ভেজানো দরজা পা দিয়ে ধাক্কা দিয়ে খুলল। দেখল জংলামতো জায়গাটার কিছুটা আড়ালে একটা ঘোড়ায় টানা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। জংলামতো জায়গাটায় কামেরাত গুঁড়ি মেরে বসে ছিল। ফ্রান্সিসদের দেখেই ও ছুটে এলো। দুহাত বাড়িয়ে মারিয়ার প্রায় অচেতন শরীরটা পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে গাড়িটার দিকে ছুটল। আস্তে আস্তে মারিয়াকে গাড়িতে শুইয়ে দিল। গাড়িতে উঠল না। ঘোড়াটার মুখের কাছে লাগাম ধরে টেনে নিয়ে চলল। গাড়ি চলার শব্দ কম হল। গাড়িটা কিছুদূর যেতেই ফ্রান্সিস ফিরে এলো। ছুটে শেষের ঘরটায় ঢুকল। মেঝে থেকে নকশাটা তুলে নিল। কোমরে এটা গুঁজে রাখল। ঘরের বাইরে এসে ডাকল—হ্যারি হ্যারি সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এলো। তখনই দেখল তলোয়ারে কাটা ফ্রান্সিসের পিঠের দিকটার পোশাকের কাপড় রক্তে ভিজে গেছে। হ্যারি কিছু বলল না। এর মধ্যেই ফ্রান্সিস নকশার কাগজটা মেঝের ধূলোয় ঘষে নিল যাতে সিনার্কা দেখে বুঝতে পারবে নকশাটা পুরোনো।
দুজনে বাইরে এলো। সদর দরজায় দাঁড়ানো সৈন্যরা কামেরাত আর মারিয়ার আর্ত চিৎকার অস্পষ্ট শুনেছে। কিন্তু বুঝে উঠতে পারছিল না কী করবে।
হ্যারি তখন ফ্রান্সিসের হাত থেকে নকশাটা নিয়ে উঁচু করে ধরে চেঁচিয়ে বলল—রানী ইসাবেলার এই নকশাটা উদ্ধার করা হয়েছে। শিগগির মহামান্য সিনার্কাকে সংবাদ পাঠাও। সৈন্যরা ভেতরের ব্যাপার কিছুই বুঝল না। ওরা শুনেছে এই বিদেশিরা নকশা খুঁজে বের করতে এখানে আসবে। নকশাটা তাহলে খুঁজে পেয়েছে ওরা। ওদিকে তলোয়ার হাতে ফ্রান্সিসের রুদ্রমূর্তি দেখে ওরা বেশ ঘাবড়ে গেল। কোনো কথা না বলে ওরা দাঁড়িয়ে রইলো। হ্যারি বলল—একজন ঘোড়ায় চড়ে গিয়ে মহামান্য সিনার্কাকে সংবাদটা পৌঁছে দাও। একজন ঘোড়ার খোঁজে চলে গেল। হ্যারি বলল—এবার চলো—দুর্গে যাবো আমরা।
সৈন্যদল হাঁটতে শুরু করল। তখনই মারিয়ার ঘরের পাহারাদার সৈন্যটি হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো। অন্য সৈন্যদের কাছে জানতে চাইল কী ব্যাপার? অন্য সৈন্যরা ওকে হ্যারির কথাটাই বুঝিয়ে বলতে বলতে চলল। পেছনে তলোয়ার হাতে ফ্রান্সিস আর হ্যারি
পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে হ্যারি মৃদুস্বরে বলল—সাবাস্ ফ্রান্সিস ফ্রান্সিস ও চাপা গলায় বলল-চুপ—এখনও অনেক বাকি। এবার হ্যারি বলল-তলোয়ারটা কোমরে গোঁজো।
ফ্রান্সিস তলোয়ার কোমরে গুঁজে রাখল।
সারা রাস্তা দুজনে আর কোনো কথা বলল না পাছে সৈন্যদের মনে কোনো সন্দেহ জাগে। ফ্রান্সিসের চিন্তা পরের কাজ। হ্যারির চিন্তা-ফ্রান্সিস সফল হবে তো? ফ্রান্সিস আকাশের দিকে তাকাল। মধ্য-আকাশ থেকে সূর্য পশ্চিম মুখো হয়েছে। ফ্রান্সিস ভুরু কুঁচকে সময়ের হিসেব করল।
ওদিকে কামেরাত শস্যটানা গাড়িতে মারিয়াকে শুইয়ে নিয়ে চলেছে। মারিয়ার শরীর ঢেকে দিয়ে ছিল একটা ফুল তোলা মোটা কাপড়ে। সেই কাপড়ে মারিয়ার মুখও ঢাকা। মারিয়া আচ্ছন্নের মতো শুয়েছিল।
একটা ঘোড়ায় টানা গাড়ির ঝাঁকুনি কম নয়। সেই ঝাঁকুনিতে মারিয়ার আচ্ছন্ন ভাবটা কেটে গেল। উঠে বসতে গেল। পারল না। একে তো অসুস্থ। তার ওপর ফ্রান্সিস ওর চুলের মুঠি ধরে যেভাবে টানাটানি করেছে তাতে মারিয়া আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। গাড়িটার চারদিকে তাকিয়ে দেখল। একপাশে একটা কাপড়ের পুঁটুলি। মারিয়া কিছুই বুঝতে পারল না। ও গাড়িতে শুয়ে আছে কেন? কার গাড়ি? চালাচ্ছেই বা কে? আর যাচ্ছেই বা কোথায়?
দুর্বল স্বরে মারিয়া বলল—আমি এখানে কেন? কিন্তু চাকার ঘটু ঘটু শব্দে সে কথা গাড়িচালক কামেরাতের কানে গেল না।
হঠাৎই গাড়িটা থামল। চালকের আসন থেকে কামেরাত নেমে এলো। পেছনে এসে দেখল—মারিয়া মুখ থেকে কাপড় সরিয়ে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। কামেরাত হেসে বলল—এখন শরীর কেমন লাগছে? ভাঙা ভাঙা স্পেনীয় ভাষা মারিয়া বুঝল। বলল—অনেকটা ভালো। একবার ভাবল মারিয়া ফ্রান্সিসের কথা জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু ফ্রান্সিস যে দুর্ব্যবহার ওর সঙ্গে করেছে তাতে ফ্রান্সিসের সন্ধান করতে ওর মন চাইল না। মারিয়ার কোন কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না। তবু বলল—আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?
—আপনাদের জাহাজে। কামেরাত বলল।
—হ্যারি রা এখনও বন্দী? মারিয়া জানতে চাইল।
—হ্যাঁ। কামেরাত বলল। তারপর বলল—মুখটা কাপড়ে ঢেকে শুয়ে থাকুন। সিনার্কার গুপ্তচররা ঘুরে বেড়াচ্ছে। আপনার মুখ দেখলেই ওরা সন্দেহ করবে এই বিদেশি মহিলা এখানে কেন? যাচ্ছেই বা কোথায়?
মারিয়া মুখের ওপর কাপড়টা টেনে মুখ ঢাকল। ঠিক তখনই দু’জন সৈন্য গাড়িটার কাছে দাঁড়াল। মুখ-ঢাকা মারিয়াকে দেখে সন্দেহ হল। কামেরাতকে জিজ্ঞেস করল—এই মহিলা কে? মুখ ঢাকা কেন? কোথায় নিয়ে যাচ্ছো একে? কামেরাত বলল—ইনি আমার স্ত্রী। বাচ্চা হবে তাই শরীর খারাপ। নিয়ে যাচ্ছি দাইমার কাছে।—হুঁ—সাবধানে নিয়ে যাও। একজন সৈন্য বলল। সৈন্য দু’জন চলে গেল।
কামেরাত আবার গাড়ি চালাতে লাগল।
এবার মারিয়া পাশ ফিরে শুতে গেল। ঢাকা কাপড়ে টান লেগে কাপড়টা কিছুটা সরে গেল। মারিয়ার গাউনটার পায়ের কাছে কিছু অংশ বেরিয়ে এলো। গাড়িটা তখন সেই দুর্গের কাছাকাছি এসেছে। এসময় সিনার্কার গুপ্তচরেরা নজরে পড়ল গাড়িটা। গুপ্তচরটির সন্দেহ হতেই। ও ছুটে গাড়ির কাছে এলো। বলল—গাড়ি থামাও। কামেরাত গাড়ি চালাতে চালাতেই বলল—কেন গাড়ি থামাবো কেন? গুপ্তচরটি ততক্ষণে মারিয়ার পায়ের কাছে গাউনের অংশটা দেখে ফেলেছে। ওর মনে সন্দেহ বাড়ল—এরকম সুতোর লেসের কাজ করা গাউনতো এখানকার মেয়েরা পরে না। গুপ্তচরটি আবার বলল—গাড়ি থামাও। কামেরাত কানেও নিল না কথাটা। যেমন গাড়ি চালাচ্ছিল চালাতে লাগল। গুপ্তচরটি চিৎকার করে দুর্গের সামনে দাঁড়ানো সৈন্যদের ডাকল—সৈন্যরা এখানে এসো। দু’তিনজন সৈন্য ছুটে এল। গুপ্তচরটি বলল—গাড়ি থামাও এবার। কামেরাত দেখল আর উপায় নেই ধরা পড়তেই হল। মারিয়াও কী হচ্ছে দেখার জন্যে মুখ থেকে কাপড় সরিয়েছে। গুপ্তচরটি বলে উঠল এই বিদেশিনী আর তার দলের লোকেরা সব বিদ্রোহীদের পক্ষে যোগ দিয়েছে। দুটোকেই কয়েদঘরে ঢোকাও। কামেরাত গাড়ি থামাল। সৈন্যরা ওকে নেমে আসতে বলল। কামেরাত নেমে এলো। সৈন্যরা মারিয়াকে উঠে বসতে বলল। মারিয়া বুঝল না! কামেরাত স্পেনীয় ভাষায় বলল—রাজকুমারী আমরা ধরা পড়েছি। ওরা আমাদের কয়েদঘরে বন্দি করে রাখবে। শেষ মুহূর্তে ধরা পড়ে গেলাম।
