তারপর? মারিয়া বলল। রোক্কা বলতে লাগল, রানী ইসাবেলা একদিন বোনিফেসিওর ঐ দুর্গে যার নীচের কয়েদঘরে আমরা বন্দি ছিলাম—সেই দুর্গে গেলেন। ওপরের দিকের দুটি কক্ষ দেখলেন এবং সেইদিন থেকেই তাঁর নির্দেশে ঐ দুইটির একটি কক্ষে খাদ্য, আনাজপত্র এবং দীর্ঘদিনেও নষ্ট হয় না এমন ম্যাকুয়েস-দানা, সেজ আলু, জলপাই প্রচুর রাখা হলো। সেইসঙ্গে জলের বেশ বড়ো কয়েকটি পিপে। খুবই গোপনে বিশ্বস্ত কিছু প্রাসাদরক্ষীরা করল এসব। তারপর একদিন গভীর রাতে রানী তার ঘুমন্ত কন্যাকে নিয়ে দুর্গের সেই কক্ষ দুইটির একটিতে আশ্রয় নিলেন। কথা ছিল রাজা জেমসও রাজকোষের স্বর্ণমুদ্রা একত্র করে নিয়ে পালিয়ে সেই কক্ষে আশ্রয় নেবেন। কিন্তু শেষ রাতে সিনার্কার অর্থ দিয়ে প্রাসাদরক্ষীদের বশীভূত করে জেনো সৈন্যদের নিয়ে প্রাসাদ আক্রমণ করল। রাজা জেমস বন্দি হলেন। হয়তো তিনি প্রাণে বেঁচে যেতেন। হয়তো তাকে জেনোয়ায় নিয়ে গিয়ে বন্দি করে রাখা হতো। কিন্তু ঐ যে বললাম, ভেনদেত্তা—রাজা জেমস-এর আত্মীয়রা রাজাকে হত্যা করে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করল। রোক্কা থামল।
আর রানী ইসাবেলা ও রাজকুমারী? ফ্রান্সিস বলল।
রানী ইসাবেলা রাজা জেমসের মৃত্যুসংবাদ পেয়েই দুর্গরক্ষীদের আদেশ দিলেন ঐ ঘর দুটি থেকে নামার সিঁড়িটা ভেঙে ফেলতে। রক্ষীর অবাক হয়ে গেল। ওরা বুঝল না—রানী ইচ্ছে করে কেন এভাবে নিজেকে ও রাজকুমারীকে নিয়ে স্বেচ্ছানির্বাসন নিচ্ছেন। রানী ক্রুদ্ধ হলেন। আবার জোরের সঙ্গে আদেশ দিলেন। অগত্যা দুর্গরক্ষীরা লোহার বড়ো বড়ো শাবল সংগ্রহ করে সিঁড়ির পাথরগুলোর খাঁজে খাঁজে চাড় দিয়ে সিঁড়িটা সম্পূর্ণ ভেঙে দিল। রানীও সিঁড়িতে নামার কাঠের দরজাটা চিরদিনের জন্যে ভেতর থেকে বন্ধ করে দিলেন। দেখলে মনে হবে দুটি ঘরই যেন শূন্যে ঝুলছে। আপনারা পালাচ্ছিলেন, কাজেই ঘর দুটো লক্ষ্য করেননি। রোক্কা থামল।
আর সেইসব রত্নালংকারগুলো? ফ্রান্সিস বলল।
ঐ দুটো ঘরের কোথাও আছে হয়তো। রোক্কা বলল।
হয়তো বলছেন কেন? হ্যারি বলল।
একটা ঘরের একটিমাত্র গরাদ দেওয়া জানালা আছে। পশ্চিমদিকে খাড়া দুর্গের দেওয়ালের গায়ে। এত উঁচুতে যে মাটি থেকে ওখানে ওঠা অসম্ভব। কাজেই ঐ ঘর দুটোয় যাওয়া এবং খোঁজ করার কথা কেউ কল্পনাও করেনি। রোক্কা বলল।
ফ্রান্সিস একটু ভেবে নিয়ে বলল, দুর্গের ওপরটা যতটা দেখেছি তাতে বলতে পারি ওপর থেকে দড়ি বেয়ে নেমে বোধহয় ঐ জানালাটায় পৌঁছানো যায়। রোক্কা বলল, হ্যাঁ আমি শুনেছি পরে নাকি সিনাকার নির্দেশে দু’জন দু’বার ওপর থেকে দড়ি বেয়ে নেমে জানালার লোহার গরাদ ভেঙে ঢোকবার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু দু’জনেই জানালায় গিয়ে দাঁড়াবার সঙ্গে সঙ্গে রানী ইসাবেলা ছোরা মেরে দু’জনকেই ফেলে দিয়েছে নীচের পাথরের চত্বরে। দু’জনেই শেষ।
তারপরেও কি ওভাবে চেষ্টা করা হয়নি? ফ্রান্সিস বলল।
হা হয়েছে—অনেক বছর পরে। সেই লোকটা জানালার কাছে এসে গরাদ ধরে দাঁড়িয়েছিল। তখনই জানালার ওপর থেকে বড়ো পাথরের টুকরো খসে পড়েছিল ওর মাথায়। লোকটা তীর খাওয়া পাখির মতো খসে পড়েছিল জানালা থেকে নীচের পাথরে চত্বরে। তারপরেও হয়তো লুকিয়ে-টুকিয়ে কেউ কেউ চেষ্টা করে থাকবে। হাজার হোক অত মূল্যবান রত্নভাণ্ডার। কিন্তু কেউ গরাদ ভেঙে ঢুকতে পারেনি। গরাদসহ জানালাটা এখনও অটুট আছে। রোক্কা থামল।
ফ্রান্সিসরা কেউ কোনো কথা বলল না। তিনজনেই সমস্ত ঘটনাটা ভাবছে তখন। একসময় ফ্রান্সিস বলল, দুৰ্গটা, জানালাটা ভালো করে দেখতে হবে। কিন্তু দেখতে গেলে তো আবার কয়েদঘর বন্দি করে রাখবে। আমরা তো বিদেশি।
পারবেন ঐ ঘর দুটোয় ঢুকতে? রোক্কা হেসে বলল।
সব দেখেটেখে ভেবে নিয়ে বলতে পারব। ফ্রান্সিস বলল।
তাহলে সিনার্কাকে একবার বলে দেখতে পারেন। সিনাকা যা অর্থপিশাচ আর লোভী ও আপনাকে ঠিক খোঁজ-খবরের অনুমতি দেবে। রোক্কা বলল।
হ্যারি বলল, কী ফ্রান্সিস ? চেষ্টা করবে নাকি? ফ্রান্সিস হেসে একবার মারিয়ার দিকে তাকাল। বলল, হ্যারি, অনেক অভিযানেই বেরিয়েছি বাবার অনুমতি তো নয়ই-মা’র অনুমতিও নিইনি। আজ কিন্তু আমি হার স্বীকার করছি। মারিয়ার অনুমতি পেলে তবেই রত্নভাণ্ডারের উদ্ধারে যাব।
মারিয়া হেসে বলল, আমি জানি আমি মানা করলে তুমি মনে কী ভীষণ কষ্ট পাবে। তুমি চেষ্টা করো—আমাকে তো দু’তিন দিন বিশ্রাম নিতেই হবে। ফ্রান্সিস প্রায় লাফিয়ে উঠল—সত্যি মারিয়া, তুমি আমার মনোভাবটা খুব সহজেই বুঝতে পারো।
রোক্কা বলল, ফ্রান্সিস, আপনি চেষ্টা করুন, আমার আপত্তি নেই। কিন্তু লোকে ঐ ঘর দুটোকে বলে ভূতের ঘর। অনেক অর্থের প্রলোভন দেখিয়েও সিনার্কারা কাউকে ওই জানালার কাছেও পাঠাতে পারেনি। অনেকে রাতের বেলা ঐ জানালায় মোমের অস্পষ্ট আলো দেখেছে। ফ্রান্সিস হেসে বলল, ওসব ভূতেটুতে আমার বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই। আমার ভয়টা একটু কমই। আসল কথা সব কিছুকেই আমি গভীরভাবে চিন্তা দিয়ে, যুক্তি দিয়ে ভাবি এবং সত্য উদ্ঘাটন করি। সব কথাই যাচাই করে নিতে হয়।
পরদিন সকালে মারিয়া অনেকটা সুস্থ হলো। ঘরে পায়চারি করল। ফ্রান্সিস তাই দেখে বলল, মারিয়া এবার তাহলে নিশ্চিন্তমনে সিনার্কার দরবারে যেতে পারি। মারিয়া হেসে ঘাড় নেড়ে বলল, হ্যাঁ। কিন্তু দুঃখ আমি যেতে পারলাম না।
