শাঙ্কো ফেল্লকার পেছনে হালের কাছে নিঃশব্দে এলো। হালের কাঠের খাঁজে খাঁজে পায়ের ভর রেখে রেখে পেছনে ডেক-এ উঠে এলো। ছোরা বের করল। দ্রুত হাতে মইটা যে লম্বা দড়ির সঙ্গে বাঁধা সেটা কেটে ফেলল। নোঙরের বাঁধা কাছিটা কেটে ছোরাটা কোমরে গুঁজল। কাটা কাছির মুখটা কোমরে জড়ালো। তারপর দড়ির মইয়ের মুখের দড়িটা হাতে নিয়ে হালের মইয়ের প্রথম ফাঁকটায় বাঁ হাত গলিয়ে কাঁধে আটকে নিল। কাছির মুখটাও বাঁ হাতে ধরল। ডান হাতটা দিয়ে জল টেনে টেনে আস্তে আস্তে সাঁতরে চলল তীরের দিকে। মই আর লম্বা কাছি টেনে আনতে বেশ অসুবিধে হচ্ছিল। তবে দুরত্ব কম বলে কিছু পরেই সব নিয়ে তীরে উঠল। কাছির সবটা কোমরে পেঁচিয়ে নিল। শাঙ্কোর শরীর দেখাল পিপের মতো। মইটা দ্রুত হাতে ভাজ করে করে গুটিয়ে কাঁদে ফেলে শাঙ্কো চলল সেই দুর্গের পেছন দিকে। এক্ষণে সমুদ্রের জোর হাওয়ায় শাঙ্কোর জলে ভেজা শরীর শীত শীত করে উঠল। একবার মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। সমুদ্রের ওপর পাতলা সাদাটে কুয়াশার মধ্যে দিয়ে অস্পষ্ট চাঁদের আলোয় দেখল ফেল্লকা দুটো অনেক দূরে ভেসে যাচ্ছে।
দুর্গের পেছনে যখন এলো তখন আকাশের দিকে তাকালরাত শেষ হতে কত দেরি? দেখল—চাঁদ আর তারাগুলোর আলো ম্লান হয়ে এসেছে। বুঝল—রাত বেশি নেই। শাঙ্কোরা তো জাহাজে জাহাজেই ঘুরে বেড়ায়। দিন রাতের আকাশ দেখে ওরা মোটামুটি সময় হিসাব করতে পারে।
কাছি আর মই নিয়ে বেশ কসরৎ করে শাঙ্কো ওক গাছটার ডাল থেকে পাথরের স্তূপের ওপর নামল। সাবধানে পা ফেলে ফেলে ভাঙা সিঁড়িগুলোর কাছে এলো। তারপর আগের মতোই হাতের তেলো গোল করে ডাকল, ফ্রান্সিস ফ্রান্সিস তখনও দাঁড়িয়ে আছে।
উৎকণ্ঠায় ফ্রান্সিস তখন ভাবছে-শাঙ্কো কি ওদের পালাবার উপায় বের করতে পারবে?
শাঙ্কোর ডাক শুনেই ফ্রান্সিস আগের মতোই বলল, শাঙ্কো? শাঙ্কো তখন চাঁদের ম্লান আলোয় চারদিকে তাকাতে লাগল। দেখল দুটো বড়ো বড়ো পাথরের পাটাতন সিঁড়ির ওপর পড়ে আছে। শাঙ্কো মইয়ের একমুখের টানা দড়িটা দিয়ে পাথর দুটোয় পেঁচিয়ে বাঁধল। তারপর মইয়ের অন্য মুখটা দুহাতে ছুঁড়ে দিল ভাঙা জানালার ফোকরের দিকে। কিন্তু ফোকর দিয়ে গলে গেল না মইয়ের মাথাটা। পাথরে ঠকঠক শব্দ তুলে নীচে গড়িয়ে পড়ল। শাঙ্কো সাবধান হলো। কোনোরকম শব্দ হওয়া চলবে না। মইয়ের মুখটা টেনে তুলল। বার কয়েক মইয়ের মাথাটা শূন্যে ঘুরিয়ে জোরে ছুঁড়ে দিল ভাঙা ফোকরটার দিকে। এবার মুখটা ফোকরের মধ্যে দিয়ে গলে গেল। শাঙ্কো মইটা ছাড়াতে লাগল। মইয়ের মাথাটা নীচে নামতে নামতে মেঝের কাছে চলে এলো। তখন ফ্রান্সিস হ্যারি রোক্কা তিনজনই ছুটে এলো মইয়ের কাছে। ফ্রান্সিস মইয়ের মাথাটা কয়েকবার জোরে টানল। দেখল মইটা যথেষ্ট শক্ত করে বাঁধা হয়েছে। এবার ফ্রান্সিস দ্রুতপায়ে মারিয়ার কাছে এলো। মারিয়ার কানের কাছে মুখ এনে ডাকল মারিয়া-মারিয়া। মারিয়া চোখ খুলল। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বলল—আমরা পালাব। তোমার কষ্ট হবে, ব, কিন্তু দাঁত চেপে তোমাকে কষ্ট সহ্য করতে হবে।
কোনরকম শব্দ করবে না।
মারিয়া ঠোঁট একটু ফাঁক করে দুর্বলস্বরে বলল—আচ্ছা।
ফ্রান্সিস মারিয়াকে পিঠ আর হাঁটুর কাছে ধরে ধরে ঘাসের বিছানা থেকে তুলল। তারপর মারিয়াকে বাঁ কাঁধে শুইয়ে নিল। এই ঝাঁকুনিটা যত কমই হোক আর ফ্রান্সিস সাবধান থাকা সত্ত্বেও মারিয়ার কাশি এলো। শুরু হল মারিয়ার দমবন্ধকরা কাশি। ভেন তাড়াতড়ি মারিয়ার পিঠে হাত দিয়ে চেপে চেপে দিতে লাগল। ফ্রান্সিস এক পাও নড়ল না। মারিয়াকে কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ঘরের মধ্যে মারিয়া কাশলে ভয়ের কিছু নেই। মারিয়া এর আগেও কেশেছে—পাহারাদার সৈন্যরা শুনতেও পেয়েছে। কিন্তু ঐ ভাঙা জানালার কাছে উঠে কাশলেই বিপদ হবে। সেই কাশির শব্দ পাহারাদারদের কানে গেলে ওদের সন্দেহ হবেই। সব পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে। এই কয়েদঘর থেকে মুক্তির আর কোনো আশাই থাকবে না। মারিয়ার কাশি কমল। তবু ফ্রান্সিস নড়ল না। মশালের আলোয় হ্যারি দেখল—দুচোখ বন্ধ করে ফ্রান্সিস স্থির দাঁড়িয়ে আছে। ওর ঘামে-ভেজা মুখ মশালের আলোয় চকচক করছে। একদিকে মারিয়ার জন্যে দুশ্চিন্তা অন্যদিকে পালাবার এই সুবর্ণ সুযোগ এবং শেষ সুযোগ ফ্রান্সিসের মনে কী ঝড়ের তোলপাড় চলছে হ্যারি সেটা স্পষ্টই বুঝতে পারল। মারিয়ার কাশি বন্ধ হলো। মারিয়া মুখ হাঁ করে হাঁপাতে লাগল। ফ্রান্সিস মারিয়াকে কাঁধে নিয়ে আস্তে আস্তে মইয়ের দিকে এগোল। মইয়ের কাঠে পা রেখে আস্তে আস্তে উঠতে লাগল। ততক্ষণে ভাইকিংরা রোক্কার বিদ্রোহী বন্ধুরা সবাই দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে দেখতে লাগল ফ্রান্সিস কী অসীম ধৈর্য আর মনের জোরে সব কষ্ট সহ্য করে এক-পা এক-পা করে মই দিয়ে উঠছে। ভাইকিং বন্ধুদের কয়েকজনের চোখে জল এলো। সবাই মনে মনে প্রার্থনা করতে লাগল—ফ্রান্সিস যেন সফল হয়।
ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে মারিয়াকে নিয়ে উঠতে লাগল। একসময় ভাঙা জানালার ফোকরের নীচের পাথরে পা রাখল। পাথরগুলো জোড়ের জায়গায় ভেঙে গিয়ে বেশ আলগা হয়ে গেছে। ফ্রান্সিস ডান পাটা রেখেই বুঝল সেটা। পা’টা নামিয়ে আনল। হিসেব করে পায়ের চাপ দিতে হবে। জ্যোৎস্নার অস্পষ্ট আলোয় ও ডানদিকের জোড়া পাথরটায় ডান পা’টা রেখে পায়ের চাপ আস্তে আস্তে বাড়াতে লাগল সাবধানে। বেশি নড়ে গেলে ভারসাম্য রাখতে পারবে না। কাঁধে প্রায় অজ্ঞান মারিয়ার শরীরের চাপও রয়েছে। পাথরটা বেশি সরে গেলে ভারসাম্য হারিয়ে দুজনকেই ছিটকে পড়তে হবে সামনের হাত পনেরো অন্ধকার ফাঁকটার মধ্যে। তারপর অন্ধকারে নীচে কোথায় আছড়ে পড়বে। দুজনেরই মৃত্যু অবধারিত। ফ্রান্সিস মৃত্যুর চিন্তাটাকে অগ্রাহ্য করল মনে মনে। ওসব চিন্তা মনটাকে দুর্বল করে দেবে। শরীরটাকেও এখন সবচেয়ে প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস। এই অন্ধকারে বাঁকটায় পেতে রাখা দড়ির মই দিয়ে পার হতেই হবে।
