কাছে এলে সবাই দেখল ওদেরই বিদ্রোহী বন্ধু একজন। ঘোড়া থামিয়ে বন্ধুটি সেইগাল-কাটা বিদ্রোহীটির কাছে এলো। বলল—আমি রোক্কার নির্দেশ তোমাদের জানাতে এসেছি। রোক্কা বলেছে তোমরা বার্গের গুহাতেই ফিরে গিয়ে আস্তানা করো। তবে এখন থেকে খুব সাবধানে সর্বক্ষণ নজরদারি চালাতে হবে যেন সিনার্কার সৈন্যদের সঙ্গে ভালো লড়াই চালানো যায়।
অগত্যা রোক্কার নির্দেশ মেনে সবাই ফিরে চলল বার্গ পাহাড়ের আস্তানার দিকে। বেলা বাড়তে লাগল। কামারেত হাতে একটা জলের পাত্র নিয়ে ঘরে ঢুকল। ইঙ্গি তে ওষুধটা মারিয়াকে দিতে হবে জানাল। ফ্রান্সিস অস্তে আস্তে মারিয়ার মাথার পেছনে হাত দিল। বলল, মারিয়া ওষুধ খেয়ে নাও। ফ্রান্সিস মাথাটা তুলে ধরল। কামারেত মারিয়াকে একটু জল খাওয়াল। তারপর শুকনো পাতায় মোড়া দু’টো কালো রঙের বড়ি বের করল। মারিয়াকে খাইয়ে দিল। তারপর আবার জল খাওয়াল। মারিয়া পাত্রের সবটা জলই খেয়ে ফেলল। বোঝা গেল ওর যথেষ্ট জল তেষ্টা পেয়েছিল।
তখনই রোক্কা ঘরে ঢুকল। বলল, ফ্রান্সিস, আপনি ও রাজকুমারী এ বাড়িতেই থাকবেন। বেলা হলো। আপনি খেতে চলুন। ফ্রান্সিস আস্তে বলল, মারিয়া তো না খেয়ে আছে। ওকে আগে কিছু খেতে দিন। রোক্কা কামারেতকে বলল সেকথা। কামারেত কী বলে চলে গেল। রোক্কা বলল, রাজকুমারীকে এখন শক্ত খাবার খেতে দেওয়া হবে না। স্যুপ, ফলের রস এসব এই কামারাতেই খেতে দেবে।
তাহলে মারিয়ার খাওয়া হোক। তারপর আমি খাবো। ফ্রান্সিস বলল। তখনই কামারেত দুটো বড়ো চিনেমাটির বাটি নিয়ে দ্রুত ঘরে ঢুকল। হেসে রোক্কাকে কী বলল। রোক্কা খুশিতে প্রায় লাফিয়ে উঠল। হাসতে হাসতে ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বলল, সারিনে আমার বিদ্রোহী বন্ধুদের কাছে যুদ্ধে হেরে গেছে সিনার্কা। সিনার্কা পরাজিত সৈন্যদের নিয়ে ফিরে আসছে। কথাটা বলে রোক্কা ঘরের দরজাটা একটু ফাঁক করে রাস্তার দিকে চেয়ে রইল।
ফ্রান্সিসের তখন এসব ভাববার মতো মনের অবস্থা নেই। ও মারিয়াকে তখন ধরে ধরে আস্তে আস্তে উঠিয়ে বসাল। পিঠে ঘাড়ে হাত দিয়ে ধরে থাকল। ফ্রান্সিস বলল, মারিয়া, একটু খেয়ে নাও। মারিয়া বন্ধ চোখ খুলে ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। ফ্রান্সিস লক্ষ্য করল মারিয়ার চোখের সেই লালচে ভাবটা নেই। গায়ের গরম ভাবটা অনেক কম। কামারেত আস্তে আস্তে মারিয়াকে স্যুপ আর ফলের রস খাইয়ে দিল। মারিয়াকে ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে শুইয়ে দিল। মারিয়া চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইল।
তখনই রাস্তায় শোনা গেল ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ। লোকজনের কথাবার্তা। ফ্রান্সিস দরজার কাছে গেল। রোক্কার পেছনে দাঁড়িয়ে দরজার ফাঁক দিয়ে দেখতে লাগল। একটা ছাদখোলা ঘোড়ায় টানা গাড়ি আসছে। গাড়িটা কালো রঙের। তাতে রুপোলি লতাপাতা ফুলের কাজ করা। গাড়িতে বসে আছে একজন প্রৌঢ়। মাথার কঁচাপাকা চুল এলোমেলো। কপালে নেমে এসেছে। গায়ে বেশ দামি কাপড়ের হলুদ রঙা জোব্বামতো। বেশ ধুলো কাদা লেগে আছে পোশাকে। গম্ভীর থমথমে মুখে বসে আছে। রোক্কা ফিসফিস করে বলল, এখনকার সামন্তরাজা সিনাৰ্কা। আস্তে আস্তে গাড়িটা চলে গেল। পেছনে পাঁচ ছটা ঘোড়ায় চড়া জেনো সৈন্য। কাপট-পরা। পরিশ্রান্ত ক্লান্ত মুখ-চোখ সৈন্যদের। তাদের পেছনে পদাতিক সৈন্যরা। ক্লান্ত বিধ্বস্ত চেহারা সব। পোশাক ছেঁড়া। ধুলো কাদা মাখা। আস্তে আস্তে ক্লান্ত পায়ে হেঁটে গেল ওরা। ফ্রান্সিস দরজার কাছ থেকে সরে এলো।
বিকেল নাগাদ মারিয়ার শরীরের অবস্থা অনেকটা ভালো হলো। কামারেত এসে মারিয়াকে। ওষুধ খাওয়াল। মারিয়া ওষুধ খাওয়ার সময় চোখ খুলে উঠে বসে ওষুধ খেল। কামারেত মারিয়ার কপালে গলায় হাত বুলিয়ে হেসে ফ্রান্সিসকে বলল, এখন উনি অনেকটা সুস্থ হয়েছেন। ফ্রান্সিস কথাটা বুঝল না। লো ল্যানি ভাষা। তবে কামারেতকে হাসতে দেখে বুঝল মারিয়া ভালো আছে। কামারেত চলে গেল। রোক্কা তখনও ফিরে আসেনি।
সন্ধের সময় বৈদ্যমশাই এলেন। সঙ্গে রোক্কা আর সেই কামারেত। বৈদ্যমশাই মারিয়াকে পরীক্ষা করে রোক্কার দিকে হেসে তাকালেন। বললেন, এত তাড়াতাড়ি উনি বিপদ কাটিয়ে উঠবেন ভাবিনি। যা হোক—আর কোনো ভয় নেই। খাওয়া-দাওয়া আর বিশ্রাম। দু’তিন দিনের মধ্যেই উনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবেন। রোক্কা হেসে কথাগুলো ফ্রান্সিসকে বুঝিয়ে বলল। ফ্রান্সিস আনন্দে কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। দ্রুত এগিয়ে এসে বৈদ্যমশাইয়ের ডানহাতটা নিজের দু’হাত দিয়ে চেপে ধরে মাথা নোয়াল। অনেক কষ্টে চোখের জল আটকাল। তারপর মারিয়ার দিকে তাকাল। দেখল মারিয়া খুশি চোখে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে।
বৈদ্যমশাই মৃদুস্বরে কামারেতকে কী নির্দেশ দিলেন। তারপর চলে গেলেন। কামারেও সঙ্গে সঙ্গে গেল।
ফ্রান্সিস এবার রোক্কাকে বলল, কিন্তু আমার বন্ধুরা কি জানে আমরা এখানে আছি?
—সব খবর তাদের দেওয়া হয়েছে। শুধু আপনাদের রাজকুমারী অনেকটা সুস্থ। হয়েছেন এই খবরটা এখনও দেওয়া হয়নি। এই খবরটা আমি দিতে যাবো। আপনারা বিদেশি। সবাইয়ের এখানে আসাটা সিনার্কার সৈন্যদের নজরে পড়লে বিপদ হবে। সারিনের যুদ্ধে হেরে ওরা রেগে আগুন হয়ে আছে। রোক্কা বলল।
