প্রায় আধঘণ্টা পরে রোক্কা একটা কাঠ আর পাথরে তৈরি বাড়ির পেছনে এলো। পেছনে পাথরের দেয়ালের গায়ে একটা কাঠের দরজা। রোক্কা দরজাটা বার কয়েক ধাক্কা দিল। দরজা খুলে গেল। সাধারণ পোশাকপরা একটি যুবক মুখ বাড়িয়ে রোক্কাকে দেখে হাসল। মাথা একটু নুইয়ে সম্মান জানাল। রোক্কা ফ্রান্সিসকে ইশারা করে ঢুকে পড়ল। ফ্রান্সিস ও ঢুকল। রোক্কা দুপাশের ঘর ছাড়িয়ে টানা বারান্দা দিয়ে বাইরের ঘরটায় এলো। কয়েকটা কাঠের তক্তা পেতে বিছানা করা। বালিশও আছে। রোক্কা ফ্রান্সিসকে হাতের ইঙ্গিতে মারিয়াকে শুইয়ে দিতে বলল। ফ্রান্সিস মারিয়াকে আস্তে আস্তে বিছানায় শুইয়ে দিল। রোক্কা যুবকটিকে বলল, শিগগির বৈদ্যমশাইকে আসতে বলো। যুবকটি ছুটে চলে গেল।
ফ্রান্সিস তক্তাপাতা বিছানায় বসল। হাঁপাতে লাগল। হঠাৎ ফ্রান্সিস মারিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল। মারিয়া চোখ খুলে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ দুটো দারুণ লাল। ফ্রান্সিস দ্রুত উঠে দাঁড়াল। ও বুঝে উঠতে পারল না কী করবে এখন? মারিয়া চোখ বুজল। অসাড় হয়ে শুয়ে রইল।
রোক্কার সঙ্গে একজন বয়স্ক লোক ঢুকলেন। তার গায়ে রোক্কার মতোই দামি পোশাক। তিনি বেশ দ্রুতই বিছানায় বসলেন। মারিয়ার কপালে হাত দিলেন। চোখ টিপে ধরে চোখের নীচটা দেখলেন। গোড়ালির কাছে হাত দিয়ে টিপে ধরলেন। রোক্কাকে বললেন, রোগীকে একটু পাশ ফিরিয়ে শুইয়ে দাও। লো ল্যাতিন ভাষা। ফ্রান্সিস বুঝল না। রোক্কা স্পেনীয় ভাষায় ফ্রান্সিসকে বলল কথাটা। ফ্রান্সিস মারিয়াকে ধরে আস্তে আস্তে বলল, বৈদ্যমশাই তোমাকে পরীক্ষা করবেন। একটু পাশ ফিরে শোও। মারিয়া পাশ ফিরতে গেলে ফ্রান্সিস সাহায্য করল। বৈদ্যমশাই মারিয়ার পিঠে আঙুল পেতে অন্য আঙুলে বেশ কয়েকবার ঠুকলেন। ফ্রান্সিসকে ইঙ্গিতে সোজা করে শোয়াতে বললেন। কয়েকটা নির্দেশ দিলেন। তারপর চুপ করে বসে রইলেন। কেউ কোনো কথা বলল না। একটু পরে যুবকটি একটা ছোটো চিনেমাটির বাটিতে সবজে রঙের জল নিয়ে এলো। তখনই মারিয়ার কাশি উঠল। আবার সেই কষ্ট, যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে কাশতে কাশতে। মারিয়া মাথা এপাশ ওপাশ করতে লাগল। ফ্রান্সিস অসহায়ের মতো মারিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কাশি কমল। একটু পরে কাশি বন্ধ হলো। মারিয়া মুখ হাঁ করে হাঁপাতে লাগল। ফ্রান্সিস বৈদ্যর মুখের দিকে তাকাল। দেখল বৈদ্যমশাইয়ের কপালে চিন্তার রেখা। উনি একদৃষ্টিতে মারিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। এবার ফ্রান্সিসকে ইঙ্গিতে ওষুধটা খাইয়ে দিতে বললেন। ফ্রান্সিস ওষুধের বাটিটা মারিয়ার মুখের কাছে এনে বলল, মারিয়া একটু কষ্ট করে এই ওষুধটা খাও। অসুখ সারবে। ফ্রান্সিস বাঁ হাতে মারিয়ার মাথাটা তুলে ধরল। মারিয়া চোখ বন্ধ অবস্থাতেই ওষুধটা খেয়ে নিল। মুখ বিকৃত করল। বোঝা গেল ওষুধটা বিস্বাদ। মাথাটা বালিশে নামাল ফ্রান্সিস বৈদ্যমশাই একটুক্ষণ বসে থেকে উঠলেন। মৃদুস্বরে ডাকলেন—কামেরাত যুবকটি এগিয়ে এলো, কামেরাতকে কী নির্দেশ দিলেন। এবার রোক্কা জিজ্ঞেস করল, কেমন দেখলেন? বৈদ্যমশাই লো ল্যাতিন ভাষায় বললেন, নিশ্চয়ই আগে কিছু ওষুধ পড়েছিল। নইলে উনি শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যেতেন। বৈদ্যমশাই চলে গেলেন।
উৎকণ্ঠিত ফ্রান্সিস বলল—রোক্কা, বৈদ্যমশাই কী বললেন?
রোক্কা আসল কথা না বলে একটু হেসে বলল, বললেন অসুখ সেরে যাবে। তবে কয়েকদিন ওষুধ পড়তে হবে। ফ্রান্সিস একটু আশ্বস্ত হলো। মারিয়া চোখ বন্ধ অবস্থাতেই শুয়ে রইল। ফ্রান্সিস বুঝল না মারিয়া কথাটা শুনেছে কি না।
কামেরাত একটি মোটা কাপড় নিয়ে এলো। মারিয়ার গায়ে ঢাকা দিল গলা পর্যন্ত। তারপর চলে গেল। রোক্কা বলল, আমি একটু আসছি। রোক্কা চলে গেল। একা ফ্রান্সিস মারিয়ার শিয়রে বসে রইল। ফ্রান্সিস ভাবতে লাগল, বন্ধুরা কেউ তো জানতেই পারল না আমরা এখানে আছি। রোক্কাকে বলতে হবে ওদের খবর দেবার জন্যে।
.
ওদিকে কয়েদঘর থেকেই রোক্কার বিদ্রোহী সৈন্যরা আর ভাইকিংরা মই বেয়ে পালাতে লাগল। ভাইকিংরা দশ-পনেরো জন আর কয়েকজন রোক্কার বিদ্রোহী সৈন্য পালিয়েছে তখন। এতজনের নড়াচড়া মই বেয়ে ওঠায় বেশ শব্দ হতে লাগল। তখনই দেখা গেল ভাঙা জানালা থেকে পাথর গড়িয়ে পড়ল। পাথরটা মাঝের বিছানা ঘেঁষে পড়ল। আবার জোর শব্দ তুলে পাথরটা ভেঙ্গে দু’টুকরো হয়ে গেল। পাহারাদার জেনো সৈন্যদের সন্দেহ হলো। ওরা লোহার দরাজ খুলে দ্রুত কয়েদঘরে ঢুকল। মসালের আলোয় মই দেখেই ওরা বুঝল কিছু কয়েদী পালিয়েছে। রোক্কাও পালিয়েছে। দুজন পাহারাদার সৈন্য নিরস্ত্র ভাইকিংদের ওপর তলোয়ার হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ভাইকিংরা কয়েকজন আহত হলো। অন্য সৈন্য দু’জন তলোয়ার চালিয়ে চালিয়ে মইয়ের দড়ি কেটে দিল। বাকি ভাইকিংদের আর রোক্কার বিদ্রোহী সৈন্যদের একজনের পালানো হলো না। কয়েদঘরে তালা লাগিয়ে পাহারাদার সৈন্যরা চলে গেল।
ভাঙা সিঁড়িটার কাছে দাঁড়িয়েছিল শাঙ্কো। কয়েদঘরে গোলমাল, পাহারাদার সৈন্যদের চিৎকার চ্যাঁচামেচি শুনেই বুঝল—ওরা টের পেয়েছে। বোধহয় মইয়ের দড়িও কেটে দিয়েছে। আর কারো পালানোর সম্ভাবনা নেই।
শাঙ্কো ভাঙা পাথরে পা রেখে রেখে যতটা দ্রুত সম্ভব খাদে নেমে এলো। মুক্ত বন্ধুরা এসে শাঙ্কোকে জড়িয়ে ধরল। শাঙ্কো বলল, বন্ধুরা, এখনও সব বন্ধু পালাতে পারেনি। পাহারাদার সৈন্যরা টের পেয়ে মইয়ের দড়ি কেটে দিয়েছে। এক্ষুণি আমাদের জাহাজে যেতে হবে। অস্ত্র এনে লড়াই করে বাকি বন্ধুদের মুক্ত করতে হবে।
