হ্যারি রাগ স্বরে বলে উঠল—এবার তাহলে রাজকুমারীকে বন্দি করার কথা ভাবছো।
ফ্রান্সিস আগের মতোই শান্তগলায় বলল—কথা বাড়িও না। সময় কম—চলো।
—না—আমি তোমার সঙ্গে যাবো না। হ্যারি মাথা নেড়ে বলল। ওরা দুজন নিজেদের দেশের ভাষায় কথা বলছিল। রোক্কা আর অন্য বন্দিরা ওদের কথা কিছুই বুঝতে পারছিল না। তবে এটুকু বুঝল যে ফ্রান্সিস হ্যারিকে কোথাও যেতে বলেছে—হ্যারি সেখানে যেতে চাইছে না।
ফ্রান্সিস এবার একটু দ্রুত রক্ষীটির কাছে গেল। তারপর রক্ষীটির কোমরে ঝোলানো খাপ থেকে এক টানে তলোয়ারটা বের করল। রক্ষীটি চমকে উঠে বাধা দিতে লাগল। ফ্রান্সিস বাঁ হাত তুলে ওকে চুপ করে থাকতে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিস স্থির তাকিয়ে আছে। হ্যারি অসহায় বোধ করল। ফ্রান্সিস ওর বুকে লোয়ার ঠেকিয়ে হুমুক করবে হ্যারি এটা কোনোদিন কল্পনাও করেনি। ও বুঝল-এখন প্রতিবাদ বৃথা। ফ্রান্সিসের মাথার ঠিক নেই এখন।
হ্যারি আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস বলল-কামেরাতকে বলো আমাদের সঙ্গে যেতে। হ্যারি আর কী করে। কামেরাতকে বলল সেকথা। কামেরাত মাথা আঁকিয়ে বলে উঠল-না আমি যাবো না। দ্রুত সরে এসে ফ্রান্সিস কামেরাতের বুকেও তলোয়ার ঠেকাল। হ্যারিকে বলল-কামেরাতকে বলে দাও—আমাদের সঙ্গে যেতে না চাইলে ওর ভালো হবে না। হ্যারি কামেরাতকে বলল সেকথা। কামেরাত বেশ ভীত চোখে ফ্রান্সিসের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াল।
ওরা দরজার দিকে চলল। সামনে তলোয়ার হাতে ফ্রান্সিস পেছনে হারি আর কামেরাত। খোলা দরজা দিয়ে বাইরে ফ্রান্সিস একজন রক্ষীকে ইঙ্গিতে কামেরাতের হাতের দড়ি শক্ত করে বেঁধে দিতে বলল। রক্ষীটি একটা দড়ি নিয়ে এলো। শক্ত করে কামেরাতের হাত বেঁধে দিল।
দুর্গের পাথুরে চত্বর পার হল ওরা। সদর দেউড়ির দ্বাররক্ষীরাও ওদের বাধা দিল না।
ওরা বড়ো রাস্তায় এসে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস পুবমুখে হাঁটতে শুরু করল। বিনা প্রতিবাদে হ্যারি আর কামেরাত পেছনে পেছনে চলল। তখনই চারজন সৈন্য কোমরে তলোয়ার নিয়ে ওদের পিছু পিছু চলল। পথে দোকান-পাঠ খোলা। ব্যস্ত, লোকজনের চলাফেরা। ফ্রান্সিস কোনোদিকে তাকাল না। সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে হাঁটতে লাগল। রাস্তার লোকজন দেখল ওদের। ওরা একটু আশ্চর্যই হল—তলোয়ার হাতে বিদেশি ফ্রান্সিসকে আর মাথা নিচু করে চলা হ্যারিকে দেখে আশপাশের লোকজনের মধ্যে বেশ কৌতূহলের সৃষ্টি হল। এই বিদেশিদের সৈন্যরা পাহারা দিয়ে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে।
ফ্রান্সিস হাঁটতে হাঁটতে একবার ওপরে সূর্যের দিকে তাকিয়ে নিল। বেলা আন্দাজ করল। দুপুর এখনও। চারদিকে ঝকঝকে রোদ।
হাঁটতে হাঁটতে ফ্রান্সিস হঠাৎ হাঁটার গতি কমিয়ে হ্যারির গা ঘেঁষে চলল। নিজেদের দেশীয় ভাষায় মৃদুস্বরে বলল—হ্যারি—অনেক কাজ সামনে। আমি যা বলি তাই করো সেভাবেই চলো। বিরোধিতা করো না। পেছনের একজন সৈন্যের নজরে পড়ল ফ্রান্সিস সৈন্যটি বুঝল—ওরা কোনো গোপন কথা বলছে। দায়িত্ব দেবার সময় দলপতি বারবার বলে দিয়েছে এই বিদেশিরা ভীষণ চালাক। সৈন্যটি এগিয়ে এসে ফ্রান্সিসকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। ওরা একটু দূরে সরে হাঁটতে লাগল। হ্যারি তখন ভাবছে ফ্রান্সিসের এসব কথার মানে কি? তবে কি ফ্রান্সিসের এইসব বিশ্রী ব্যবহার লোক দেখানো? হ্যারি ভীষণ ধন্দে পড়ে গেল।
সেই বাড়িটির সামনে এলো সবাই। একজন লম্বামতো সৈন্য আধভাঙা দরজায় ধাক্কা দিল। দু’বার ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে গেল। দেখা গেল সিনার্কার একজন সৈন্য দাঁড়িয়ে আছে। বোঝা গেল মারিয়াকে পাহারা দেবার জন্যেই তাকে এখানে রাখা হয়েছে। বাঁদিকের শেষ ঘরটায় অসুস্থ মারিয়া আছে। ঢোকার আগে ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল—হ্যারি সৈন্যদের বলো যে এখন আমি তোমাকে আর কামেরাতকে নিয়ে রানী ইসাবেলার নকশা খুঁজে বের করতে সারা বাড়ি তল্লাশি চালাবো। আরো বল—সিনার্কা এ ব্যাপারে আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছেন। বলেছেন এ সময় আমাদের স্বাধীন চলাফেরায় কেউ বাধা দেবে না। হ্যারি একটু চুপ করে থেকে লো ল্যাতিন ভাষায় সৈন্যদের কথাগুলো বলল। সৈন্যরা পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। ফ্রান্সিস বলল—ওদের বলো যে মারিয়ার ঘরের পাহারাদার সৈন্যকে ঐ ঘরেই থাকতে হবে। বাকিরা এখানে সদর দরজায় দাঁড়িয়ে আমাদের পাহারা দেবে। হ্যারি সেকথা সৈন্যদের বলল। সৈন্যরা সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল।
ফ্রান্সিস হ্যারি আর কামেরাতকে নিয়ে চলল। মারিয়ার পাহারাদার সৈন্যটি মারিয়ার ঘরের দিকে চলে গেল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে হ্যারিকে বলল—কামেরাতকে নিয়ে ডানদিকের বারান্দা দিয়ে চলো। তাড়াতাড়ি। হ্যারি বুঝল—ফ্রান্সিস নিশ্চয়ই কিছু পরিকল্পনা নিয়েছে। ও কামেরাতের হাত ধরে বলল—শিগগির ডান দিকের বারান্দা না দিয়ে চলো৷ তিনজনে প্রায় ছুটে চলল। শেষ ঘরটার দরজা ঠেলে ফ্রান্সিস ঢুকে পড়ল। পেছনে হ্যারি আর কামেরাত।
ঘরটা অন্ধকার অন্ধকার। ফ্রান্সিস ঘরটায় ঢুকেই কামেরাতকে বলল–স্পেনীয় ভাষা বোঝ?
কামেরাত স্পেনীয় ভাষাতেই বলল—বুঝি-বলতে-ভালো—পারি না।
ফ্রান্সিস বলল—শিগগির আমাকে একটা কাগজ কালি কলম এনে দাও।
কামেরাত বলল—কেন?
