হঠাই দুর্গের পাহারাদারদের মধ্যে ডাকাডাকি কথাবার্তা শোনা যেতে লাগল।
একটু পরেই ঠাঠাং-ঠং শব্দে কয়েদঘরের দরজা খুলে গেল। ঘরে ঢুকল সিনার্কা। হ্যারি আস্তে বলল—ফ্রান্সিস সিনার্কা এসেছে। ফ্রান্সিস উঠে বসল। দেখল—এখন নানা রঙের ফুলপাতা তোলা গাঢ় নীল একটা ঢোলাহাতা দামি কাপড়ের পোশাক সিনার্কা পরে আছে। মাথার কাঁচাপাকা চুল পরিপাটি আঁচড়ানো। চোখে ক্রুদ্ধ দৃষ্টি। মুখ লাল হয়ে উঠেছে।
গম্ভীর গলায় সিনার্কা ডাকল—রোক্কা। রোক্কা চোখ খুলল। কিন্তু শুয়েই রইল। “ উঠে বসল না। সিনার্কা পেছনে দাঁড়ানো দলপতির দিকে তাকাল। দলপতি সঙ্গে সঙ্গে কোমরবন্ধ থেকে তলোয়ার টেনে খুলল। দু-পা খোঁড়াতে খোঁড়াতে এসে রোক্কার হাতের কনুইয়ের ওপর তলোয়ারের খোঁচা মারল। কেটে গেল জায়গাটা। রক্ত পড়তে লাগল। যন্ত্রণা মুখ বিকৃত করে রোকা উঠে বসল। কাটা জায়গাটা হাত চেপে সিনার্কার দিকে তাকাল। সিনার্কা কেঠো হাসি হেসে বলল—এই যে বিদ্রোহী নেতা—কী ভাবে মরতে চাও বলো—ফাঁসিকাঠে না তলোয়ারের কোপে না জীবন্ত কবরে ঢুকে।
রোক্কা আস্তে আস্তে বলল—আমার কাছে সব মৃত্যুই সমান। তাছাড়া মাতৃভূমির মঙ্গলের জন্য মৃত্যু তো আনন্দের গৌরবের।
—এসব বড়ো বড়ো কথা শুনিয়েই বুঝি দল বাড়িয়েছে। সিনার্কার বলল।
—দল বাড়াতে হয় নি। আপনার প্রজারা আপনার অপশাসনের জন্যে মনে মনে গর্জাচ্ছিল। তবে বিচ্ছিন্নভাবে। আমি শুধু ওদের একত্র করেছি। অর্ধেক কাজ আপনিই করে রেখেছিলেন। রোক্কা শান্তভাবে বলল।
—চোপ শয়তান—সিনার্কা যেন গর্জন করে উঠল। রোক্কা আর কোনো কথা বলল না। চোখ বুজে চুপ করে বসে রইল। সিনার্কার পেছনেই দাঁড়িয়েছিল একজন কাঁচাপাকা চুলদাড়িওয়ালা অমাত্য। তার গায়েও দামি কাপড়ের জোব্বা মত। নিশ্চয়ই সিনার্কার পরামর্শদাতা। লোকটি এবার একটু ক্রুদ্ধ সিনাৰ্কার কানের কাছে মুখ এনে মৃদুস্বরে বলল—এখন মাথা গরম করবেন না। তারপর বলল—রোক্কাকে বন্দি করা হয়েছে এই খবর আপনি বেশিদিন গোপন রাখতে পারবেন না। আজ রাতেই রোক্কাকে জাহাজে নিয়ে গিয়ে নিকেশ করে দিন। কেউ খোঁজই পাবে না। কথাগুলো আস্তে বললেও হ্যারি কিছু কথা শুনতে পেল। বাকিটুকু আন্দাজে বুঝে নিয়ে নিজেরে দেশের ভাষায় ফ্রান্সিসকে এই কথাগুলো ফিসফিস্ করে বলে বুঝিয়ে দিল। সিনার্কা তখন মাথাটা একটু ওঠানামা করে ফ্রান্সিসদের দিকে তাকাল। বলল—তোমরা কারা? হ্যারি বলল—আপনার দলনেতা আমাদের সব কথা জানেন। সিনার্কা দলপতির দিকে তাকাল। দলপতি দুপা খুঁড়িয়ে এসে ফ্রান্সিসদের সম্পর্কে যা জানে মৃদুস্বরে বলল। সিনার্কা ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে স্পেনীয় ভাষায় বলল—হুঁ—তোমরা ভাইকিং-জলদস্যুর দল-জাহাজ লুঠ করো।
—মাননীয় সিনার্কা—হ্যারি বলল—আপনার দলপতিকে জিজ্ঞেস করুন। তিনিই সব বলতে পারবেন।
তখন দলনেতা জানাল যে ভাইকিংদের জাহাজ তল্লাশি করা হয়েছিল। লুঠের জিনিসপত্র কিছু পাওয়া যায় নি।
সিনার্কা বলল—ঐ বাড়িটায় রোকা আত্মগোপন করেছিল। তোমরা ওখানে কী করছিলে?
—আমাদের রাজকুমারী খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তার চিকিৎসার জন্যই হ্যারি কথাটা শেষ করতে পারলো না। সিনার্কা বলে উঠল—বাজে কথা—তোমরা রোক্কার বিদ্রোহী দলে যোগ দিয়েছিলে। তোমাদেরও রেহাই নেই।
এবার হঠাৎ ফ্রান্সিস এক লাফে উঠে দাঁড়াল। মাথা অনেকটা নুইয়ে একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। একজন বিদেশির কাছে এই সম্মান পাওয়ায় সিনার্কা বেশ কুশিই হল। হ্যারি অবশ্য একটু অবাকই হল। ওদের দেশের রাজাকেও ফ্রান্সিস এতক্ষণ মাথা নুইয়ে সম্মান জানায় না। ফ্রান্সিস এবার আস্তে আস্তে মাথা তুলে বলল—মহামান্য রাজা—সার্দিনিয়া দ্বীপেও লোকমুখে আপনার কত প্রশংসা শুনেছি। জ্ঞানী বিচক্ষণ আর প্রজাবৎসল রাজা হিসেবে আপনার গুণগান করে এখানকার আপনার প্রজারা। আমি শুনেছি সেসব। তখন থেকেই আপনাকে একবার দর্শন করবার জন্য প্রাণ আকুল হয়ে ছিল। আজ আপনাকে দর্শন করে আমার জীবন ধন্য হল। কথা শেষ করে ফ্রান্সিস আবার মাথা নিচু করে রইল। কিছুক্ষণ। এবার সিনার্কা খুশির হাসি হেসে বলল—ঠিক আছে তুমি কি বলতে চাও বলো। ফ্রান্সিস মাথা তুলল। আঙ্গুল তুলে রোক্কাকে দেখিয়ে বলল মহামান্য রাজা—এই লোকটা প্রবঞ্চক ঠগবাজ। রোক্কা চম্কে ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে রইল। হ্যারি আর কামেরাতেরও এক অবস্থা। রোক্কা কোনো কথা বলল না। ফ্রান্সিস বলল—মাননীয় রাজা—এই লোকটা আমাদের কয়েদ-ঘর থেকে পালাবার ব্যবস্থা করেছে। আমাদের রাজকুমারী চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেব বলে ভুলিয়ে ভালিয়ে রাজকুমারীর মূল্যবান গয়নার বাকশো চুরি করেছে। তারপর আমাদের ঐ বাড়িতে বন্দি করে রেখেছিল।
রোক্কা ফ্রান্সিসের দিকে চেয়ে থেকে ম্লান হাসল–মানুষ এক অকৃতজ্ঞ হয়। হ্যারি উঠে দাঁড়িয়ে ফ্রান্সিসকে বাধা দিতে গেল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে ধমক দিয়ে বলে উঠল—চুপ করে থাকো। এমন একজন মহান রাজার বিরুদ্ধে যারা বিদ্রোহ করে মৃত্যুই তাদের একমাত্র শান্তি। কথাটা শেষ করে ফ্রান্সিস আবার মাথা নিচু করল। সিনার্কা একজন সামন্তরাজা মাত্র। তাকে একবারে কর্সিকা দ্বীপের মহামান্য রাজার মতো সম্মান দিল ফ্রান্সিস সিনার্কা খুশিতে আটখানা। সিনার্কা সগর্বে হেসে অমাত্য দলপতি আর সৈন্যদের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বলল ঠিক আছে সে ব্যবস্থা হচ্ছে। এবার তুমি কী চাও বলো। ফ্রান্সিস মাথা নিচু অবস্থাতেই বলল—যদি অভয় দেন তো বলি।
