তাতে কি! কাজে লাগলে তুমি থাকবে তখন। ফ্রান্সিস বলল।
তখন গভীর-রাত। কিছুটা সুস্থ মারিয়ার কাশি অনেক কমে গেছে। শ্বাস-প্রশ্বাস অনেক স্বাভাবিক এখন। গত কয়েকদিন ধরে উৎকণ্ঠায় উদ্বেগে ফ্রান্সিসের ভালো করে ঘুমই হতো না। আজ অনেকটা নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমুচ্ছে। মেঝেয় একটা মোটা কাপড় বিছিয়ে নিয়ে ফ্রান্সিস আর হ্যারি ঘুমিয়ে আছে। কাঠের পাঠাতনের বিছানায় মারিয়া ঘুমিয়ে আছে। মোটা মোমবাতিটা জ্বলছিল।
হঠাৎ বাড়িটার-চারদিকে কোলাহল শোনা গেল। ফ্রান্সিসের ঘুম ভেঙে গেল। ও দ্রুত উঠে বসল। ছুটে গরাদ দেওয়া জানালাটার কাছে এলো। গরাদের ফাঁক দিয়ে দেখল সিনার্কার সৈন্যরা দল বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েকজনের হাতে জ্বলন্ত মশাল। মশালের আলোয় দেখল—প্রত্যেকটি সৈন্যের হাতে খোলা তলোয়ার। ওরা চিৎকার হৈ হল্লা করছে।
হ্যারি আর মারিয়ারও তখন ঘুম ভেঙে গেছে। দুর্বল মারিয়া বিছানা থেকে নামল না। হ্যারি ছুটে এসে ফ্রান্সিসের পাশে দাঁড়াল। মারিয়া দুর্বলস্বরে বলল—কী হয়েছে ফ্রান্সিস ?—সিনার্কার কিছু সৈন্য এই বাড়িটার কাছে জড়ো হয়েছে। কিন্তু ওরা কেন এসেছে জানি না। ফ্রান্সিস মারিয়ার কাছে আসতে আসতে বলল।
তখনই সৈন্যদের প্রচণ্ড ধাক্কায় সদর দরজাটা ভেঙে পড়ল। চিৎকার আরো বাড়ল। দড়াম করে ফ্রান্সিসদের ঘরের দরজাটা খুলে গেল। কামেরাত এক লাফে ঘরে ঢুকে বলে উঠল—শিগগির পালিয়ে যান। ওর কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই দু’জন সৈন্য ঘরে ঢুকল। সামনের সৈন্যটি কামেরাতের মাথার ওপর তলোয়ার তুলল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গিয়ে ডান পা তুলে সৈন্যটার বুকে প্রচণ্ড জোরে লাথি মারল। সৈন্যটা ছিটকে দেয়ালের গায়ে গিয়ে পড়ল। ওর হাত থেকে তলোয়ারটা ছিটকে গেল। পেছনের সৈন্যটি তলোয়ার হাতে কী করবে বুঝে উঠতে পারলো না। ওরা বোধহয় স্বপ্নেও ভাবেনি ওরা এভাবে আক্রান্ত হতে পারে। ছিটকে পড়া তলোয়ারটা ফ্রান্সিস দ্রুত তুলে নিল। রুখে দাঁড়াল। মোমবাতির আলোয় ফ্রান্সিসের ঐ ইস্পাত কঠিন ভঙ্গ ীতে দাঁড়ানো দেখে মারিয়া আশ্চর্য হয়ে গেল। ফ্রান্সিসের এই চেহারা তো কখনও দেখেনি। হ্যারি কিন্তু আশ্চর্য হল না। ফ্রান্সিসের এই ক্রুদ্ধমূর্তি ও আগেও দেখেছে। সৈন্য দু’জন তখন হতবাক দাঁড়িয়ে আছে। হ্যারি বলল—তোমাদের সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে তার নাম ফ্রান্সিস ওর হাতে তলোয়ার থাকলে কেউ ওর গায়ে আঁচড়টিও কাটতে পারবে না। কাজেই লড়াইয়ে যেয়ো না। হ্যারির লো ল্যাতিন ভাষা ওরা বুঝল। পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল। কামেরাতও অবাক তখন।
বেশ ভীতস্বরে মারিয়া বলে উঠল—ফ্রান্সিস শান্ত হও। মারিয়ার গলার স্বর কানে যেতেই ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে উদ্যত তলোয়ার নামাল। আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হল ফ্রান্সিস এতক্ষণে ফ্রান্সিস বুঝলমারিয়া সম্পূর্ণ সুস্থ হয়নি। এই অবস্থায় লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়া বোকামি। আস্তে আস্তে হ্যারিকে বলল—কামেরাতকে জিজ্ঞেস করো তো—রোক্কা কোথায়? হ্যারি কামেরাত ফিসফিস করে বলল সেকথা। কামেরাতও ফিসফিস করে বলল—উদতবের ঘরে আত্মগোপন করেছিলেন। এতক্ষণে বোধহয় ধরা পড়েছেন। ফ্রান্সিসকে হ্যারি বলল সেকথা। ফ্রান্সিস হাতের তলোয়ারটা মেঝেয় ফেলে দিল। ঝনাৎ শব্দ হল। মারিয়া দুর্বল শরীরে বিছানায় বসে থাকতে পারল না। আস্তে আস্তে শুয়ে পড়ল। হাঁপাতে লাগল।
ততক্ষণে আরো কয়েকজন সৈন্য দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। ফ্রান্সিস সৈন্যদের দেখে বলল—হ্যারি, কামেরাতকে বলো—লড়াই নয়—আত্মসমর্পণ। তাদের থেকে দু’জন ছুটে এসে ফ্রান্সিস হ্যারি আর কামেরাতকে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলল। ওরা কেউ বাধা দিল না। সৈন্যরা মারিয়াকে বন্দি করবে কিনা বুঝে উঠতে পারল না। হ্যারি মারিয়াকে দেখিয়ে বলে উঠল—উনি মারিয়া আমাদের দেশের রাজকুমারী। রাজকুমারী অসুস্থ। তাকে বন্দি করলে ফল ভালো হবে না। একজন সৈন্য এগিয়ে এসে হ্যারিকে বলল—তোমাদের রাজকুমারীকে এখন ছেড়ে দেওয়া হল। ও তো অসুস্থ। পালাতে পারবে না। মাননীয় সিনার্কার হুকুম হলে পরে বন্দি করা যাবে। তোমরা চলো।
—কোথায়? হ্যারি বলল।
—গেলেই দেখতে পাবে। একজন সৈন্য বলে উঠল। হ্যারি ফ্রান্সিসকে বলল সব কথা। ফ্রান্সিস বলল ঠিক আছে। ওদের কথামতোই এখন চলতে হবে।
ফ্রান্সিস দরজার দিকে যেতে যেতে বলল—মারিয়া—এখানেই থেকো। তুমি এখনও সম্পূর্ণ সুস্থ হও নি, ভয় নেই—আমরা ঠিক অক্ষত শরীরে ফিরে আসবো।
ফ্রান্সিসের পেছনে পেছনে হ্যারি আর কামেরাত চলল। পেছনে তলোয়ার হাতে সৈন্যরা। ফ্রান্সিসরা চলে যেতে মারিয়া ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। এক নিজের শরীরে এই অবস্থা তারওপর ফ্রান্সিসরাও বন্দি হল। নিজেকে মারিয়ার বড়ো অসহায় মনে হতে লাগল। কান্নায় ওর শরীর ফুলে ফুলে উঠতে লাগল।
ফ্রান্সিসদের নিয়ে সৈন্যরা বাড়িটার বাইরে এলো। দেখা গেল খোলা তলোয়ার হাতে একদল সৈন্য দাঁড়িয়ে এবং সৈন্যদলের মধ্যে পেছনে হাত-বাঁধা অবস্থায় রোক্কা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। রোক্কার গায়ের পোশাক এখানে-ওখানে ছিঁড়ে গেছে। সেখানে গায়ের ক্ষত দেখা যাচ্ছে। কপালে গলায় কানের পাশে তলোয়ারের ক্ষতগুলো থেকে রক্ত পড়ছে। রোক্কা তখনও ভেবে পাচ্ছে না সিনার্কার সৈন্যরা কীভাবে খবর পেল ও এই বাড়িতে আত্মগোপন করে আছে। ফ্রান্সিস দেখে নিশ্চিন্ত হল যে বৈদ্যমশাইকে বন্দি ও করা হয় নি। মারিয়ার চিকিৎসার কোনো ব্যাঘাত হবে না। ফ্রান্সিস স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
