সুলতান মন্দিরে মধ্যে ঢুকলেন। সবাই উৎকণ্ঠিত। সবাই যেন নিঃশ্বাস বন্ধ করে চুপ হয়ে আছে। শুধু সমুদ্রে ঢেউয়ের ওঠা-পড়ার শব্দ। শুধু বাতাসের শোঁ-শোঁ শব্দ। আর কোন শব্দ নেই। এতগুলো মানুষ। কারো মুখে কোন কথা নেই।
একটু পরে সুলতান ধীরে পায়ে মন্দিরটা থেকে বেরিয়ে এলেন। ফ্রান্সিসরা যেখানে দাঁড়িয়েছিল, সেখানে এসে একবার ফ্রান্সিসের দিকে আর একবার রহমানের দিকে তাকিয়ে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন। ফ্রান্সিসের বুক দমে গেল। তবে কি সোনার ঘন্টা এখানে নেই? এত দুঃখ-কষ্ট, এত পরিশ্রম সব অর্থহীন? সব ব্যর্থ?
ফ্রান্সিস আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। ছুটে মন্দিরটার মধ্যে গিয়ে ঢুকলো। কোথায় সোনার ঘন্টা? মন্দিরটার মাথা থেকে পেতলের শেকলে ঝুলছে একটা পেতলের ছোট্ট ঘন্টা। চারদিকেই দেয়াল। আর কিছু নেই মন্দিরটাতে। রাগে-দুঃখে ফ্রান্সিসের চোখ ফেটে জল এলো। এই তুচ্ছ একটা পেতলের ঘন্টার জন্যে এত দুঃখ-কষ্ট? সেই ছেলেবেলা থেকে যে স্বপ্ন দেখে এসেছে, সেই স্বপ্ন, এইভাবে ব্যর্থ হয়ে যাবে? সোনার ঘন্টার গল্প তাহলে একটা ছেলেভুলোনা কাহিনী মাত্র? ফ্রান্সিসের মাথায় যেন খুন চেপে গেল। সে দুহাতে পেতলের ঘন্টাটা জোরে ছুঁড়ে দিলো দেওয়ালের গায়ে।
ঢং-ঢং-ঢং–প্রচণ্ড শব্দে ফ্রান্সিস ভীষণ চমকে উঠল। দুহাতে কান চেপে বসে পড়ল। একি? তবে–তবে কি–সমস্ত গোলাকার মন্দিরটাই একটা সোনার ঘন্টা?
ঢং-ঢং ঘন্টার শব্দ বেজে চললো। বাইরে সুলতান, রহমান, হ্যারি, সঙ্গের সৈন্যরা, নীচে জাহাজের উৎসুক ভাইকিংরা সবাই প্রচণ্ড বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল গোল মন্দিরটার দিকে। এত বড় সোনার ঘন্টা! ঢং-ঢং, গম্ভীর শব্দ ছড়িয়ে পড়তে লাগল মাথার ওপরে নীল আকাশের নিচে শান্ত সমুদ্রের বুকের ওপর দিয়ে দূর-দূরান্তরে।
সুলতানের মুখে হাসি ফুটলো। ফ্রান্সিস মন্দির থেকে বেরিয়ে আসতে হ্যারি তাকে। জড়িয়ে ধরলো। আনন্দে অতগুলো মানুষের চীৎকার হৈ-হুঁল্লায় নির্জন দ্বীপমুখর হয়ে উঠল। কিন্তু এই আনন্দ আর উল্লাসের মুহূর্তে কেউই লক্ষ্য করেনি, যে সেই ডুবো পাহাড়ের দিক থেকে একটা জাহাজ তীরবেগে সোনার ঘন্টার দ্বীপের দিকে ছুটে আসছে।
সেই জাহাজটাকে প্রথম দেখলো রহমান। সে সুলতানের কাছে ছুটে এলো। সুলতান তখন সোনার ঘন্টার বাইরের পলেস্তারটা কতটা শক্ত, তাই পরীক্ষা করছিলেন। রহমান সুলতানকে জাহাজটা দেখালো। তখন জাহাজটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। এতক্ষণে সবাই দেখতে পেল সেই দ্রুত ছুটে আসা জাহাজটাকে। একটা কালো পতাকা উড়ছে জাহাজটার মাস্তুলে। তাতে সাদা রঙের মড়ার মাথার খুলি আর ঢ্যাঁড়ার মত দুটো হাড়ের চিহ্ন আঁকা। জলদস্যুদের জাহাজ। নীচের জাহাজ দুটোয় সাজ সাজ রব পড়ে গেল। সবাই যুদ্ধের জন্য তৈরি হতে লাগলো। সুলতান, রহমান, ফ্রান্সিস সবাই দ্রুত পায়ে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসতে লাগল।
জলদস্যুদের জাহাজটা প্রথমে সুলতানের জাহাজের গায়ে এসে লাগল। খালি গা, মাথায় কাপড়ের ফেট্টি বাঁধা খোলা তরোয়াল হাতে জলদস্যুরা জাহাজে লাফিয়ে উঠে এল। এবার ফ্রান্সিসদের জাহাজের গায়ে লাগল। সেখানেও শুরু হল তরোয়ালের যুদ্ধ। চীৎকার, হই-চই, তরোয়ালের ঠোকাঠুকির শব্দ, আহত আর মুমূর্ষদের আর্তনাদে ভরে উঠল সমস্ত এলাকাটা। লড়াই চলতে লাগল। সুলতান রহমান, ফ্রান্সিস তারাও ততক্ষণে নেমে এসেছে। তারাও ঝাঁপিয়ে পড়ল তরোয়াল হাতে জলদস্যুদের উপর।
যুদ্ধ করতে করতে হঠাৎ ফ্রান্সিস মকবুলকে দেখতে পেল। তার পরনে জলদস্যুদের পোশাক নয়, আরবীয়দের পোশাক। এতক্ষণে ফ্রান্সিসের কাছে সব স্পষ্ট হলো। তাহলে মকবুলই এই জলদস্যুদের সোনার লোভ দেখিয়ে এখানে নিয়ে এসেছে। যুদ্ধের ফাঁকে এক সময় ফ্রান্সিস চীৎকার করে মকবুলকে ডাকলো মকবুল, আমাকে চিনতে পারছো?
মকবুল ওর দিকে মাথা ঝাঁকিয়ে হাসল। তারপর গলা চড়িয়ে বলল–আমি বেঁচে থাকতে সোনার ঘন্টা কেউ নিয়ে যেতে পারবে না।
ফ্রান্সিস আর কোন কথা বলল না। নিপুণ হাতে তরোয়াল চালিয়ে জলদস্যুদের সঙ্গে লড়াই করতে লাগল।
–ফ্রান্সিস! ডাক শুনে ফ্রান্সিস পেছনে তাকিয়ে দেখল ফজল।
–মকবুল এদের সঙ্গে এসেছে তাইনা? ফজল জিজ্ঞেস করল।
–ঠিক ধরেছ।
–কিন্তু ওরা এল কি করে?
–আমাদের জাহাজ অনুসরণ করে ওরা এসেছে। আমরা যেভাবে ডুবো পাহাড় পেরিয়েছি, ওরা ঠিক সেইভাবেই পেরিয়েছে।
–মকবুলকে দেখেছো?
–ঐ যে মাস্তুলটার ওপাশে লড়াই করছে।
ফজল আর দাঁড়ালো না। সেইদিকে ছুটলো। মকবুল কিছু বোঝবার আগেই ফজল মকবুলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। দুজনের লড়াই শুরু হয়ে গেল। মকবুলের তুলনায় ফজলের হাত অনেক নিপুণ। ফজল বেশ সহজ ভঙ্গিতেই তরোয়াল চালাচ্ছিলো।
অল্পক্ষণের মধ্যেই মকবুল বেশ হাঁপিয়ে পড়লো। ফজলও হাঁপাচ্ছিল। একবার দম নিয়ে ফজল বললো–মরুদস্যুদের দলে ঢুকেছিলাম, শুধুই তরোয়াল চালানো শেখবার জন্যে। তারপর কপালের কাটা দাগটা দেখিয়ে বলল–এটার বদলা নিতে হবে তো।
মকবুল কোন কথা না বলে তরোয়াল উঁচিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আবার লড়াই শুরু হল। প্রথম আক্রমণের মুখে ভাইকিং আর সুলতানের সৈন্যরা হকচকিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আক্রমণের প্রথম ধাক্কাটা কাটিয়ে উঠতে তাদের বেশি সময় লাগল না। সুলতানের বাছাই করা সৈন্য আর দুধর্ষ ভাইকিংদের হাতে জলদস্যুরা কচুকাটা হতে লাগল। ওরা পিছু হটতে লাগল। দুজন একজন করে নিজেদের জাহাজে পালাতে লাগল। এদিকে মকবুল ফজলের সঙ্গে লড়াই করতে করতে হঠাৎ দড়িতে পা আটকে ডেকের ওপর চিৎ হয়ে পড়ে গেল। ফজল ওর বুকে তরোয়ালটা চেপে ধরল। দুজনেই ভীষণভাবে হাঁপাচ্ছে তখন। দেখতে পেয়ে ফ্রান্সিস ছুটে এলো। ফজলের হাত চেপে ধরে বলল ফজল, ওকে মেরে ফেলোনা।
