দু একবার জোরে ডান পায়ের চাপ দিল পাথরটায়। পাথরটা নড়ে উঠলেও খুলে বেরিয়ে আসার মতো আলগা হয়ে যায়নি। ডান পায়ে চাপ দিয়ে ভর রেখে বাঁ দিকের পাথরটায় বাঁ পা রাখল। আস্তে। চাপ দিয়ে দেখল ওটার জোড়টা বেশ শক্ত। পাথরটা নড়লোই না। নিশ্চিন্ত হয়ে ফ্রান্সিস ওটায় বাঁ পা রেখে মাথা নিচু করে আস্তে আস্তে দাঁড়াল। ওর নাক দিয়ে জোরে জোরে শ্বাস পড়ছে তখন। কাঁদে প্রায় অচেতন মারিয়ার শরীরের ভার। আবার হাতে সময় নেই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পালাতে হবে।
ফ্রান্সিস সামনের দিকে তাকাল। হাত পনেরো অন্ধকার গহ্বরমতো জায়গাটার ওপর শাঙ্কো টান টান দড়ির মইটা পেতে রেখেছে। সিঁড়ির মতো কাঠের ফালি বাঁধা দুটো শক্ত দডিতে। ঐ কাঠের ফালিগুলোতে পা রেখে রেখে অন্ধকার গহ্বরমত জায়গাটা পার হলেই পাথরের সিঁড়ি। ওপরের দিকে উঠে গেছে। সিঁড়িতে শাঙ্কো হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সিঁড়ির ওপরটায় পাথরের দরজা। দরজার পাল্লা নেই। ভেঙে গেছে নিশ্চয়ই। ওপরে বোধহয় দুর্গের খোলা ছাদ। কারণ ওখান দিয়ে সামনের সিঁড়িতে পাথুরে দেয়ালে চাঁদের আলো কোণাকুণি পড়েছে। অতি দ্রুত ফ্রান্সিস এসব ভেবে নিল।
ফ্রান্সিস একটু দম নিল। তাকাল ঐ একফালি চাঁদের আলোটার দিকে। তাকিয়ে ওর হঠাৎ মনে হল কে যেন সাদা পোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছে ওখানে। এরকম সুতোর কাজ করা পোশাক পরেও অনেকদিন যাকে গির্জার উৎসবে যেতে দেখেছে। ফ্রান্সিসের শরীরটা একটু কেঁপে উঠল। চোখ বুজে অস্ফুটস্বরে ডাকল—মা। ওর মনের জোর অনেক বেড়ে গেল। ও চোখ খুলে নিচু হল। প্রায় হামা দিয়ে কাঠের ধাপগুলোয় কখনও পা রেখে কখনও হাঁটু চেপে চেপে ও অন্ধকার গহ্বরমতো জায়গাটা পার হতে লাগল। পিঠে মারিয়ার নাক মুখ দিয়ে গরম শ্বাস পড়ছে। মারিয়ার শরীরও গরম। বেশ জ্বর। মারিয়া দুহাতে ওর গলা জড়িয়ে ধরে রেখেছে। কিন্তু জ্বরের ঘোরে হাত আলগা হয়ে যেতে পারে। গড়িয়ে পড়ে যেতে পারে। শরীরে একটা আলতো ঝাঁকুনি দিয়ে দু’তিনটে ধাপ দ্রুত পার হয়েই শেষ ধাপটাও পার হল। তখনই শাঙ্কো দুহাতে ওর বাহু ধরল। পাথরের সিঁড়ির দিকে টেনে আনল। ফ্রান্সিস পাথরের সিঁড়িতে দু পা রাখল। শাঙ্কো নিচু হয়ে বসল। ফ্রান্সিস ওর কাঁধে ভর দিয়ে আস্তে আস্তে শাঙ্কোর সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস তখন জোরে জোরে মুখ দিয়ে শ্বাস নিচ্ছে। হাঁপাতে হাঁপাতে অস্ফুটস্বরে ডাকল—মারিয়া। কোনো উত্তর নেই। আবার ডাকল—মারিয়া।
—উঁ। মারিয়া মুখে গোঙানির মতো শব্দ করল। ফ্রান্সিস বলল—তোমার কষ্ট হয় নি তো? মারিয়া কোনো কথা বলল না। এতক্ষণে ফ্রান্সিস বুঝল ওর পিঠে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ছে। মারিয়া নিঃশব্দে কাঁদছে। পিঠের ওখানটার পোশাক ভিজে গেছে যেন।
ফ্রান্সিস আর দাঁড়াল না। মারিয়ার কাশি উঠলে ভয়ানক বিপদ হবে। পাহারাদারবা শুনতে পারে।
শাঙ্কো তখন সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। ফ্রান্সিস ও মারিয়াকে কাঁধে নিয়ে উঠতে লাগল। দুর্গের ছাদে উঠে শাঙ্কো এগিয়ে চলল। ফ্রান্সিস ও পিছু পিছু চলল। এখানে-ওখানে ভাঙা পাথরের পাটাতন ছড়িয়ে আছে। সেইগুলোর ওপর দিয়ে সাবধানে পা ফেলে ফেলে চলল। অসাবধান হলে পায়ের চাপে পাথর নড়ে যেতে পারে পাও পিছলে যেতে পারে।
শাঙ্কো তো জায়গাটা চেনে। ও ফ্রান্সিসের আগেই খাদের ধারে চলে এলো। এখানেই ও কাছিটা কোমর থেকে খুলে রেখেছিল। কাছির একটা মুখ টেনে বাঁধলো একটা পাথরের চাইয়ের সঙ্গে তারপর কাছিটা খাদে ঝুলিয়ে দিল। ফ্রান্সিস মারিয়াকে নিয়ে ততক্ষণে এসে পড়েছে।, শাঙ্কো বলল, ফ্রান্সিস, আমিই না হয় রাজকুমারীকে কাঁধে নিয়ে নামি।
ফ্রান্সিস শুধু বলল, আমি পারবো। তারপর মারিয়াকে কাঁধে নিয়ে কাছিটা ধরল। বলল, মারিয়া এবার কষ্ট হলেও আমাকে ভালো করে আঁকড়ে ধরো। মারিয়া দুর্বল শরীরের আর কতটা জোর পাবে। তবু জোরে আঁকড়ে ধরল ফ্রান্সিসকে। ফ্রান্সিস বলল, শরীরের সমস্তশক্তি দিয়ে আরো জোরে ধরো। একটুক্ষণ। আমরা মুক্তির দোরগোড়ায়। মারিয়া আরো জোরে আঁকড়ে ধরল। ফ্রান্সিস খাদের ওখানে পাথরে পা রেখে রেখে কাছি বেয়ে বেয়ে বেশ দ্রুতই নেমে এলো। বুঝল মারিয়া এত জোরে বেশিক্ষণ ধরে থাকতে পারবে না। এখানটায় পাথর কম। ম্লান চাঁদের আলোয় একটা ঘাস-ঝোপে-ঢাকা জায়গায় মারিয়াকে শুইয়ে দিল। তারপর পাশে নিয়ে শুয়ে পড়ল। মুখ হাঁ করে হাঁপাতে লাগল।
হাঁপাচ্ছে তখন কয়েদঘরে সবাই এতক্ষণ মই বেয়ে পালিয়ে যাওয়া দেখছিল। হ্যারি যখন বুঝল মারিয়াকে নিয়ে ফ্রান্সিস পালাতে পেরেছে তখন রোক্কার দিকে তাকাল। বলল, রোক্কা, ফ্রান্সিস নিরাপদে পালাতে পেরেছে। এখন আপনাকে সবার আগে পালাতে হবে। পালিয়ে গিয়ে প্রথম আপনাকে রাজকুমারীর ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ এখন রাজকুমারীকে সুস্থ করে তোলার আগে পর্যন্ত আমরা কিছু ভাবতে পারছি না। আমাদের কারো মনে এখন শান্তি নেই। রোক্কা একটু ভাবল। বলল, কথাটা ঠিকই বলেছেন।
ফ্রান্সিস নিশ্চয়ই অসুস্থ রাজকুমারীকে নিয়ে বাইরে অপেক্ষা করছে। কারণ, ফ্রান্সিস এখানকার কিছুই চেনে না। হ্যারি বলল।
খুবই স্বাভাবিক। রোক্কা বলল। একটু ভেবে নিয়ে রোক্কা বলল, কিন্তু আর দেরি করা যাবে না। রোক্কা এবার দুহাত ওপরে তুলে নিঃশব্দে হাতের ইঙ্গিতে সবাইকে কাছে। আসতে বলল। সবাই এসে রোক্কাকে ঘিরে গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়াল। রোক্কা লো ল্যাতিন ভাষায় নিজের দলের লোকেদের বলল, বন্ধুরা—এরা ভাইকিং-বিদেশি। এই কর্সিকা দ্বীপের কিছু ওঁরা চেনেন না। তোমরা ওঁদের আন্তরিকভাবে সাহায্য করবে এই আমার নির্দেশ। কারণ—এঁদের যেটুকু পরিচয় আমি পেয়েছি তাতে নির্দ্বিধায় বলতে পারো এঁরা শুধু সৎ ও বিবেকবান নন—বীর ও দুঃসাহসী। একটু থামল রোক্কা। তারপর বলল, আমাদের আর দেরি করা উচিত হবে না! তোমরা এই ভাইকিং বন্ধুদের নিয়ে বার্গ পাহাড়ে আমাদের আস্তানায় চলে যাবে। আমি পরে তোমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করব। রোকা থামল। তারপর হ্যারিকে বলল, আপনি আপনার বন্ধুদের আবার কথাগুলো বুঝিয়ে বলে দেবেন। এবার সবাই পালাবার জন্যে তৈরি হও। বলেই রোক্কা মইটার কাছে গেল। মই বেয়ে দ্রুত উঠতে উঠতে চাপা গলায় বলল, কোনো গোলমাল যেন না হয়। হ্যারি বন্ধুদের রোক্কার নির্দেশ বুঝিয়ে বলল। রোক্কা মই বেয়ে উঠে ফাঁকের জায়গাটা পার হয়ে ভাঙা পাথরের স্তূপের ওপর এলো। শাঙ্কো একটা পাথরের চাইয়ের আড়ালে আত্মগোপন করে চারদিকে নজর রাখছিল। এবার এগিয়ে এসে ঝোলানো কাছিটা আঙুল দিয়ে দেখাল। রোক্কা দ্রুত কাছি বেয়ে খাদে নামল। ফ্রান্সিস রোক্কাকে দেখে উঠে দাঁড়াল। রোক্কা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, রাজকুমারীকে নিয়ে চলুন। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হলো। মারিয়াকে আস্তে আস্তে দুহাতে তুলে পাঁজাকোলা করে রোক্কার পেছনে পেছনে চলল। তখনই দেখল, পুব আকাশে লাল ও রং ধরেছে। সূর্য উঠতে দেরি নেই। চিন্তা হলো বন্ধুরা সূর্য ওঠার আগেই পালাতে পারবে কিনা। কিন্তু এখন আর ফিরে বন্ধুদের সাহায্য করার কথা ভাবতে পারল না। মারিয়ার জুরে গা পুড়ে যাচ্ছে। রোক্কা বসতি এলাকা এড়িয়ে ঝোঁপঝাড় পাথুরে এলাকা দিয়ে চলল। পেছনে মারিয়াকে নিয়ে ফ্রান্সিস ও যতটা সম্ভব দ্রুত ছুটল।
