ফজল দাঁত চিবিয়ে বললো–আমি যদি না মারি, ও আমায় মারবে।
–তবু আমার অনুরোধ, ওকে ছেড়ে দাও।
ফজল এক মুহূর্ত ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–বেশ। তোমার কথাই রাখলাম।
ফজল তরোয়াল সরিয়ে নিলো। মৃত্যু ভয়ে মকবুলের মুখটা কাগজের মত সাদা হয়ে । গিয়েছিল। ও হাঁ করে নিঃশ্বাস নিচ্ছিল। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে যে ও বেঁচে গেল, এটা ওর বুঝতে সময় লাগল। কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো ওদের দিকে।
তারপর আস্তে-আস্তে উঠে বসল। ফ্রান্সিস ডাকলো–মকবুল!
মকবুল জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ফ্রান্সিসের দিকে তাকালো।
–এই জলদস্যুরা কি তোমার বন্ধু? তুমি কি এদের সঙ্গে ফিরে যেতে চাও?
–না।
–এখনও ভেবে দেখো, ওরা কিন্তু জাহাজ ছেড়ে দিচ্ছে।
সত্যিই জলদস্যুরা তখন নিজেদের জাহাজে পালিয়ে যেতে চেষ্টা করছে। বাকি কয়েকজন গিয়ে উঠলেই জাহাজ ছেড়ে দেবে। মকবুল ভয়ার্ত চোখে ফ্রান্সিসের দিকে তাকালো। বললো–না-না, আমাকে ঐ জাহাজে আর পাঠিয়ো না।
–কেন? ফ্রান্সিস ব্যঙ্গ করে বললো–তোমার বন্ধু ওরা। তোমার জন্যে সোনার ঘন্টা উদ্ধার করে দিতে এসেছিলো। এক সঙ্গেই যেমন এসেছে, ফিরেও যাও একসঙ্গে।
–না-না, ওরা আমাকে পেলে হাঙরের মুখে ছুঁড়ে ফেলে দেবে।
–হুঁ। ফ্রান্সিস একটু চুপ করে থেকে বললো–এবার আমার মোহরটা ফেরত দাও।
মকবুল কোমরবন্ধনী থেকে একটা থলে বের করলো। থলে থেকে ফ্রান্সিসের সেই চুরি যাওয়া মুদ্রাগুলো আর মোহরটা বের করে ফ্রান্সিসের হাতে দিলো। মোহরটা হাতে পেয়েই ফ্রান্সিস আর ফজল মোহরটার ওপর ঝুঁকে পড়লো। মনোযোগ দিয়ে উল্টে পিঠের দ্বীপ থেকে ফিরে আসার নকশাটা দেখতে লাগল।
মকবুল ত্রুর হাসি হেসে বললো–অন্য মোহরটা যদি পেতাম, তাহলে এই সোনার ঘন্টা তোমরা নিয়ে যেতে পারতে না।
–জানি। ফ্রান্সিস মোহরটা থেকে চোখ না সরিয়েই বললো।
জলদস্যুদের দল দ্রুত জাহাজ চালিয়ে সরে পড়লো। ওদের জাহাজ সমুদ্রের দিগন্তে মিলিয়ে যেতেই সুলতান সোনার ঘন্টা নামিয়ে আনার হুকুম দিলেন। সৈন্যরা সব দড়ি জোগাড় করে তৈরি হতে লাগলো।
নীচে জাহাজে যখন যুদ্ধ চলছিল, তখন সুলতানের হুকুমে মিস্ত্রীরা সোনার ঘন্টার গা থেকে পলেস্তারা খসাচ্ছিলো। এতক্ষণে পলেস্তারা খসানো শেষ হলো। সবাই কাজ ফেলে ডেকে এসে ভীড় করে দাঁড়ালো। সে এক অপরূপ দৃশ্য। বিস্ময়ে অবাক চোখে সবাই তাকিয়ে দেখতে লাগল।
অন্ধকার নামলো সোনার ঘন্টার দ্বীপে, বালিয়াড়িতে, সুদূর প্রসারিত সমুদ্রের বুকে। দ্বীপের সমুদ্রতীর বিরাট একটা কাঠের পাটাতন তৈরি করা হতে লাগল। ঐ পাটাতনে রাখা হবে সোনার ঘন্টা তারপর জাহাজের সঙ্গে বেঁধে নিয়ে যাওয়া হবে।
রাত গভীর তখন। আকাশে আধভাঙা চাঁদ। ফ্রান্সিসের চোখে ঘুম নেই। ডেকের ওপরে পায়চারী করছে। কখনও দাঁড়িয়ে পড়ে দেখছে মশালের আলোগুলো কাঁপছে। ঠকঠক পেরেক পোঁতার শব্দ উঠছে। মিস্ত্রীদের কথাবার্তাও কানে আসছে। কিন্তু ফ্রান্সিসের সেদিকে কান নেই। নিজের চিন্তায় সে ডুবে আছে। এত দুঃখকষ্টর পর সোনার ঘন্টা যদিও বা পাওয়া গেল, কিন্তু সেটাকে নিজের দেশে নিয়ে যাওয়া হলো না! ফ্রান্সিস পাহাড়ী দ্বীপের চূড়োর দিকে তাকালো! জ্যোৎস্না পড়েছে সোনার ঘন্টার মসৃণ গায়ে। একটা মৃদু আলো চারিদিকবিচ্ছুরিত হচ্ছে। মনে হচ্ছে, ওটা যেন মাটিতে নেই। শূন্যে ভাসছে। স্বপ্নময় রহস্যেভরা এর অপার্থিব সৌন্দর্যের আভাস। ফ্রান্সিসের মন বিদ্রোহ করলো। অসম্ভব! এমন সুন্দর একটা জিনিস, যেটাকে ঘিরে তার আবাল্যের স্বপ্ন গড়ে উঠেছে, সেটা এভাবে শুধু অর্থ আর লোকবলের জোরে সুলতান নিয়ে যাবে? আর ওরা তাকিয়ে দেখবে? না, এ কখনই হতে পারে না। আপন মনেই ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকাল–না না। যে করেই হোক, সোনার ঘন্টা তারা নিজের দেশে নিয়ে যাবে। এতে যদি তাদের জীবন বিপন্ন হয় হোক্।
পরদিন সকালেই ঘন্টার মাপ অনুযায়ী একটা মস্ত বড় কাঠের পাটাতন তৈরী হলো। এবার সোনার ঘন্টা নামিয়ে আনবার পালা। পাহাড়ের ঢালু গায়ে যে কটা খাটো গাছ ছিল, তাতেই দড়িদড়া বেঁধে কপিকলের মত করা হলো। তারপর সোনার ঘন্টা বেঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে আস্তে আস্তে নামানো হতে লাগল। কিন্তু দড়ি দড়ার কপিকল সোনার ঘন্টার অত ভার সহ্য করতে পারল না। দুতিন জায়গায় দড়ি ছিঁড়ে গেল। একটা গাছ তো গোড়সুদ্ধ উপড়ে গেল। পাহাড়ের ঢালু গা বেয়ে সোনার ঘন্টা ঢং-ঢং শব্দ তুলে গড়িয়ে পড়লো ধারে। কয়েকজন ছেঁড়া দড়িদড়াসুদ্ধ ছিটকে মারা পড়লো। কিন্তু সুলতানের সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। হুকুম দিলেন, যে করেই হোক সোনার ঘন্টাকে কাঠের পাটাতনের ওপর তুলো। তারপর সেটাকে সুলতানের জাহাজের পেছনে বেঁধে যাত্রা শুরু হলো আমদাদ বন্দরের উদ্দেশ্যে।
মোহরের গায়ে যে নকশা আঁকা ছিল সেটা দেখে হিসাব করে ফ্রান্সিসই ফেরার পথের নিশানা বের করলো। জাহাজ দুটো চললো সেই পথ ধরে একটা অদ্ভুত পাহাড়ের নির্দেশ দেওয়া ছিল নকশাটায়। সেইউঁচু পাহাড়টারবনীচে একটা সুড়ঙ্গ পথ। ফ্রান্সিস হ্যারিকে যখন নকশাটা বোঝাল, হ্যারি বলল–তাহলে এই সুড়ঙ্গ পথটা দিয়েই তো । ফ্রান্সিস হাসল। বলল–প্রথমতঃ, এই সুড়ঙ্গ পথের খবর আমরা জানতাম না।
