সিনার্কা যাবার জন্যে ফিরে দাঁড়াল। অমাত্যটি একটু এগিয়ে এসে ফ্রান্সিসের মুখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। একটুক্ষণ। তারপর ভারি গলায় বলল—ঐ অভিশপ্ত ঘর দুটোয় ঢুকতে পারবেন? ফ্রান্সিস একটু হেসে বলল—সব দেখে-শুনে ভাবনা-চিন্তা করে তবেই বলতে পারবো ঢোকা সম্ভব কি না।
জানো-রানী ইসাবেলার প্রেতাত্মা একটা মোমবাতি হাতে সারারাত ঘরটায় ঘুরে বেড়ায়। আমাদের দুর্গরক্ষী সৈন্যরা আমাকে বলেছে ঐ ঘর দুটোয় নাকি পা ঘষে ঘষে চলার অস্পষ্ট শব্দ শুনেছে। কাঠের দরজাটায় নাকি টোকা দেবার শব্দও শুনেছে। ঐ ঘরের কাছের ঘরগুলোয় যোদ্ধারা রাতে থাকতে সাহস পায় না। সেই ঘরগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। অমাত্যটি থামল। তারপর বলল—এত সব জানার পরও তুমি ঐ ঘর দুটোয় ঢুকতে যাবে? সে সাহস আছে তোমার? ফ্রান্সিস সহজভাবে বলল—আপনারা তো আমাকে আর আমার বন্ধুকে ফাঁসিই দেবেন। ফাঁসিতে মরার আগে না হয় প্রেতাত্মার হাতেই মরবো। অমাত্যটি ফ্রান্সিসের আরো কাছে এসে ফিসফিস করে বলল—তুমি যদি ঐ ঘরে ঢোকার চেষ্টা না করে তবে তোমাদের মুক্তির জন্যে সিনার্কাকে আমি রাজি করাবো। ফ্রান্সিস একটু চুপ করে থেকে বলল ঠিক আছে—আপনার এই করুণার কথাটা ভেবে দেখি। পরে যা বলার বলবো।
অমাত্যটি আর কিছু বলল না। সিনার্কার পেছনে পেছনে চলল। একটু পরে ঠং ঠাং শব্দে কয়েদঘরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
ফ্রান্সিস এতক্ষণের কথাবার্তায় বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। এবার ঘাসের বিছানাটায় বসল। তারপর হ্যারির পাশে শুয়ে পড়ল। হ্যারি এতক্ষণ মাথা নিচু করে নির্বাক বসেছিল। যে রোক্কার জন্যে মারিয়াকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হল সেই রোক্কাকে ফ্রান্সিস লোকটা’ লোকটা’ বলে শুধু অপমান করলে না ডাহা মিথ্যে কথা বলে সিনার্কার মতো একটা অত্যাচারী শাসককে নির্লজ্জের মতো তোষণ করল। ফ্রান্সিসের এই অধঃপতন দেখে দুঃখে হতাশায় হ্যারির বুক ভেঙে যেতে লাগল। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে ডাকল—হ্যারি হ্যারি ডাকটা শুনেও অনড় বসে রইল। ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকাতেও ঘৃণাবোধ করল।
হঠাৎ রোক্কা হো হো করে হেসে উঠল। বলল—ভাইকিংরা-বীর, দুঃসাহসী সৎ-বিবেকবান। পরক্ষণেই শায়িত ফ্রান্সিস আর হ্যারির দিকে তাকিয়ে প্রচণ্ড ঘৃণাময় মুখ চোখ কুঁচকে থুতু ফেলল—-থু-থুঃ—।
অপমানে হ্যারির চোখ কান জ্বালা করে উঠল। দুচোখ জ্বলে ভিজে উঠল। কিন্তু ও কাঁদতেও পারল না। ও চোখ বন্ধ করে বসে রইল।
শুনল ফ্রান্সিস খুব মৃদুস্বরে ডাকল—হ্যারি হ্যারির আর সহ্য হল না। ও মুখ তুলে চিৎকার করে বলে উঠল—তোমার সঙ্গে কথা বলতে আমার—আমার ঘৃণা—হ্যারি আর বলতে পারল না। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। আবাল্য বন্ধু ফ্রান্সিস নিজের জাত ভাইয়ের চেয়েও যে ফ্রান্সিসকে বেশি ভালোবাসে স্বপ্নেও ভাবে নি সেই ফ্রান্সিসকে এত বড়ো কঠিন কথা ও বলতে পারবে। হ্যারি হাঁপাতে লাগল। রোক্কা যেভাবে ফ্রান্সিসকে অপমান করল হ্যারি কখনও ফ্রান্সিসকে এরকম অপমানিত হতে দেখেনি। হঠাৎ রোক্কা দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে একলাফে শায়িত ফ্রান্সিসের কাছে এলো তারপর ডান পা চালাল ফ্রান্সিসের পেঠের ধারে। ওঁক করে ফ্রান্সিসের মুখ দিয়ে শব্দ বেরিয়ে এলো। লাথি খেয়ে বিছানার ওপর দুপাক ঘুরে গেল। রোক্কা চিৎকার করে বলে উঠল—অকৃতজ্ঞ জানোয়ার। দু পা ছুটে এসে আবার পা তুলল। ফ্রান্সিস তড়িৎ গতিতে উঠে দাঁড়াল। তারপর বাঁধা দুটো হাতের মুঠি দিয়ে রোক্কার থুতনিতে এত জোরে ঘা মারল যে রোক্কা চিৎ হয়ে ছিটকে পড়ল। ঘাসের বিছানার বাইরে। পাথুরে দেয়ালে মাথাটা ঠুকে গেল। আঁ—একটা যন্ত্রণাকাতর শব্দ তুলে রোকা অনড় পড়ে রইল। মশালের আলোয় হ্যারি দেখল—রোক্কার কপালের কাটা জায়গাটা থেকে রক্ত বেরিয়ে আসছে। একে তলোয়ারের ঘায়ে রোক্কার শরীর ক্ষতবিক্ষত। তার ওপর এই মার খাওয়া। রোক্কা গোঙাতে লাগল। ক্রুদ্ধ কামেরাত এবার উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলে উঠল খবরদার-চুপ করে বসে থাকো। কামেরাত কথাটার অর্থ বুঝল না। কিন্তু ফ্রান্সিসের ধমক খেয়ে ও কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। দাঁড়িয়ে রইল।
তখনই ঘটঘটাং শব্দ তুলে লোহার দরজা খুলে গেল। রক্ষীরা কয়েকজন খাবারদাবার নিয়ে কল। বোকার অন্য তিন বিদ্রোহী বন্ধু ক ঘটল তা দেখল কেন রোল্ক এত ক্রুদ্ধ হল বুঝল না।
রোক্কা বাদে সবাই খেতে বসল। কামেরাত কোনোরকমে রোক্কাকে উঠিয়ে বসাল। রোক্কার সামনেও খাবার দেওয়া হল। গোল কাটা রুটি। বেশ পোড়া। সঙ্গে আলু আনাজের ঝোল। একজন রক্ষী সকলের হাতে দড়ি খুলে দিল। সবাই খেতে লাগল।
ফ্রান্সিস এই সময় যা বরাবর বলে তাই বলল—হ্যারি-পেট পুরে খাও। খেতে ভালো না লাগলেও খাও। হ্যারির মনে পড়ে গেল অতীতের কত বন্দি জীবনের কথা। ও একটু। আশ্চর্য হয়েইফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। এত কাণ্ডের মধ্যেও ব্যারি দেখল ফ্রান্সিস নির্বিকার।
সকলের খাওয়াদাওয়া হয়ে গেলে একজন রক্ষী ফ্রান্সিস আর হ্যারিকে বলল—তোমরা দুজন মুক্ত। ফ্রান্সিস কথাট বুঝল না। তবে দেখল রক্ষীটি অন্য সবাইয়ের দু হাত বেঁধে দিল। কিন্তু ফ্রান্সিস আর হ্যারির খোলা হাত আর বাঁধল না। এবার ফ্রান্সিস বুঝল—সিনার্কা কথা রেখেছে। ওদের মুক্তি দিয়েছে। অবশ্যই নিজের স্বার্থোদ্ধারের জন্যে-রানী ইসাবেলার রত্নভাণ্ডার যদি এরা উদ্ধার করে দিতে পারে—এই আশায়। রত্নভাণ্ডার উদ্ধার করতে পারলে সিনার্কার লাভ। উদ্ধার করতে গিয়ে বিদেশিটা মরে গেলেও সিনার্কার কোনো ক্ষতি নেই। ফ্রান্সিস চোখ বুজে একটু ভেবে নিল। তারপর উঠে দাঁড়াল। ডাকল—হ্যারি হ্যারি উত্তর দিল না। চুপ করে বসে রইল। ফ্রান্সিস বলল—হ্যারি—চলো যে বাড়িতে অসুস্থ মারিয়া রয়েছে সেখানে যেতে হবে।
