দুর্গা ঘুরে শাঙ্কো দুর্গার পেছনদিকে এলো। দেখল—পেছন থেকে পাথুরে দেয়াল ভেঙে পড়েছে। দুর্গের এই ভাঙা অংশটার নীচেই একটা খাদমতো। খুব গভীর খাদ নয়। খাদটায় গাছপালার জঙ্গল। এদিকটায় দুর্গের ভাঙা পাথরের স্তূপ। সেই ভাঙা স্তূপ জমে জমে দুর্গার প্রায় মাথার কাছে উঠে গেছে। চাঁদের আলোয় ঐ দিকে ভালো করে নজর দিয়েও কোনো প্রহরীকে দেখল না। বুঝল—এদিক দিয়ে কেউ দুর্গে ঢুকতে পারবে না বলেই এদিকটা অরক্ষিত হয়ে আছে।
এবার শাঙ্কো খাদের বড়ো বড়ো গাছগুলোর মাথা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল। চাঁদের আলোয় যতটুকু দেখতে পেল তাতে বুঝতে পারল ঐ বড়ো বড়ো গাছগাছালি বেয়ে উঠে পাথরের স্তূপের কাছে যাওয়া যাবে। তারপর ভাঙা পাথরের স্তূপের ওপর দিয়ে দুর্গের অনেকটা ওপরে ওঠা যাবে।
শাঙ্কো দ্রুত কাজে নামলো। খাদটার গায়ে গায়ে পাথরের এবড়োখেবড়ো চাইয়ের ওপর পা রেখে রেখে একটা বেশ উঁচুতে ডালপালা ছড়ানো ওক গাছের নীচে এলো। তারপর উঁচুতে ঝুঁকেপড়া ডাল দেখে হিসেব করল। গাছটায় উঠতে লাগল। ডালপালার ফাঁক-ফোকর দিয়ে যেটুকু চাঁদের আলো আসছে সেই আলোই শাঙ্কোর ভরসা। একসময় ওক গাছটার মগডালে উঠে এলো। ডালটা ধরে তন্য একটা মোটা ডালে পা টিপে টিপে এগোতে লাগল। দুর্গোর ভাঙাপাথরের স্তূপের কাছে এলো। শাঙ্কো তখন বেশ হাঁপাচ্ছে। গাছটার কাণ্ড বেয়ে বেয়েও ওকে উঠতে হয়েছে অনেকটা। একটু অপেক্ষা করে দম নিল। তারপর ঐ ডালটা ছেড়ে দিয়ে পাথরের স্তূপের ওপর নেমে এলো। এখানে জ্যোৎস্না উজ্জ্বল। ও সাবধানে ভাঙা পাথরে পা রেখে রেখে দুর্গের ওপর উঠতে লাগল। তখনই দেখল বাঁ দিকের পাথরের ভাঙা সিঁড়ি নেমে গেছে। ফ্রান্সিসদের কোন ঘরে বন্দি করে রাখা হয়েছে শাঙ্কো তো জানে না তা। ভাঙা সিঁড়ি দিয়ে সাবধানে কিছুটা নামতেই দেখল ডানহাতি একটা জানালার মতো ফোকর। তবে ভাঙা। শাঙ্কো দেখল ভাঙা সিঁড়িগুলো থেকে ফোকরটা হাত পনেরো দূরে। এই ফাঁকটা পার হবার উপায় নেই। শাঙ্কো ওখান থেকে দু’হোৈতর চেটো মুখের কাছে গোল করে ফোকরের দিকে মুখ এগিয়ে ডাকল, ফ্রান্সিস হ্যারি ফোকরের নীচের কয়েদঘরে তখন হ্যারি আর রোক্কা মৃদুস্বরে পরস্পরের সঙ্গে কথা বলছিল। ওরা সেই ডাক শুনতে পেল না। কিন্তু ফ্রান্সিস ডাকটা অস্পষ্ট শুনল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। কান পাতল। হ্যারি আর রোক্কা কথা থামিয়ে ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে রইল। আবার একটু স্পষ্ট ডাক শোনা গেল, ফ্রান্সিস—হ্যারি হ্যারি ধড়মড় করে উঠে দাঁড়াল। চাপাস্বরে বলল, নিশ্চয়ই শাঙ্কো।
কিন্তু কোথা থেকে ডাকছে শাঙ্কো? ফ্রান্সিস চারদিকে তাকাতে তাকাতে বলল। হ্যারি আঙুল দিয়ে ছাদের কাছে ভাঙা জানালাটা দেখিয়ে বলল—ঐখান থেকে শাঙ্কো ডাকছে।
ফ্রান্সিস ও দুহাতে চেটো গোল করে বলল—শাঙ্কো—আমরা এই ঘরে।
ভাঙা জানালার নীচে শাঙ্কোর কথা শোনা গেল, অপেক্ষা করো। আমি দড়ি নিয়ে আসছি। ফ্রান্সিস হ্যারি রোক্কা তিনজনেই কথাটা শুনল।
রোক্কা বলল, কে কথা বলছে?
আমাদের এক বন্ধু—শাঙ্কো। ও যদি ঐ ভাঙা জানালা দিয়ে দড়ি নামিয়ে দিতে পারে তাহলে আমরা দড়ি বেয়ে উঠে ঐ ভাঙা জানালা দিয়ে পালাতে পারবো। হ্যারি বলল।
শাঙ্কো নিশ্চিন্ত হলো—যাক ফ্রান্সিসদের পাওয়া গেছে ভাঙা জানালার নীচের ঘরটাতে। শাঙ্কো আর দাঁড়াল না। ভাঙা পাথরের স্তূপের ওপর দিয়ে যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব নামতে লাগল। ওক গাছটার কাছে এসে লাফিয়ে উঠে মগডালটা ধরল। তারপর গাছ থেকে কখনও ডাল ধরে কখনও কাণ্ড বেয়ে বেয়ে দ্রুত নীচে নেমে এলো। ছুটল জাহাজঘাটের দিকে। জাহাজ থেকে মোটা কাছি আনতে হবে।
রাস্তা দিয়ে নয়—শাঙ্কো বাড়িঘরদোরের আড়ালে আড়ালে গাছ ছোপ পাথুরে মাটির ওপর দিয়ে বেশ দ্রুত ছুটে এলো জাহাজঘাটে। চাঁদের আলোয় দেখল—নোঙকরা ওদের জাহাজটাকে মাঝখানে রেখে দুটো যুদ্ধজাহার্জ দাঁড়িয়ে আছে—এখানে যুদ্ধ জাহাজকে বলে ফেল্লকা। সৈন্যদের হাঁটুঝুল কাপড়ের পোশাককে বলে কাপট। শাঙ্কো ঠিক করল ওদের জাহাজ থেকেই লম্বা কাছি আর দড়ির মই নেবে। তার আগে ফেল্লকা দুটোর নোঙরের দড়ি কেটে দিতে হবে যাতে ফেল্লকা দুটো বাতাসের ধাক্কায় আস্তে আস্তে গভীর সমুদ্রের দিকে চলে যায়। বাতাস সমুদ্রের দিকেই বইছে। আস্তে আস্তে ফেল্লকা দুটো ভেসে গেলে ভেতরের সৈন্যরা বুঝতেই পারবে না।
শাঙ্কো দেখল জাহাজঘাটের এখানে-ওখানে মশাল জ্বলছে নজরদার মিনারের ওপারের আগুনও স্তিমিত। একটা অন্ধকার জায়গা বেছে নিয়ে শাঙ্কো সেখান দিয়ে গুঁড়ি মেরে গিয়ে সমুদ্রের জলে নামল। জলে কোনো শব্দ না তুলে চলল বাঁদিকের ফেলুকার দিকে। ফেলুকার কাছে এসে চাঁদের আলোয় দেখল—মাত্র একজন কাপটপরা সৈন্য ডেক-এ ঘোরাফেরা করছে। শাঙ্কো জলে ডুব দিয়ে ফেলুকার নোঙরবাঁধা কাছিটার কাছে আস্তে জল থেকে মাথা তুলল। তারপর কোমর থেকে ছোরাটা খুলল। ধারালো ছোরার কয়েকটা পোঁচেই নোঙরের কাছি কেটে গেল। ফেল্লুকাটা (জাহাজ) আস্তে আস্তে সরে যেতে লাগল গভীর সমুদ্রের দিকে।
শাঙ্কো কোমরে ছোরা গুঁজে এ পাশের ফেল্লকার দিকে নিঃশব্দে জল ঠেলে চলল। নোঙরের কাছির কাছে এলো। কাছিটা দেখে ওর মনে হলো এই কাছিটাই নিয়ে গেলে ভালো হয়। ও এই কথা ভেবে জলে ডুব দিল। কাছিটার গায়ে হাত দিয়ে দিয়ে বেশ নীচে নেমে এলো। তারপরে ছোরা বের করে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে কাছিটা কাটল। কোমরে ছোরা গুঁজে আস্তে জলের ওপর মাথা তুলল। তখনই নজরে পড়ল ফেল্লুকার পেছনে হালের কাছে মইটা ঝুলছে। কাঠের ছোটো ছোটো ধাপবাঁধা দড়ির মইটা বেশ শক্তপোক্ত। ওদের দড়ির মইয়ের চেয়ে অনেক ভালো আর লম্বাও।
