মারিয়া গাড়িটায় উঠে বসল। সৈন্যরাই ধরে ধরে রাজকুমারীকে গাড়ি থেকে নামিয়ে আনল। কামেরাত ওষুধের পোঁটলাটা নামিয়ে নিল। দুর্গের সদর দেউড়ির দিকে যেতে যেতে কামেরাত সৈন্যদের বলল—উনি ভাইকিং দেশের রাজকুমারী ভীষণ অসুস্থ। অন্য কোনো ঘরে ওঁকে রাখুন। আমারও চিকিৎসা করতে সুবিধে হবে। দেউরিতে দলপতি ছিল। সৈন্যরা গিয়ে তাকে কথাটা বলল। দলপতি ঘাড় নেড়ে বলল—না—সিনার্কার অনুমতি না নিয়ে কিছু করা যাবে না।
অগত্যা সেই কয়েদঘরেই মারিয়া আর কামেরাতকে ঢোকানো হল। ঢঢং ঢং করে কয়েদঘরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। এটুকু হেঁটে এসেই মারিয়া হাঁপিয়ে পড়ল। খড় বাঁধা বিছানায় শুয়ে পড়ল। কামেরাত পাশে বসল। পুঁটুলি খুলে একটা ওষুধ বের করে মারিয়াকে খেতে দিল। ওষুধ খেয়ে মারিয়া অসাড় হয়ে শুয়ে রইল। মারিয়া এতক্ষণ বুঝলকী দুর্বল হয়ে পড়েছে ও। কামেরাতকে বলল ও সেকথা। কামেরাত বলল—ভয়ের কিছু নেই রাজকুমারী। কয়েকটা দিন ওষুধ খেলেই আপনি আবার শরীরে জোর পাবেন। এই দুর্বলতা কেটে যাবে। একটু থেমে বলল—সমস্যা হল আপনি এই বন্দি। জীবন কতটা মানিয়ে নিতে পারবেন।
মানিয়ে নিতেই হবে। মারিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল। বার বার মারিয়ার মনে হতে লাগলো ফ্রান্সিস আর আগের মতো নেই। এই বিদেশ বিভুইয়ে ও একেবারে অসহায়।
প্রায় অন্ধকার কয়েদ ঘরটায় এই দিনের বেলাও মশাল জ্বলছে। সেই আলোয় চারদিকে তাকাতে তাকাতে কামেরাত দেখল রোক্কাও শুয়ে আছে। হাত দুটো বাঁধা।
কামেরাত তাড়াতাড়ি রোক্কার কাছে উঠে গেল। রোক্কা কামেরাতকে দেখে ম্লান হাসল। বলল—তুমিও ধরা পড়েছো?
—শুধু আমি নই ফ্রান্সিসদের দেশের রাজকুমারীকে এ ঘরে বন্দি করে রাখা হয়েছে। কামেরাত বলল। কথাটা শুনে রোক্কা একটু আশ্চর্য হল। ফ্রান্সিস তো সিনার্কাকে প্রায় দেবতার আসনে বসিয়েছে। অথচ তাদের দেশের রাজকুমারীকে বন্দি করা হল। রোক্কা এসব কিছু বলল না। শুধু বলল—কামেরাত—তোমার কাছে কিছু ওষুধটষুধ আছে।
—সব আছে। আমার পুটুলিতে। সিনার্কার সৈন্যরা পুটুলির ভেতরের ওষুধটষুধ দেখে ছেড়ে দিয়েছে। আমি এক্ষুণি ওষুধ আনছি। কামেরাত বলল। তারপর নিজের জায়গায় ফিরে এসে পুঁটুলি খুলে প্রয়োজনীয় ওষুধ বের করল। মারিয়াকে বলল রাজকুমারী রোক্কাকেও এই কয়েদঘরে বন্দি করে রাখা হয়েছে। মারিয়া শুনে আশ্চর্য হল। বলল—রোক্কা বন্দি। তাহলে তো তোমাদের বিদ্রোহের নেতা কে হবে।
—সেসব ঠিক হবে। রোক্কাকে তার বিদ্রোহী বন্ধুরা ঠিক মুক্ত করে নিয়ে যাবে। কামেরাত বলল।
রোক্কার কাছে এলো কামেরাত। তারপর কাটা জায়গাগুলোয় মলম লাগিয়ে দিতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই রোক্কা অনেকটা সুস্থ বোধ করল।
.
দুর্গের সদর দেউড়ির সামনে পৌঁছল ওরা। দেখল এখানে-ওখানে সৈন্যরা জটলা করছে। ওদের দেখে সবাই ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মানে রানী ইসাবেলার নকশাটা ফ্রান্সিস উদ্ধার করেছে এই খবর সবাই জেনে গেছে।
দেউড়ির দরজার কাছে দলপতি দাঁড়িয়েছিল। দলপতি খোঁড়াতে খোঁড়াতে ফ্রান্সিসের কাছে এলো। হেসে বলল—মহামান্য সিনাৰ্কা রানী ইসাবেলার নকশাটা দেখতে চেয়েছেন।
হ্যারি ফ্রান্সিসকে বলল সেটা। ফ্রান্সিস-কোমরে গোঁজা নকশাটা বের করে হ্যারিকে দিয়ে বলল—মহামান্য সিনার্কা যেন দেখেই ফিরিয়ে দেন। আমাদের এখনই কাজে নামতে হবে। দলপতির হাতে নকশাটা দিয়ে হ্যারি বলল সেকথা।
দলপতি দু’একবার নকশাটা এপিঠ-ওপিঠ দেখল। মাথা মুণ্ডু কিছুই বুঝল না। নকশাটা একজন সৈন্যের হাতে দিয়ে সিনাৰ্কার কাছে পাঠিয়ে দিল।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি বন্ধ সদর দেউড়ির কাছে এলো। সৈন্যরা সরে গিয়ে ওদের যাবার জায়গা করে দিল। ঘর ঘর শব্দে দরজার একটা পাল্লা খুলে দেওয়া হল। ফ্রান্সিস আর হ্যারি পাথুরে চত্বরটায় এলো।
দলপতি খোঁড়াতে খোঁড়াতে ফ্রান্সিসদের কাছে এলো। হাসতে হাসতে বলল—জানেন নকশা পেয়ে মহামান্য সিনার্কা আনন্দে সিংহাসনে গড়াগড়ি খাচ্ছেন। হ্যারি বলল—তা তো হবেই। প্রায় একশো বছর আগে রানী ইসাবেলায় নিজের হাতে আঁকা নকশা পেয়েছেন। খুশি তো হবেনই। তবে নকশা পেলেই তো আর গুপ্ত রত্নভাণ্ডার পাওয়া যাবে না। ঐ ঘর দু’টোয় আগে তো ঢুকতে হবে। নকশা মেলাতে হবে। তবে তো।
তা ঠিক। দলপতি ওর বড়ো মাথাটা ঘড়ির পেণ্ডুলামের মতো এপাশ-ওপাশ দোলাল।
দলপতি খোঁড়াতে খোঁড়াতে ওদের নিয়ে দুর্গের পাথরের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল। একটা পরিচ্ছন্ন ঘরে ওদের নিয়ে এলো। বলল—এই ঘরে আমি একা থাকি। এখন থেকে আপনারাও থাকবেন। মহামান্য সিনার্কা হুকুম দিয়েছেন আপনাদের আদর যত্নে যেন কোনো অবহেলা না হয়। ফ্রান্সিস মৃদু হেসে বলল—হ্যারি-রানী ইসাবেলার রত্নালংকারের ভাণ্ডার। সিনার্কা এখন আমাদের জন্য কতকিছু করবে।
ঘরটায় দেখা গেল পরিচ্ছন্ন দড়িবাঁধা মোটা ঘাসের বিছানা। ওপরে পরিষ্কার মোটা নকশাদার কাপড় পাতা।
—আপনারা বিশ্রাম করুন। যথাসময়ে খাবার দেওয়া হবে। হেসে এই কথা বলে দলপতিগহ্বর চলে গেল।
ফ্রান্সিস ঘাসের বিছানায় শুয়ে পড়ল। মাথার পেছনে দু’হাত পেতে চোখ বুজে শুয়ে রইল। অনেক চিন্তা মাথায়—মারিয়াকে নিয়ে কামেরাত জাহাজে উঠতে পারলো কিনা। সত্যিই রত্নালংকারের ভাণ্ডার আছে কিনা—নাকি সবটাই লোকমুখে প্রচলিত গল্প। এবার ভাবনা—কী করে রত্নভাণ্ডার পাওয়া যাবে। কী করে সবাইকে নিরাপদে জাহাজে ফিরতে পারবে।
