ওদিকে রোক্কা যা আশঙ্কা করেছিল তাই ঘটল।
সেদিন সকালে কয়েকজন ভাইকিং বিদ্রোহীদের আস্তানা সেই গুহা থেকে বেরিয়ে এলো। পাহারাদার বিদ্রোহী সৈন্যটি তখন সকালের খাবার খেতে গুহার মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল। কেউ ছিল না গুহা মুখে। ভাইকিং বা কয়েকজন বাইরে এসে গুহার মুখের কাছে বিরাট পাথরের চাইটার ওপর আস্তে ওঁচানো পাথর খোদলে পা রেখে রেখে চাইটার ওপর উঠল। চারদিকে ঝকঝকে রোদ সবই দেখতে পাচ্ছিল ওরা। বার্গপাহাড়ের মাথার দিকে সবুজের চিহ্ন মাত্র নেই। কিন্তু নীচে গভীর জঙ্গল। ওরা দেখে আশ্চর্য হল যে বড়ো বড়ো ফার্ণ গাছের সংখ্যাই এই বনে বেশি। অনেক দূরে বোনিফেসিওর পাথরের বাড়িঘর দেখা যাচ্ছে। দুৰ্গটাতো ভালোভাবেই দেখা যাচ্ছে। তবে জাহাজঘাটা দেখা যাচ্ছে না। দুর্গের আড়ালে পড়ে গেছে। তবে অস্পষ্ট হলেও সমুদ্র দেখা যাচ্ছে।
ভাইকিংরা কিছু পরেই পাথরের চাইটা থেকে নেমে এলো। গুহায় ঢুকল। হ্যারি মেঝেয় একটা মোটা কাপড় পেতে শুয়েছিল। ওদের দেখে বলল—কোথায় গিয়েছিলে। ভাইকিং বন্ধুদের একজন বলল—এই গুহার দমবন্ধকরা অন্ধকার ভালো লাগছিল না। তাই বাইরে গিয়েছিলাম।
—বাইরের বনটা সত্যই সুন্দর। আর একজন ভাইকিং কি বলল।
তখনই গুহার পাহারাদার ছুটে হ্যারির কাছে এলো। পাহারাদর জানে যে একমাত্র হ্যারিই লো ল্যাতিন ভাষা বোঝে। পাহারাদার এসে হ্যারিকে জিজ্ঞেস করল—আপনার বন্ধুরা বাইরে গিয়েছিল?
—হ্যাঁ। হ্যারি বলল।
পাহারাদর বলল—আপনার বন্ধুরা এটা ভালো করেনি।
—কেন বলুন তো? হ্যারি জানতে চাইল।
—সারিনের লড়াইয়ে আমাদের বিদ্রোহী দলের কাছে হেরে গিয়ে সিনার্কা ক্ষেপে আগুন হয়ে গেছে। এই বোনিফেসিও আর ধারে কাছে সব জায়গায় সব সময়ের জন্যে গুপ্তচর ছড়িয়ে দিয়েছে। এই সংবাদ পাওয়ামাত্র আমরা সাবধান হয়ে গেছি। কিন্তু এসময় গুহার অস্তানা থেকে আপনার বন্ধুরা না জেনে বাইরে গেছে। যদি সিনার্কার কোনো গুপ্তচরের নজরে পড়ে থাকে তবে আমরা বিপদে পড়ে যাবো। তখন এই গুহার মতো ভালো আস্তানা ছেড়ে পালাতে হবে। নতুন আস্তানা খুঁজে নিতে হবে। আত্মরক্ষার সময় নাও পেতে পারি। আমাদের দলের ভীষণ ক্ষতি হতে পারে। পাহারাদর বিদ্রোহী যোদ্ধাটি বলল।
হ্যারি কিছু বলতে পারল না। কারণ যা ঘটবার ঘটে গেছে। আসলে ভাইকিং বন্ধুরা ব্যাপারটার গুরুত্ব বুঝতে পারে নি। হ্যারি সেই কথাটাই বলল শুধু। তারপর বলল তাহলে এখন তো আমাদের সব সজাগ থাকতে হবে।
—তা তো বটেই পাহারাদারটি বলল।
সারাটা দিন কিছু ঘটল না। বিকেল থেকে আকাশে মেঘ জমতে শুরু করল। গুহার আস্তানায় গুমোট গরমে সবাই অস্থির হয়ে উঠল। সন্ধে হতেই শুরু হল ঝড়। সেই সঙ্গে মুষলধারে বৃষ্টি। গুহার বাইরে বন এলাকার গাছগাছালির মাতামাতির শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দই শোনা যাচ্ছিল না। তাই গুপ্তচরের কাছে খবর পেয়ে সিনার্কার আদেশে তার যোদ্ধারা বিদ্রোহীদের ঐ গুহার আস্তানা ঘিরে ফেলেছিল সন্ধের আগেই। ঝড়জল শুরু হতে ওরা জঙ্গল ঝোঁপঝাড়ে শব্দ তুলে বিরাট পাথরের চাইটার কাছে। এলো। এখানেই গুপ্তচরটি হ্যারির বন্ধুদের দেখেছিল। ঝড়জলের মধ্যেই সিনার্কার যোদ্ধারা আস্তানাটা খুঁজতে লাগল। কিছু পরে পেয়েও গেল। গাছগাছালির আড়াল থেকে সেই দলপতি ঝড়বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে ঝাপসা দেখল দু’জন পাহারাদার খোলা তলোয়ার হাতে গুহামুখ পাহারা দিচ্ছে। তারা ঝড়জলের শব্দের মধ্যেই বুঝতেই পারে নি সিনার্কার যোদ্ধারা প্রায় গুহামুখে চলে এসেছে। ওরা পাহারা দিতে লাগল। দলপতি চারজন যোদ্ধার কানের কাছে মুখ এনে ব’লে গেলঝাঁপিয়ে পড়ে ঐ দুই পাহারাদারকে নিকেশ করো। ঠিক তখনই আকাশে বিদ্যুৎ চমকাল। সেই আলোর ঝলকানির সঙ্গে। সঙ্গে চারজন সিনার্কার সৈন্য পাহারাদার দুই বিদ্রোহী যোদ্ধার ওপর ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বিদ্রোহী পাহারাদার দু’জন আক্রমণ, হতেই চিৎকার করে উঠল। কিন্তু তখনই প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ল। সেই চিৎকারের শব্দ গুহার মধ্যে বিদ্রোহীদের কেউ শুনতে পেল না। পাহারাদার দু’জন সিনার্কার যোদ্ধাদের হাতে প্রাণ হারাল।
এবার সিনার্কার যোদ্ধারা দলবেঁধে গুহার মুখে এসে দাঁড়াল। গুহার মধ্যে তখন বিদ্রোহী যোদ্ধারা ভাইকিংরা শুয়ে বসে আছে। বাইরে জলঝড়ের শব্দ ছাড়া অন্য কোনো শব্দই ওদের কানে যাচ্ছিল না।
হ্যারি যথেষ্ট বুদ্ধিমান। হ্যারি বুঝেছিল ওর বন্ধুদের কোনো না কোনো গুপ্তচর নিশ্চয়ই দেখেছে আর সহজেই বুঝে নিয়েছে এমন জায়গা বিদেশিরা এলো কী করে? নিশ্চয়ই এখানে বিদেশিদের অথবা বিদ্রোহীদের আস্তানা আছে। এই আশঙ্কা থেকে হ্যারি ভাইকিং বন্ধুদের বলে রেখেছিল কেউ তলোয়ার হাতছাড়া করবে না। সবাই হাতের কাছে তলোয়ার রাখবে। এমনকি রাতে ঘুমোবার সময়ও।
সিনাকার যোদ্ধারা গুহায় ঢোকামাত্র হ্যারি ঠিক বুঝতে পারল। হ্যারি গুহার মুখেরদিকে তাকিয়েই বসেছিল। হ্যারি লাফিয়ে উঠল। চিৎকার করে বলে—বন্ধুরা—তৈরি হও। লড়াই।
হ্যারির কথা কানে যাবার সঙ্গে সঙ্গে ভাইকিং বন্ধুরা তলোয়ার হাতে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। এবার হ্যারি লো ল্যাতিন ভাষায় বলে উঠল—বিদ্রোহী বন্ধুরা—সিনার্কার সৈন্যরা গুহায় ঢুকছে—লড়াই।
