ফ্রান্সিসদের রোক্কার সঙ্গে দাঁড় করানো হল। চারদিক থেকে খোলা তলোয়ার হাতে সৈন্যরা ওদের ঘিরে দাঁড়াল। তাদেরই দলপতি বোধহয়—তলোয়ার উঁচিয়ে হাঁটতে নির্দেশ দিল। ফ্রান্সিসদের মাঝখানে রেখে সৈন্যরা হাঁটতে শুরু করল। ফ্রান্সিসরা চলল সদর রাস্তা দিয়ে।
হাঁটতে হাঁটতে ফ্রান্সিস বলল-রোক্কা—আপনি বেশ আহত। বৈদ্যমশাইকে বলে ওষুধ লাগালে পারতেন।
রোক্কা ম্লান হেসে বলল—বৈদ্যমশাই দূরের গ্রামে রোগী দেখতে গেছেন। এখানে থাকলেও সিনার্কার সৈন্যরা ওষুধ লাগাতে দিতো না। সিনার্কা আমাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে ফাঁসির হুকুম দেবে। কথাটা শুনে ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ল। দৃঢ়স্বরে বলল—আমি বেঁচে থাকতে নয়। রোক্কা একটু আশ্চর্য হল। ফ্রান্সিস ওর স্বজন নয় স্বদেশবাসীও নয়। ফ্রান্সিসের মুখের দিকে একবার তাকাল। মৃদুস্বরে বলল—কিন্তু আপনি আমাকে বাঁচাবেন কেন? এবার ফ্রান্সিস হাঁটতে হাঁটতে বলল—কারণ আপনি মারিয়াকে প্রাণে বাঁচিয়েছেন। নইলে এই বিদেশ বিভূঁইয়ে মারিয়াকে আমরা বাঁচাতে পারতাম না। আমি অকৃতজ্ঞ হতে শিখি নি। রোক্কা প্রশংসার চোখে ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল।
ফ্রান্সিসরা চলল। সদর রাস্তার দুপাশের বাড়িঘর নিস্তব্ধ। জনশূন্য পথে শুধু সৈন্যদের পায়ের শব্দ।
রোক্কা হঠাৎ বলে উঠল—এইবার বুঝেছি। ফ্রান্সিস রোক্কার দিকে তাকাল। রোক্কা বলল—মনে আছে আপনার—সেই দরজা একটু ফাঁক করে পরাজিত সিনার্কা আর সৈন্যদের ফিরে আসা দেখছিলাম।
—হ্যাঁ। কিন্তু দরজার ততটুকু ফাঁক দিয়ে—।
রোক্কা মাথা নেড়ে বলল—না—খুশিতে মাথার ঠিক ছিল না। হঠাৎই দরজাটা একটু বেশি ফাঁক করে ফেলেছিলাম। তখনই নিশ্চয়ই সিনাৰ্কার সৈন্যদের কেউ আমার মুখ দেখে ফেলেছিল। আমি তখন বুঝতে পারিনি। নিজের বোকামির জন্যে আবার ধরা পড়লাম।
আপনার বিদ্রোহী বন্ধুরা কি এই সংবাদ পেয়েছে? হ্যারি বলল।
রোক্কা মাথা নেড়ে বলল—না—। একমাত্র কামেরাতকে দিয়ে এই খবর পাঠাতে পারতাম। কিন্তু সেও তো বন্দি।
—তবে এই খবর কি গোপন থাকবে—নিশ্চয়ই কালকে আপনার বন্ধুরা খবর পেয়ে যাবে। হ্যারি বলল।
রোক্কা মাথা নেড়ে বলল—উঁহু—সিনার্কা অত্যন্ত ধূর্তও আমার বন্দি হওয়ার খবর কিছুতেই ফাঁস হতে দেবে না। গোপনে আমাকে মেরে ফেলবে। কথাটা শুনে ফ্রান্সিস বেশ আশ্চর্য হল। বুঝল—বিদ্রোহীদের কাছে একটা যুদ্ধে হেরে গিয়ে সিনার্কা এখন আহত বাঘের মতো ক্ষেপে আছে। অনেক ভেবেচিন্তে এগোতে হবে। কোনোরকমে একটা সুযোগ পেলেই রোক্কার পালাবার ব্যবস্থা করতে হবে।
সৈন্যদের পাহারায় ফ্রান্সিসরা যখন সেই দুর্গের সামনে এসে পৌঁছল তখন পুব আকাশে লালচে ছোপ লেগেছে। দুর্গের কাছাকাছি গাছে গাছে পাখির ডাক শুরু হয়েছে।
দুর্গের প্রধান প্রবেশ পথের সামনেই দেখা গেল সেই দাড়িগোঁফওয়ালা শক্তসমর্থ চেহারার দলপতি দাঁড়িয়ে আছে। বাঁ পায়ের হাঁটুতে মোটা কাপড়ের পট্টি বাঁধা। শাঙ্কোর তিরের ক্ষত এখনও শুকোয় নি।
দলপতি বেশ খোঁড়াতে খোঁড়াতে ফ্রান্সিসদের দিকে এগিয়ে এলো। চিৎকার করে বলল–সৈন্যরা সব দরজার কাছে সার বেঁধে দাঁড়াও। ফ্রান্সিসদের চারপাশ থেকে সৈন্যরা দ্রুত চলে গিয়ে দুর্গের ফটকের সামনে সার বেঁধে দাঁড়াল। দুর্গরক্ষীরাও স্থির হয়ে দাঁড়াল। দলপতি বলতে লাগল—মাননীয় সিনার্কার হুকুম বিদ্রোহী নেতাকে যে বন্দি করা হয়েছে—এই সংবাদ একেবারে গোপন রাখতে হবে। কোন সাধারণ প্রজার কানে যেন এই সংবাদ না যায়। বুঝেছো? সৈন্যরা হাতের তলোয়ার আর বর্শা উঁচু করে ধরল। নামাও। দলপতি গলা চড়িয়ে বলল। সৈন্যরা তলোয়ার বর্শা নামাল।
কয়েকজন সৈন্য দ্রুত এসে ফ্রান্সিসদের ঘিরে দাঁড়াল। ঘড় ঘড় শব্দে ফটকের বিরাট কাঠের দরজার একটা পাল্লা খুলে গেল। দলপতি ফ্রান্সিসদের দুর্গে ঢোকাতে ইঙ্গি
ত করল। ফ্রান্সিসরা দরজার দিকে চলল।
পাথুরে চত্বর পার হবার সময় হ্যারি ফ্রান্সিসকে সিনার্কার হুকুমের কথা বলল। তারপর বলল—দলপতিকে বলবো আহত রোক্কার চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে।
—পাগল হয়েছে—রোক্কার প্রতি সহানুভূতি চাইলে আমাদের বিপদ বেড়ে যাবে। কোনো কথা বলো না। দেখা যাক কী হয়। ফ্রান্সিস বলল।
সেই কয়েদঘরের লোহার দরজা ঘটাং-ঘং শব্দে খোলা হল। ফ্রান্সিসরা কয়েদঘরে ঢুকল। দেয়ালের আটকানো মশালের আলোয় দেখল তিনজন বন্দি ঘাসের দড়ি বাঁধা বিছানায় ঘুমিয়ে আছে। দরজা খোলার শব্দে দুজনের ঘুম ভেঙে গেল। একজন উঠে বসল। রোক্কাকে ঘরে ঢুকতে দেখেই সে চমকে উঠল। ছুটে এলো রোেক্কার কাছে। বলল—রোক্কা—আপনি বন্দি হলেন—আমরা কি হেরে গেছি?
রোক্কা বলল—নানা। আমি আমার বোকামির জন্যে ধরা পড়েছি। খুব পরিশ্রান্ত আমি। পরে কথা হবে। রোক্কা আর কোনো কথা না বলে সেই ঘাসের বিছানায় বসে দড়ি বাঁধা দুহাত মাথার দিকে তুলে শুয়ে পড়ল।
ফ্রান্সিস হ্যারি ও বিছানায় বসল। ফ্রান্সিস ও কাত হয়ে শুয়ে পড়ল। কামেরাতও বসল। বন্দি দু’জন কামেরাতের পাশে বসল। ওরা নিম্নস্বরে কথা বলতে লাগল। হ্যারি চুপ করে বসে রইল। ফ্রান্সিসের মাথায় তখন নানা চিন্তা। ওদিকে মারিয়া এখনও সম্পূর্ণ সেরে ওঠেনি। বন্ধুরাও জানে না ওদের বন্দিদশার কথা। যে রোক্কার জন্যে মারিয়াকে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হল সেই রোক্কার নিজের জীবন আজ বিপন্ন। ফ্রান্সিসের ভাবনার শেষ নেই যেন তখনও ফ্রান্সিসদের কিছু খাওয়া জোটে নি।
