সিনার্কার যোদ্ধাদের প্রথম আক্রমণের ধাক্কাটা ভাইকিংরা সামলাল। ততক্ষণে বিদ্রোহীরাও অস্ত্র হাতে নিচ্ছে। কিন্তু সবাই অস্ত্র হাতে নেবার আগেই সিনকার যোদ্ধাদের হাতে মারা গেল।
গুহাটা এমন কিছু বড়ো নয়। কাজেই তলোয়ার চালিয়ে লড়াই করতে অসুবিধে হচ্ছিল। গুহায় ততক্ষণে জোর লড়াই চলছে। এক ফাঁকে হ্যারি ছুটে গিয়ে তলোয়ারের খোঁচা দিয়ে একটারপর একটা মশাল মেঝেয় ফেলে দিতে লাগল। মশালগুলো মেঝেয় পড়ে যেতেই গুহাটা অন্ধকার হয়ে গেল। এবার হ্যারি চিৎকার করে বলল বন্ধুরা গুহার পেছন দিকে ছুটে চলো। ওখানে যে পাথরখণ্ডটা রয়েছে সেটা সরিয়ে সবাই গুহার বাইরে চলে যাও। তারপর অন্ধকারে হ্যারি চেঁচিয়ে বলল—বিদ্রোহী বন্ধুরা—আমার বন্ধুরা যা করছে অপনারাও তাই করুন।
গুহাটা তখন প্রায় অন্ধকার হয়ে গেছে। দুটো মশাল মেঝেতে পড়ে গিয়েও নিবু নিবু হয়ে জুলছিল। ভাইকিংরা দ্রুত গুহার পেছন দিকে ছুটল। বিদ্রোহী বন্ধুরাও অন্ধকারে আন্দাজে বুঝে নিয়ে ভাইকিংদের পেছনে পেছনে ছুটল। সিনার্কার যোদ্ধারা অন্ধকারে নিজেদের মধ্যেই তলোয়ার চালাতে লাগল। বুদ্ধিমান হ্যারি ওদের দেশের ভাষায় বন্ধুদের কীভাবে পালাতে হবে বলেছে। সিনাৰ্কার সৈন্যরা কিছুই বোঝে নি। আবার লো ল্যাতিন ভাষায় বিদ্রোহীদের শুধু বলেছে ভাইকিং বন্ধুদের অনুসরণ করতে। এটা শুনে সিনার্কার সৈন্যরা এলোপাথারি তলোয়ার চালাচ্ছে।
সবার আগে হ্যারিই গুহার শেষ মাথায় এলো। অন্ধকারে দেখল—একটা বড়ো পাথর গুহা মুখে বসানো। হ্যারি চিৎকার করে বলল—বন্ধুরা—পাথর সরাও। ভাইকিং বন্ধুরা কয়েকজন তলোয়ার কোমরের ফেট্টিতে গুঁজে গুহার মুখের পাথরটা সরাল। এবার সবাই দ্রুত বেরিয়ে আসতে লাগল। বাইরে তখন ঝড়বৃষ্টির প্রচণ্ডটা কমে এসেছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। তারই আলোয় গাছ ঝোঁপঝাড় দেখে দেখে ভাইকিংরা আর বিদ্রোহীরা পালাতে লাগল।
বড়ো বড়ো গাছগুলো তখনও ঝড়ের বেগে মাথা নাড়ছে। বৃষ্টি কমে এসেছে। আকাশে থেকে থেকে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। চারদিকে তাই নানারকম শব্দ আর বিদ্যুতের ঝলক। এসবের মধ্যে দিয়ে গাছ ঝোঁপঝাড় লতাপাতার মধ্যে দিয়ে ভাইকিংরা আর বিদ্রোহীরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছুটল।
হঠাৎ বনজঙ্গল শেষ। সামনেই পাথুরে প্রান্তর। হ্যারি চিৎকার করে বলল—থামো। ভাইকিংরা দাঁড়িয়ে পড়ল। দেখে দেখে বিদ্রোহীরাও দাঁড়িয়ে পড়ল। হ্যারি বুঝেছিল সিনকার সৈন্যরা জাতযোদ্ধা। বিদ্রোহীরা সুদক্ষ যোদ্ধা নয়। গুহার অপরিসর জায়গায় তলোয়ারের লড়াই লড়ে বিদ্রোহীরা সিনাৰ্কার সৈন্যদের হারাতে পারবে না। কাজেই এই অবস্থায় পালিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
বিদ্যুতের আলোয় হ্যারি গালকাটা বিদ্রোহী সৈন্যটিকে খুঁজল। এই গালকাটা বিদ্রোহীটাই ওদের পথ দেখিয়ে এনেছিল। হ্যারি দেখল সেই বিদ্রোহী সৈন্যটির বাঁ হাতে তলোয়ারের কোপ পড়েছে। তখনও বৃষ্টিভেজা বাঁ হাতটা থেকে রক্ত পড়ছে। হ্যারি তাকে বলল—এখন আর ঐ গুহায় আস্তানায় ফিরে যাওয়া যাবে না। অন্য কোথাও আস্তানা নেওয়ার জায়গা আছে? গালে কাটা দাগ বিদ্রোহীটি বলল—এই পাথুরে প্রান্তরের শেষে একটা গ্রাম মতো আছে। আপাতত ওখানেই কোনো বাড়িতে আশ্রয় নিতে হবে। এভাবে উন্মুক্ত প্রান্তরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজে কী হবে।
—ঠিক—হ্যারি বলল—তাহলে ঐ গ্রামেই চলুন।
পাথুরে প্রান্তরটা পেরোতে পেরোতেই ভোর হয়ে এলো। বৃষ্টি থেমে গেছে তখন। মাঝে মাঝে আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।
গ্রামের মানুষরা তখন সবে ঘুম থেকে উঠেছে। মেঘ-ভাঙা রোদ পড়ল গ্রামটির পাথর-মাটির বাড়িগুলোয়। দাঁড়িয়ে পড়ল গালকাটা বিদ্রোহীটি। কাঠের দরজায় কয়েকবার থেমে থেমে টোকা দিল। দরজা খুলে গেল। একজন মধ্যবয়স্ক লোক দরজা খুলে দাঁড়াল। তার গায়ে রোক্কার মতোই রঙিন জোব্বামতো। গালকাটা বিদ্রোহীটিকে দেখে আর অন্য বিদ্রোহী আর ভাইকিংদের দেখে লোকটি খুবই বিব্রত হল। কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। গালকাটা বিদ্রোহীটি বলল—আপনার কোনো ভয় নেই। শুধু দুপুর পর্যন্ত আপনার বাড়িতে আমরা থাকবো। জামা কাপড় শুকিয়ে নিয়ে কিছু খাওয়াদাওয়া করে আমরা চলে যাবো। এদের আপনার কোনো বিপদ হবে না।
—বেশ—আসুন। লোকটি সরে দাঁড়াল। সবাই বাড়িটার প্রশস্ত-উঠোনে এলো। ডানদিকে একটা বেশ বড়ো লম্বাটে ঘর। ঘরে ঢুকে দেখা গেল একপাশে—উঁইকরা শস্যদানা। অন্যপাশটা ফাঁকা। সেই ফাঁকা জায়গায় সবাই বসে পড়ল। কেউ কেউ শুয়ে পড়ল। সবাই ভীষণ ক্লান্ত তখন। আহত কয়েকজনের কষ্টই বেশি হচ্ছিল।
কিছুপরে চার-পাঁচজন লোক খাবার নিয়ে ঢুকল। গোল রুটি আর নানা আনাজপত্রের তরকারি মত। সবাই খেতে লাগল। খিদেও পেয়েছিল সকলের। অনেকেই আরো রুটি চেয়ে নিল।
সকাল থেকেই মেঘ কেটে গিয়ে রোদ উঠল। বেশ চড়া রোদ। সকলে বাইরের প্রান্তরে এসে দাঁড়াল। যতটা সম্ভব পোশাক শুকিয়ে নিল।
দুপুরে পাখির মাংসের ঝোল লম্বাটে রুটি খেল সকলে। একটু বেলা হতেই সেই গালকাটা বিদ্রোহীর নির্দেশে সবাই সেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। উত্তরমুখো হাঁটতে শুরু করল। কিছুদূর যেতেই ওরা দেখল বার্গ পাহাড়ের দিক থেকে কে ঘোড়ায় চড়ে আসছে।
