হ্যারি বলল, কিন্তু জেনো সৈন্যদের যুদ্ধজাহাজ দুটো আমাদের জাহাজের দুপাশেই রয়েছে।
শাঙ্কো একটু হেসে বলল, আমি দুটো জাহাজেরই নোঙর বাঁধা দড়ি কেটে দিয়েছি। দুটো জাহাজই এখন মাঝ সমুদ্রে। এখানকার পাহারাদার আর কিছু সৈন্য হয়তো এখন আছে। ওদের লড়াই করে হারাতে অসুবিধে হবে না। এই সুযোগ। আর দেরি নয়। সব জাহাজঘাটায় চলো।
ওরা দল বেঁধে ছুটল জাহাজঘাটার দিকে। শাঙ্কো যে পাথুরে মাটি ঝোঁপঝাড়ের এলাকা দিয়ে জাহাজঘাটায় এসেছিল সেই জায়গা দিয়েই বন্ধুদের নিয়ে চলল। বসতি। এলাকা থেকে দূরে।
জাহাজঘাটায় এসে চাঁদের আলোয় দেখল সত্যি শুধু ওদের জাহাজটাই ভাসছে। জেনোদের যুদ্ধজাহাজ দুটো নেই। বোঝা গেল—ঐ দুই জাহাজের সৈন্যরা এখনও বোধহয় বুঝতে পারেনি যে ওদের জাহাজ জাহাজঘাটা থেকে অনেক দূরে চলে এসেছে।
শাঙ্কো হ্যারি রা দ্রুত কাঠের পাটান দিয়ে ওদের জাহাজে উঠল। দ্রুত ছুটল অস্ত্রঘরের দিকে।
অস্ত্রঘর থেকে তলোয়ার নিয়ে ওরা ডেক-এ উঠে এলো। শাঙ্কো নিয়ে এলো ওর তীর ধনুক।
জাহাজ থেকে নামলেই দেখল তিনচারজন জেনো সৈন্য জাহাজঘাটার দিকে ছুটে আসছে। ওরা বোধহয় ওদের ফেল্লুকা মানে যুদ্ধজাহাজ দেখতে না পেয়েই ছুটে আসছিল।
সামনেই অস্ত্র হাতে শাঙ্কোরা। শুরু হলো লড়াই। তখন চাঁদ আর তারার আলো নিস্তেজ হয়ে আসছে। ভোর হতে দেরি নেই। লড়াই চলল। বিস্কোর নিপুণ তলোয়ার চালানো দেখে জেনো সৈন্যরা বুঝল এদের সঙ্গে এঁটে ওঠা যাবে না। অল্পক্ষণের মধ্যেই তিনজন জেনো সৈন্য আহত হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। গোঙাতে লাগল। শেষেরটির হাতের তলোয়ার বিস্কোর একটা জোরালো মার ঠেকাতে গিয়ে তখন ছিটকে গেছে। সেই সৈন্যটি সঙ্গে সঙ্গে ছুটল দুর্গের দিকে।
দুর্গের সামনে যখন ওরা এলো তখন সকালের রোদ পড়েছে দুর্গের কালচে পাথুরে গায়ে। কাছে এসে দেখল সদরদেউড়ির সামনে খোলা তলোয়ার হাতে জেনো সৈন্যরা আট-দশ জন দাঁড়িয়ে আছে। সবার সামনে সেই দলপতি। হ্যারি চিৎকার করে বলল, দাঁড়াও। সবাইদাঁড়িয়ে পড়ল। হ্যারি বলল, শাঙ্কো, পায়ে তির ছুঁড়ে কয়েকটাকে ঘায়েল করো। বুকে মেরো না। বন্ধুদের উদ্ধার করাই আমাদের লক্ষ্য—অকারণে নরহত্যা আমরা চাই না।
শাঙ্কো পাথুরে রাস্তায় বাঁ হাঁটু গেড়ে বসল। তারপর নিশানা স্থির করে তির ছুঁড়ল দলপতির দিকে। দলপতি তলোয়ার ফেলে দু’হাতে হাঁটু চেপে বসে পড়ল। শাঙ্কো আর একটা তির ছুঁড়ল। ওটা দুর্গের কাঠের দরজায় গিয়ে বিঁধে গেল। আবার দ্রুতহাতে তির ছুঁড়ল শাঙ্কো। আর একজন সৈন্যের ডান হাতে লাগল তিরটি। সে তলোয়ার ফেলে বা হাত দিয়ে ডান হাতটা চেপে ধরল। এবার জেনো সৈন্যদের মধ্যে ভয় ঢুকে গেল। ওরা পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল। তারপর ছুটে পালাতে লাগল দুর্গের ডানপাশে। একটু পরেই ওদের আর দেখা গেল না। গাছগাছালির আড়াল দিয়ে কোথায় পালিয়ে গেল ওরা।
হ্যারি সঙ্গীদের নিয়ে ছুটে দুর্গের সদর দেউড়িতে এলো। দেখল বিরাট কাঠের দরজাটা একটু খোলা। তার মানে ভেতরের কয়েদঘরের পাহারাদার 1্যৈরাও এসেছিল বাধা দিতে। শাঙ্কোর তিরে আহত একজন পাহারাদার সৈন্যের কোমরে ঝোলানো আংটায় কয়েদঘরের চাবি পাওয়া গেল। হ্যারি চাবি নিয়ে দরজা পার হয়ে কয়েদঘরের দিকে ছুটল। পেছনে বন্ধুরা।
কয়েদঘরের তালা খুলল হ্যারি তারপর জোরে ধাক্কা দিয়ে লোহার দরজা খুলেই চিৎকার করে বলল—বন্ধুরা পালিয়ে এসো। বন্দি ভাইকিংরা ছুটে এলো। শাঙ্কো গলা চড়িয়ে বলল, তাড়াতাড়ি পালাতে হবে। সবাই ছুটে দুর্গের বাইরে এলো। এবার কোথায় যাবে ওরা? হ্যারি দেখল রোক্কার একজন বিদ্রোহী সৈন্য মাত্র মুক্ত বন্ধুদের দলে আছে। হ্যারি ছুটতে ছুটতে সেই সৈন্যটিকে লো ল্যাতিন ভাষায় বলল, রোক্কা আমাদের যেতে বলেছে তোমাদের বার্গ পাহাড়ের আস্তানায়। আমাদের সেখানে নিয়ে চলো।
সৈন্যটি বলল, রোক্কার নির্দেশ মানার জন্যেই আমি আগে পালাইনি। চলুন। কিন্তু সদর রাস্তা দিয়ে নয়। অন্যদিক দিয়ে যেতে হবে। সেই সৈন্যটি সবার সামনে এসে ছুটতে লাগল।
পাথর ছড়ানো অসমতল জায়গা দিয়ে, পাথুরে মাটির ওপর দিয়ে গাছ-গাছালির আড়ালে আড়ালে ওরা ছুটতে লাগল বার্গ পাহাড়ের দিকে।
বেশ কিছুটা আসার পর দূর থেকে দেখল ওরা ধুলো উড়িয়ে রাস্তা দিয়ে কারা যেন আসছে। সৈন্যটি সঙ্গে সঙ্গে হ্যারিকে বলল, সবাইকে ঝোঁপের আড়ালে শুয়ে পড়তে বলুন। হ্যারি একটু গলা চড়িয়ে কথাটা বলেই নিজেও একটা কাটাঝোঁপের আড়ালে শুয়ে পড়ল। সবাই এখানে-ওখানে ছোটা ঝোঁপঝাড়ের আড়ালে শুয়ে পড়ল।
দুর থেকে প্রথমে সিনার্কার গাড়িটা দেখা গেল। তারপর অশ্বারোহী সৈন্যরা। পরে পদাতিক সৈন্যরা। স্পষ্ট দেখা গেল না। কিন্তু সৈন্যটি সিনার্কার গাড়ি দেখেই চিনল। সিনাকার সৈন্যরা চলে যেতে বিদ্রোহী সৈন্যটি হ্যারিকে বলল, বোধহয় সারিনের লড়াইয়ে সিনার্কা আমাদের সৈন্যদের কাছে হেরে গেছে।
আবার ছোটা শুরু হলো। কিছুক্ষণ পরে দূরে একটা ছোটো পাহাড় দেখিয়ে রোক্কার সৈন্যটি বলল, ঐ যে বার্গ পাহাড়। দেখা গেল পাহাড়টায় গাছগাছালি বিশেষ নেই। হ্যারি রা চলল ঐ বার্গ পাহাড় লক্ষ্য করে। বার্গ পাহাড়টার নীচে এসে দেখা গেল বেশ ঘন জঙ্গল। ঝোঁপঝাড়ের মধ্যে ফিরে গাছের নুয়ে পড়া ডালপালা সরিয়ে ওরা রোক্কার বিদ্রোহী সঙ্গীটির পেছনে পেছনে একটা বিরাট পাথরের চাইয়ের সামনে এলো। বিদ্রোহীটি মুখ নামিয়ে কী যেন বলে উঠল। পাথরের চাইয়ের আড়াল থেকে দু’তিন জন যোদ্ধা তলোয়ার হাতে বেরিয়ে এলো। ভাইকিংদের দেখে ওরা বেশ আশ্চর্য হল। তারপরেই হ্যারি দের সশস্ত্র দেখে ওরা থমকে দাঁড়াল। বিদ্রোহী সঙ্গীটি দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ওদের কী বলল। ওরা নিশ্চিন্ত হয়ে এবার হাসল। হাতের ইশারায় হ্যারিকে ডেকে ওদের পেছনে পেছনে আসতে ইঙ্গিত করল। ভাইকিংরা ওদের পেছনে পেছনে চলল। পাথরের চাইটার নীচে দিয়ে গুঁড়ি মেরে সবাই একটা বেশ বড়ো লম্বাটে গুহায় ঢুকল। দেখল—জনা পঁচিশেক বিদ্রোহী সৈন্য শুয়ে বসে আছে। এটাই তাহলে বিদ্রোহীদের আস্তানা। হ্যারি হাঁপাতে হাঁপাতে পাথুরে মেঝেয় বসে পড়ল। অন্য ভাইকিং বন্ধুরাও হাঁপাচ্ছে তখন। ওরাও বসে পড়ল। এই সকালেও গুহাটা কেমন অন্ধকার অন্ধকার।
