–আর দ্বিতীয় কারণ?
–আমার মনে হয়, ঐ পথ দিয়ে একটা জাহাজ এদিক থেকে ওদিকে যেতে পারে, কিন্তু ওদিক থেকে এদিকে আসতে পারে না।
–এ আবার হয় নাকি। হ্যারি অবাক হলো।
–প্রকৃতির বিচিত্র খেয়াল। ফ্রান্সিস হাসলো।
সন্ধ্যের সময় সেই উঁচু পাহাড়টায় দেখা পাওয়া গেল। কাছে যেতে সুড়ঙ্গ পথটাও দেখা গেল। একটা জাহাজ যেতে পারে, এমনি বড় পথ সেটা। ফ্রান্সিসের অনুমানই ঠিক।
সামনে রাত্রির অন্ধকার। অন্ধকারের মধ্যে সুড়ঙ্গ পথে ঢোকা বিপজ্জনক। স্থির হলো সকালের আলোর জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
পরদিন সকালে প্রথমে ফ্রান্সিসদের জাহাজটা ধীরে ধীরে সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকলো। একটু এগোতেই বাইরের আলো ম্লান হয়ে গেল। কেমন ছায়া-ছায়া হয়ে এল ভেতরটা। তবু মাথার ওপর ঝুঁকে পড়া ছাদ, দুপাশের পাথুরে দেওয়াল দেখা যাচ্ছিলো। সুড়ঙ্গটা একষ্টা জায়গায় বাঁক নিয়েছে। খুব সতর্কতার সঙ্গে দেওয়ালে ধাক্কা না লাগিয়ে জাহাজটাকে বাঁক ঘুরিয়ে বের করে নিয়ে আসা হলো। বাঁক ঘুরতে এক অপূর্ব দৃশ্য! এদিকে ওদিকে থামের মত গোল এবড়ো খেবড়ো পাথুরে দেয়াল জল থেকে উঠে ওপরের ছাদের সঙ্গে লেগে আছে যেন। সেগুলোর গায়ে নীলাভ দ্যুতিময় পাথরের টুকরো। ওপরের পাথুরে ছাদেও কত বিচিত্র বর্ণের পাথর। সেই ছাদের গা বেয়ে কোথাও বা শীর্ণ ঝরণার মত জল পড়ছে। যেটুকু আলো সুড়ঙ্গের থেকে বাইরে আসছিল, তাই দ্বিগুণিত হয়ে জায়গাটায় এক অপার্থিব আলোর জগৎ রচনা করেছে। বিচিত্র বর্ণের মৃদু আলোর বন্যা যেন। সবাই বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেল।
ভাইকিংদের মধ্যে দু-একজন হাতুড়ি নিয়ে এলো। হাতের কাছে এত সুন্দর রঙিন পাথর। পাথুরে থামের গায়ে-গায়ে সেই নীলাভ পাথরের ঝিলিক। লোভ সামলানো দায়। ওরা নিশ্চয় থামগুলো ভেঙে পাথর নিয়ে আসতো। কিন্তু পারলো না ফ্রান্সিসের জন্যে।
ফ্রান্সিস চীৎকার করে বলল–কেউ থামগুলোর গায়ে হাত দেবে না।
ফ্রান্সিসের গম্ভীর কণ্ঠস্বর সুড়ঙ্গের মধ্যে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
–কেন? হাতুড়ি হাতে একজন ভাইকিং বললো।
–এই থামগুলো পাহাড়টার ভারসাম্য রক্ষা করছে। যদি কোন কারণে ভেঙে যায়, সমস্ত পাহাড়টাই জাহাজের ওপর ভেঙে পড়বে।
সবাই বিপদের গুরুত্বটা বুঝলো। অগত্যা চেয়ে-চেয়ে দেখা ছাড়া উপায় কি? সবাই নিঃশব্দে সেই অপূর্ব স্বপ্নময় জগতের রূপ দেখতে লাগল। জাহাজ এগিয়ে চললো।
একসময় সুড়ঙ্গের ওপাশে আলো ফুটে উঠল। সুড়ঙ্গ শেষ হয়ে আসছে। সুড়ঙ্গের মুখ ছেড়ে জাহাজটা বাইরের রৌদ্রালোকিত সমুদ্রের বুকে আসতেই সবাই আনন্দে হই-চই করে উঠল। ফ্রান্সিস হ্যারিকে বলল–কিছু লক্ষ্য করেছিলে?
–কি?
–সুড়ঙ্গটা ভেতরের দিকে একটা অদ্ভুত বাঁক নিয়েছে। এপাশের কোন জাহাজই সেই বাঁক পেরোতে পারবে না।
–হ্যাঁ, এটা সত্যিই অদ্ভুত ব্যাপার। পর-পর সুলতানের জাহাজ আর সোনার ঘন্টা বসানো কাঠের পাটাতনটাও সুড়ঙ্গ পেরিয়ে চলে এলো। আবার চললো জাহাজ শান্ত সমুদ্রের বুক চিরে আমদাদ বন্দরের উদ্দেশ্যে।
সবাই নিশ্চিন্ত। যাক, অনেকদিন পরে আবার মাটির ওপর পা ফেলা যাবে। ভাইকিংদের কাছে আমদাদ বিদেশ। তবু তোক বিদেশ, মাটি তো! সুলতানের আদেশে মিস্ত্রীরা এর মধ্যেই বড়-বড় চাকা বানাতে শুরু করেছে। সোনার ঘন্টা বসানো পাটাতনটা চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত। চাকা লাগাতে পারলে কোন অসুবিধে নেই। ঘোড়া দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া যাবে। চাকা বানানোর কাজ চলছে পুরো দমে। জাহাজের সবাই খুসিতে মশগুল।
কিন্তু ফ্রান্সিসের চোখে ঘুম নেই। শুধু হ্যারিই ওর একমাত্র সমব্যথী। গভীর রাত্রে ডেকের ওপর দুজন দেখা হয়। সোনার ঘন্টার দিকে আঙুল দেখিয়ে ফ্রান্সিস বলে জানো হ্যারি, ওটা আমাদের প্রাপ্য, সুলতানের নয়।
–কিন্তু উপায় কি বলো!
–উপায়–বিদ্রোহ।
–সে কি! হ্যারি চমকে উঠে।
ফ্রান্সিস ডেকে অস্থিরভাবে পায়চারী করতে করতে বলে–কালকে রাত্তিরে কয়েকজন ভাইকিংকে নিয়ে এসো। সুলতানের সৈন্যদের একটু কায়দা করে হার স্বীকার করাতে হবে। তারপর সোনার ঘন্টা নিয়ে আমরা দেশের দিকে পাড়ি জমাবো।
–সুলতানের সৈন্যরা কিন্তু সংখ্যায় আমাদের প্রায় দ্বিগুণ।
–হ্যারি, আমি সব ভেবে রেখেছি।
পরের দিন গভীর রাত্রে ফ্রান্সিসের ঘরে সভা বসলো। কয়েকজন বিশ্বস্ত ভাইকিং এলো। কিভাবে বিদ্রোহ হবে, সুলতানের সৈন্যদের কিভাবে বোকা বানানো হবে, এসব কথা ফ্রান্সিস কিছু ভাঙলো না। শুধু ওদের মতামত চাইলো। দুজন বাদে সবাই ফ্রান্সিসকে সমর্থন করলো। সেই দুজন বললো–যদি বিদ্রোহ করতে গিয়ে আমরা হেরে যাই, সুলতান আমাদের সবাইকে মেরে ফেলবে। কারণ ওর কাছে আমাদের বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে।
ফ্রান্সিস বলল কথাটা সত্য!কিন্তু এছাড়া আমাদের উপায় কি? একবার আমদাদের রাজপ্রাসাদে সোনার ঘন্টা নিয়ে যেতে পারলে আমরা কোনদিনই ওটা উদ্ধার করতে পারবো না।
শেষ পর্যন্ত স্থির হল, অন্য ভাইকিং বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কিন্তু ফ্রান্সিসের কপাল মন্দ। এ কান সে কান হতে হতে কথাটা সুলতানের কানে গিয়েও উঠলো। সুলতান সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত ভাইকিংদের কাছ থেকে তরবারি কেড়ে নেবার কুম দিলেন। তারপর নিরস্ত্র ভাইকিংদের জাহাজের নীচের কেবিনে বন্দী করে রাখা হল। সেনাপতি আর তার দলের লোকেরাও বাদ গেল না। সুলতান বোধহয় কাউকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। ফ্রান্সিসের বিদ্রোহের পরিকল্পনা সমস্ত ভেস্তে গেল।
