হ্যারি দলপতিকে ঘোড়ার ব্যবস্থা করতে বলল। সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। সঙ্গে যদি চান সৈন্যও দিতে পারি। দলপতি বলল।—না-না—আমি একাই যাবো। হ্যারি বলল।
হ্যারি উঠে দাঁড়াল। তারপর সেনাপতির পেছনে পেছনে চলল।
দুর্গের বাইরে হ্যারির জন্যে একটা তেজিয়ান ঘোড়া আনা হল। হ্যারি ঘোড়ায় চড়ে প্রথমে জাহাজঘাটার দিকে গেল। যাতে সেনাপতির মনে কোনো সন্দেহ না হয়। তারপর সদর রাস্তা এড়িয়ে ঝোঁপজঙ্গল আর পাথুরে মাটির মধ্য দিয়ে বার্গ পাহাড়ের দিকে ঘোড়া ছোটাল। ছোটো ছোটো ঝোঁপঝাড় পাথুরে মাটির ওপর দিয়ে ঘোড়া অনায়াসে জোর কদমে ছুটল।
ঘোড়ায় চড়ে হ্যারি আর বার্গ পাহাড়ের কাছে এলো তখন সূর্য পশ্চিম আকাশের দিকে অনেকটা নেমে এসেছে। ফ্রান্সিস তাড়া দিয়েছে। কাজেই সময় নষ্ট করা চলবে না।
বার্গ পাহাড়ের সেই গুহাটার কাছে আসতেই কয়েজন বিদ্রোহী খোলা তলোয়ার হাতে হ্যারির সামনে এসে দাঁড়াল একজন ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরল। হ্যারি হেসে বলল—আমি রোক্কার লোক। ভয়ের কোনো কারণ নেই। বিদ্রোহীদের মধ্যে দু’জন হ্যারিকে চিনল। ওরা জিজ্ঞেস করল কী ব্যাপার? হ্যারি বলল—বন্ধুদের কাছে এসেছি। বেশ যান। একজন বিদ্রোহী বলল।
ঘোড়া থেকে নেমে হ্যারি প্রায় অন্ধকার গুহায় ঢুকল। বেশ বড়ো গুহাটা টানা চলে গেছে। বিদ্রোহীরা কেউ শুয়ে আছে কেউ বসে আছে। জ্বলন্ত মশালের আলোয় হ্যারিকে দেখে বন্ধুরা ছুটে এলো। হ্যারি বলল—আমাদের এখানে আর থাকা চলবে না। ফ্রান্সিসের নির্দেশ—তোমরা সবাই বার্গ পাহাড় থেকে বেরিয়ে নির্জন ঝোঁপঝাড় পাথুরে জায়গায় দিয়ে জাহাজঘাটায় চলে যাবে। কেউ যেন তোমাদের দেখতে না পায়। শুধু শাঙ্কোকে সঙ্গে নিয়ে আমি আগেই ঘোড়া ছুটিয়ে সেই দুর্গে গিয়ে পৌঁছবো।
—ফ্রান্সিস কোথায়? রাজকুমারী কোথায়? বিস্কো জিজ্ঞেস করল।
—রাজকুমারী এতক্ষণে বোধহয় জাহাজে পৌঁছে গেছেন। কিন্তু আমাকে আর ফ্রান্সিসকে সিনার্কা বন্দি করেছে। তবে রানী ইসাবেলার রত্নভাণ্ডার উদ্ধারের লোভ দেখিয়ে সিনাৰ্কাকে কবজা করেছে ফ্রান্সিস রত্নভাণ্ডার উদ্ধারের জন্যে সিনার্কা আমাদের দুজনকে বন্দি করেও মুক্তি দিয়েছে। এখন ফ্রান্সিস পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ভাবছে।
বিদ্রোহীদের মধ্যে একজন এগিয়ে এসে হ্যারিকে বলল—রোকার সংবাদ জানেন?
—না—হ্যারি মাথা দুলিয়ে বলল—তবে রোক্কাকে শেষ দেখেছি বৈদ্যিমশাই-এর বাড়িতে। মনে হয় রোক্কা ভালোই আছেন। হ্যারি আগেই ভেবে রেখেছিল—রোক্কার আবার বন্দি হওয়ার কথাটা বিদ্রোহী সঙ্গীদের বলা চলবে না। তাহলে বিদ্রোহী বন্ধুরা রোক্কাকে মুক্ত করার জন্য সেই দুর্গে যাবে। লড়াই হবে। রক্ত ঝরবে। কারণ সারিনের যুদ্ধে জয়লাভ করে এখন বিদ্রোহীদের আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে গেছে। তাই হ্যারি এক্ষুণি কোনো লড়াইতে যেতে চাইছে না। একবার লড়াই শুরু হলে রত্নভাণ্ডার উদ্ধারের কাজ অনেক পিছিয়ে যাবে। তাই হ্যারি রোক্কার বন্দি হওয়ার সংবাদটা জানালো না।
ভাইকিং বন্ধুরা সব তৈরি হয়ে গুহার বাইরে এলো। হ্যারি রোক্কার এক বিদ্রোহী সঙ্গীকে অনুরোধ করল যাতে সে গোপনে বন্ধুদের জাহাজঘাটায় পৌঁছে দিতে পারে। সঙ্গীটি ভাইকিংদের নিয়ে চলল।
হ্যারি আর শাঙ্কো ঘোড়ায় উঠে ঘোড়া ছোটাল সেই দুর্গের দিকে।
দুর্গের চত্বরে তখন বেনিফেসিওর অধিবাসীরা ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। লোকমুখে প্রচারিত হয়ে গিয়েছিল যে প্রায় একশো বছর পরে এক সাহসী ভাইকিং রানী ইসাবেলার আঁকা একটা নকশা পেয়েছে। সিনার্কা অনুমতি দিয়েছেন। তাই আজ সেই দুঃসাহসী ভাইকিং নকশা নিয়ে রানী ইসাবেলার ঘরে ঢুকবে। রানীর রত্নপেটিকা উদ্ধার করবে। লোকের ভিড় বেড়েই চলল।
হ্যারি আর শাঙ্কো যখন ঘোড়ায় চড়ে দুর্গের সামনে এলো সৈন্যেরা তোকজন সবাইকে সরিয়ে দিয়ে ওদের দুর্গের মধ্যে ঢুকতে সাহায্য করল। ওরা দুর্গ চত্বরে দাঁড়ানো ফ্রান্সিসকে দেখল সিনার্কার সঙ্গে কথা বলছে। সিনার্কা আর দু’জন অমাত্য সিনার্কার রাজকীয় গাড়িতে বসে আছে। কালো ওক কাঠের গাড়ি। তাতে রুপোলি লতাপাতা ফুল বসানো। সিনার্কা হাসছে। খুব খুশি।
হ্যারি আর শাঙ্কোকে দেখে ফ্রান্সিস এগিয়ে এল। হ্যারি রা ঘোড়া থেকে নামল। ফ্রান্সিস বলল—আর সময় নষ্ট নয়। চলো। ফ্রান্সিসের পেছনে দেখা গেল দশ পনেরোজন সৈন্য। তবে তাদের হাতে অস্ত্র নেই। ফ্রান্সিস হ্যারিকে বলল—তুমি ওদের লো ল্যাতিন ভাষায় বুঝিয়ে বলো যে আমি আগে দুর্গের ছাতে উঠে যেমন ইঙ্গিত করবো সেইভাবে যেন ওরা কাজ করে। হ্যারি সেই সৈন্যদের কথাটা বুঝিয়ে বলল। সৈন্যরা মাথা নেড়ে জানাল যে ওরা বুঝেছে। সৈন্যদের দুর্গের জানালার নীচে অপেক্ষা করার জন্যে ফ্রান্সিস ইঙ্গিত করল।
