তাহলে এক কাজ করুন—শুধু হ্যারি নামের আমার বন্ধুটিকে আপনি আসার সময় সঙ্গে নিয়ে আসুন। ফ্রান্সিস বলল।
বেশ। রোক্কা বলল। তারপর চলে গেল।
সন্ধে হলো। কামারেত একটি রুপোর মোমবাতিদানে বসানো মোটা হলুদ রঙের জ্বলন্ত মোমবাতি ঘরে রেখে গেল। ফ্রান্সিস তখনও মারিয়ার বিছানার পাশে বসে মারিয়ার ডান হাতটা ধরে আছে। ফ্রান্সিস বুঝতে পারল জ্বর একেবারে ছেড়ে গেছে। বেশ স্বাভাবিকভাবেই মারিয়া দু’একটা কথা বলছে তখন।
একটু রাত হলে হ্যারিকে নিয়ে রোকা ঘরে ঢুকল। রোক্কাকে একা দেখে ফ্রান্সিস বলে উঠল—হ্যারিকে পেলেন না?
রোক্কা বলল—সে অনেক কথা। গত রাতেই সিনার্কার সৈন্যরা আমাদের বার্গ পাহাড়ের আস্তানার খবর পেয়েছিল। হয়তো সিনার্কার গুপ্তচরেরাই সন্ধান দিয়েছিল। সিনার্কার সৈন্যরা প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টির মধ্যে আমাদের ঘাঁটি আক্রমণ করেছিল। লড়াই হয়েছিল। তবে আমাদের বিদ্রোহীরা বুদ্ধিমানের মতো অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে ঝড়বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে গুহার অন্য মুখটা দিয়ে পালাতে পেরেছিল। হ্যারি আর আপনার ভাইকিং বন্ধুদের নিয়ে আমার বিদ্রোহী বন্ধুরা উত্তর দিকে পালিয়েছে। তবে বার্গ পাহাড় এলাকায় আমার দুই বন্ধুকে রেখে এসেছি। বলে এসেছি ভাইকিংদের মধ্যে হ্যারিকে দেখলে যেন তাকে সঙ্গে নিয়ে এখানেই আসে।
—লড়াই যখন হয়েছে তখন হতাহত হয়েছে কিছু, ফ্রান্সিস বলল।
—হ্যাঁ—তা হয়েছে। সিনার্কার সৈন্যরাও আমাদের বিদ্রোহী যোদ্ধারাও। তবে ভাইকিংরা কেউ হত আহত হয়েছে কিনা সে খবর পাইনি। রোক্কা বলল। তারপর বলল—আমার আর এক বন্ধুকে পাঠিয়েছি পলাতক বিদ্রোহীদের কাছে যেতে। আমি বলে দিয়েছি—সবাই আবার বার্গ পাহাড়ের গুহার ঘাঁটিতে ফিরে আসতে। পাহারা জোরদার করতে বলেছি। যেন আবার আক্রান্ত হবার আগে সবাই তৈরি থাকতে পারে। মনে হয় আমার নির্দেশ পেলে আজকে সন্ধের আগে ওরা বার্গের ঘাঁটিতে ফিরে আসতে পারবে। রোক্কা বলল।
পরের দিন রাতে রোক্কা হ্যারিকে নিয়ে মারিয়ার ঘরে ঢুকল। হ্যারি ঘরে ঢুকে দেখল মারিয়া দুর্বলস্বরে ফ্রান্সিসের সঙ্গে কথা বলছে। হ্যারি এত খুশি হলো যে নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ছুটে গিয়ে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরল। ফ্রান্সিস হেসে হ্যারির পিঠে মৃদু চাপড় দিয়ে বলল, হ্যারি, মারিয়ার বিপদ কেটে গেছে। হ্যারি আনন্দে কোনো কথা বলতে পারল না।
হ্যারি আর রোক্কা মারিয়ার বিছানার পাশে বসল। রোক্কা বলল, রাজকুমারী এখন কেমন আছেন? মারিয়া অল্প হেসে বলল, অনেকটা ভালো।
—ভালো হতেই হবে। সারা কর্সিকায় এই বৈদ্যমশাইয়ের যে কী সুনাম আপনারা তা কল্পনাও করতে পারবেন না। রোক্কা বলল। মারিয়া একটু হেসে বলল, এই কর্সিকা দ্বীপকে পুরনো দিনের নাবিকরা বলত সুগন্ধির দ্বীপ তাই না? রোক্কা বেশ আশ্চর্য হলো। বলল, কত দূরে আপনাদের দেশ অথচ এই ছোট্ট দ্বীপটার কথাও আপনি জানেন দেখছি। আপনি সত্যিই বিদুষী। মারিয়া হেসে বলল, নানা—তেমন কি আর। আমাদের গ্রন্থাগারে বেশ কিছু প্রাচীন হাতে লেখা গ্রন্থ আছে। সে সব পড়েই জেনেছি। একটু থেমে মারিয়া বলল, তবে কর্সিকার অতীত ইতিহাসে দেখা গেছে বিভিন্ন শক্তিমান জাতি শত্রু হিসেবে এই কর্সিকাকে আক্রমণ করেছে। কেউ বন্ধু হিসেবে আসেনি।
ঠিক বলেছেন—রোক্কা মাথা ওঠানামা করে বলল। তারপর বলল, কর্সিকাবাসীদের জীবনে তাই বোধহয় বন্ধুত্ব ভালোবাসার স্থানটা কম। আমাদের জীবনে মৃত্যুটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভেনদেত্তা কথাটা আপনি নিশ্চয়ই পড়েছেন।
হ্যাঁ—খুনোখুনির বদলা নেওয়া। মারিয়া বলল।
ঠিক। আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যেও এই প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে বংশের সবাইকে হত্যা করা এখানে খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। এখানে পেশাদার কাঁদুনেরা আছে। তাদের ভাড়া করে আনা হয়। মৃতের জন্য তারা দীর্ঘদিন ধরে কাঁদে। কান পাতলে অনেক বাড়ি থেকে এই কান্নার শব্দ শুনতে পাবেন। আমাদের গানও তাই বোধহয় বড়ো বিষাদের। বড়ো বেদনার। সেখানে আনন্দের স্থান নেই।
সকলেই চুপ করে রইল। রোক্কার কণ্ঠস্বরে যে বেদনার সুর ছিল তা ফ্রান্সিসদের মন স্পর্ষ করল। ও আর কথা বলতে পারল না। রোক্কা একটু পরে বলল, একজন রানীর কাহিনী আপনাদের বলি। তার নাম ইসাবেলা। প্রায় একশো বছর আগের কথা। এই দক্ষিণ কর্সিকার রাজা ছিলেন তখন দ্বিতীয় জেমস। এখানে নিজেদের আধিপত্য স্থাপনের জন্য মূল ভূখণ্ডের জেনোয়া ও পিসার মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল অনেককাল ধরে। দ্বিতীয় জেমস এই দ্বন্দ্ব মেটাবার জন্যে জেনোয়াবাসী ও পিসাবাসীদের এখানকার অনেক অংশ দিয়ে দিয়েছিলেন। সিনার্কারা ছিল জেনোর মানে জেনোয়ার অধিবাসী। আজকের সিনার্কাদের পূর্বপুরুষরা তখন এখানে ঘাঁটি গাড়ে। রাজা দ্বিতীয় জেমসের সঙ্গে তার আত্মীয়দের এক পারিবারিক বিবাদে সিনার্কার রাজার শত্ৰু আত্মীয়দের সঙ্গে গোপনে যোগ দিয়েছিলেন। রাজা দ্বিতীয় জেমসের রানী ইসাবেলা ঠিক বুঝতে পেরেছিলেন শুধু। রাজার আর তার জীবন নয়, তাদের একমাত্র কন্যারও জীবন বিপন্ন। তাছাড়া পুরুষানুক্রমে রাজা জেমস এবং রানী ইসাবেলার ছিল অতি মূল্যবান রত্নালংকার। কেউ জানেন না কতগুলো অলংকার। তবে লোক-প্রচলিত কাহিনী বলে তার সংখ্যা নাকি অনেক। সিনার্কাদের ভীষণ লোভ ছিল সেই রত্নভাণ্ডারের দিকে। সেই রত্নালংকারগুলো নাকি রাখা ছিল দামি ওক কাঠের একটা পেটিকার মধ্যে। রোক্কা থামল।
