ফ্রান্সিস একটু রেগেই বলল—প্রশ্ন করো না। যা বলছি করো।
ফ্রান্সিসের ওপর কামেরাতের রাগ তখনও পড়ে নি। মাথা নেড়ে বলল—পারবো না।
ফ্রান্সিস দাঁত চেপে বলল কামেরাত—একটা নকশা আঁকতে হবে। শিগগির।
কামেরাত আবার মাথা নাড়ল।
এবার হ্যারি বলল কামেরাত তুমি জানো না—অমাত্যের পরামর্শমতো আজ রাতেই তোমাদের জাহাজে রোক্কাকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হবে। কামেরাত অমাত্যের কথা শোনে নি। ও অবাক হয়ে হ্যারির দিকে তাকিয়ে রইল। হ্যারি বলল—তাড়াতাড়ি কাগজ আনো।
ফ্রান্সিস বলল কামেরাত-এর ওপর আমাদের তোমার রোক্কার মরণ-বাঁচন নির্ভর করছে। তাড়াতাড়ি সময় কম। কামেরাত এবার ব্যাপারটার গুরুত্ব বুঝতে পারল। ছুটে বেরিয়ে গেল। একটু পরেই একটা বড়ো পার্চমেন্ট কাগজ নিয়ে এলো হলদেটে পুরোনো কাগজ। রুপোর দোয়াত আর পাখির পালক কেটে তৈরি কলম।
ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে কাগজটা নিয়ে মেঝেয় পাতলা। আলো কম। তবু কালিতে কলম ডুবিয়ে দ্রুতহাতে একটা নকশামতো আঁকলো। নকশাটা দেখতে এরকম—আঁকা শেষ করে ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। কামেরাতকে বলল—খুব মন দিয়ে শোন। আমি মারিয়া মানে ঐ কোণার ঘরে যাকে চিকিৎসা করা হচ্ছে তাকে আমি নিয়ে আসছি। এর মধ্যে তুমি ঐ রোগীর আর রোক্কার চিকিৎসার জন্য ওষুধগুলো একত্র করে একটা মোটা কাপড়ে পোঁটলামতো বেঁধে পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাও। যে করে তোক একটা শস্যটানা গাড়ি জোগাড় করো। এখানে সবাইকে তুমি চেন—তুমি সহজেই এটা পারবে। গাড়ি নিয়ে কোনো শব্দ না করে পেছনের জংলা জায়গাটায় নিয়ে এসো। এখান থেকে মারিয়াকে নিয়ে আমি পেছনের দরজার কাছে থাকবো। তুমি মারিয়াকে গাড়িতে তুলে নেবে। ওষুধগুলো বের করে মোটা কাপড়টা দিয়ে মারিয়াকে ঢেকে দেবে যাতে কেউ ওর মুখ দেখতে না পায়। তারপর গাড়ি নিয়ে সোজা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জাহাজঘাটায় চলে যাবে। মারিয়া আমাদের জাহাজ চিনিয়ে দেবে। সেই জাহাজে মারিয়াকে নিয়ে উঠবে। ঐ জাহাজেই থাকবে। আমাদের জন্যে অপেক্ষা করবে। কথাটা একটানা শেষ করে ফ্রান্সিস একটু থেমে হাঁপানো গলায় বলল—সব কথা বুঝলে। কামেরাত মাথা দুলিয়ে এতক্ষণে হেসে বলল—বুঝেছি। ফ্রান্সিসের হাতে তখনও তলোয়ারটা ছিল। ও তলোয়ারের ফলা ঘষে ঘষে কামেরাতের হাতে বাঁধা দড়িটা কেটে দিল। কামেরাত সঙ্গে সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ফ্রান্সিস এবার খোলা তলোয়ারটা পিঠের দিকে পোশাকের নিচে ঢুকিয়ে তলোয়ারটা এ হ্যাঁচকা টানে তুলে আনল। পিঠ লম্বালম্বি কেটে গেল। ফ্রান্সিস তলোয়ারটা চোখের সামনে ধরল। দেখা গেল তরোয়ালের ফলার গায়ে রক্ত লেগে রয়েছে।
হ্যারি শিউরে উঠে বলল—এ কী করল?
ফ্রান্সিস বলল—আস্তে। মারিয়ার ঘরে যাবো। এখন খুব জোরে লো ল্যাতিন ভাষায় চেঁচিয়ে কাতর আর্তনাদ করে বললা—মরে গেলাম—মরে গেলাম। তাড়াতাড়ি। হ্যারি আর দেরি করলো না। শেখানো মতো আর্ত চিৎকার করে বলে উঠল-উঃ-আঁ আঁ মরে গেলাম—মরে গেলাম।
ফ্রান্সিস গলা নামিয়ে বলল—চলো মারিয়ার ঘরে। ঐ ঘরের পাহারাদারকে বলবে—কামেরাতকে আমি মেরে ফেলেছি। কারণ কামেরাত কিছুতেই বলতে চাইছিল না—নকশাটা কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে। চলো।
দু’জনে ছুটে এসে মারিয়ার ঘরে ঢুকল। মারিয়া বিছানায় শুয়ে ছিল। হঠাৎ ফ্রান্সিস আর হ্যারিকে ঢুকতে দেখে দুর্বল শরীরেও আনন্দে উত্তেজনায় উঠে বসল। হেসে দু’হাত তুলে বলল—ফ্রান্সিস
কিন্তু এ কোন ফ্রান্সিস ? হাতে তলোয়ার। দু’চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে। মারিয়ার মুখ ভয়ে শুকিয়ে গেল। ও চিৎকার করে উঠতে গেল। দুর্বল শরীরে গলা দিয়ে শব্দ বেরুলো না। পাহারাদার ফ্রান্সিসের হাতে তলোয়ার দেখে নিজেও কোমরে গোঁজা তলোয়ারের বাঁটে হাত রাখল। হ্যারি ছুটে এসে ওকে বলল—লড়াই নয়। সেই ই বিদ্রোহী লোকটা কিছুতেই বলছিল না রানী ইসাবেলার নকশাটা কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে। তাই সিনাৰ্কার হুকুমে লোকটাকে মেরে ফেলা হয়েছে। পাহারাদার হ্যারির আর্ত চিৎকার শুনেছিল। তাই সন্দেহ করল না।
মারিয়া হ্যারির কথা বুঝল না। ও ফ্যাল ফ্যাল করে হ্যারির দিকে তাকিয়ে রইল। পাহারাদার হতবাক দাঁড়িয়ে রইল। ফ্রান্সিস ওদের দেশীয় ভাষায় বলল—হ্যারি মারিয়াকে নিয়ে যাচ্ছি। সত্য না বললে ওকেও মেরে ফেলা হবে। কথাটা শেষ করে ফ্রান্সিস তলোয়ার কোমরে গুজল। তারপর এক লাফে মারিয়ার বিছানার কাছে এল। তারপর মারিয়া কিছু বোঝার আগেই মারিয়ার মাথার চুলের মুঠি ধরে এক হাকা টান মারিয়াকে মেঝেয় নামিয়ে আনল। চুল ধরে টেনে নিয়ে চলো। যন্ত্রণায় মারিয়া চোখে অন্ধকার দেখল। ওর দু’চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল। দুর্বল শরীর। মারিয়া কাঁদতে লাগল। পাহারাদার সৈন্যটি বাধা দিতে গেল। হ্যারি সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলে ওকে থামাল। বলল—এই মেয়ে লোকটা জানে রানী ইসাবেলার নকশা কোথায় গোপনে রাখা হয়েছে। যদি তার হদিশ না বলে তবে—সিনার্কা হুকুম দিয়েছেন—একেও মেরে ফেলা হবে। পাহারাদার সৈন্যটি দাঁড়িয়ে পড়ল। আর বাধা দেবার চেষ্টা করল না।
বাইরের বারান্দায় পাহারাদার সৈন্যটি চোখের বাইরে আসতেই ফ্রান্সিস মারিয়ার চুলের মুঠি-ছেড়ে দিল। তারপর মারিয়াকে পাঁজা কোলা করে তুলতে গেল। মারিয়া দুর্বল শরীরে দু’হাত যতটা সম্ভব ফ্রান্সিসকে বাধা দিতে লাগল—আর কাঁদতে লাগল। ফ্রান্সিস ফিসফিস করে বলতে লাগল—মারিয়া বাধা দিও না। বাধা দিও না—মারিয়া শান্ত হও। কিন্তু মারিয়া সে কথায় কান দিল না। ফ্রান্সিস আবার বলল—মারিয়া আমি সেই আগের ফ্রান্সিস ই আছি—যা বলছি শোনেনা। মারিয়া ভাঙা গলায় বলে উঠল—তুমি শয়তান—খুনী। ফ্রান্সিস বুঝল মারিয়াকে এখন কিছু বলে লাভ নেই। ও আবার মারিয়ার চুলের মুঠি ধরল। মারিয়া আর্ত চিৎকার করে উঠল—মা-মা—। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে মারিয়ার ঘাড়ের কাছে হাত দিয়ে জোরে চাপড় মারল। দুর্বল মারিয়া মুখে ওঁক করে শব্দ তুলে অজ্ঞানের মতো হয়ে গেল। ফ্রান্সিস এটাই চাইছিল। ও তাড়াতাড়ি মারিয়াকে দু’হাতে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে পেছনের দরজার দিকে ছুটল।
