যাক, একজন তো বাইরে রইলো। ফ্রান্সিস ক্লান্তস্বরে বলল।
হ্যারি ঘরটার চারিদিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল। ভাইকিং বন্ধুরা প্রায় সবাই শুয়ে পড়েছে। কয়েকজন হঁটুতে মাথা রেখে বসে আছে। কেউ কোনো কথা বলছে না। অবশ্য কথা বলার মতো মনের অবস্থা এখন ওদের নেই। একদিকে রাজকুমারীর এই অবস্থা অন্যদিকে কাপুরুষের মতো আত্মসমর্পণ—ওরা একেবারে নিশ্চল্প হয়ে গেছে। হ্যারি রা আসার আগে যে বন্দিরা ছিল তাদের দেখা গেল সবাই ঘুমিয়ে আছে। তাদের পরনে এই অঞ্চলের চাষিদের জোব্বামতো পোশাক। শুধু একজন পাথরের দেয়ালে পিঠ দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে আছে। মশালের আলো ওখানে অল্পই পৌঁছেছে। হ্যারি আবছা দেখল লোকটির পরনের পোশাক একইরকম তবে রঙটা ঘন নীল। একটু দামি ভালো কাপড়ের পোশাক। লোকটির মাথার এলোমেলো বড়ো বড়ো চুল কপালে নেমে এসেছে। মুখে পাতলা দাড়ি-গোঁফ। কতদিন এখানে বন্দি হয়ে আছে কে জানে। হ্যারি ওপরের দিকে তাকাল। পাথরের ছাদ। ডানদিকে ছাদের একটু নীচে মনে হলো একটা ফোকরমতো। আগে বোধহয় লোহার গরাদ বসানো জানালা ছিল। তাতে গরাদ নেই। ফোকরের জায়গাটা পাথর ভেঙে বড়ো হয়ে গেছে। কিন্তু এত দ্রুত যে দেয়াল বেয়ে পৌঁছনো অসম্ভব।
হঠাৎ ফ্রান্সিস বলল, ভেন দ্যাখো তো। মনে হচ্ছে মারিয়ার জ্বরটা বেড়েছে।
ভেন এগিয়ে এলো। মারিয়ার কপালে গলায় হাত চাপল। বলল, একটা ওষুধ খাওয়াতে হবে।
ফ্রান্সিস হ্যারিকে বল, একপাত্র জলের ব্যবস্থা করো। হ্যারি উঠে দাঁড়াল। বন্ধুদের কাউকে ডাকল না। কিন্তু জল কোথায়? হ্যারি চারদিকে তাকাল। বোধহয় হ্যারিকে চারিদিকে তাকাতে দেখেই প্রায় অন্ধকার থেকে লোকটি স্পেনীয় ভাষায় বলল, আপনি ও কি কিছু খুঁজছেন? বেশ ভারী গলা লোকটির।
হ্যারি একটু দ্রুতই শায়িতদের ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে লোকটির কাছে এলো। বলল, একজন অসুস্থকে ওষুধ খাওয়াতে হবে। জল কোথায় রাখা আছে?
লোকটি আঙুল তুলে বাঁ দিকের কোণটা দেখাল। বলল, ওখানে একটা বাড়তি কাঠের পাত্রও আছে। হ্যারি চলল সেই দিকে। একটু পরেই কাঠের পাত্রে জল নিয়ে ফিরে এলো। ভেন ততক্ষণে ওর ঝোলা থেকে ওষুধ বের করে হাতের তালুতে ঘষে ঘষে বড়ি বানিয়েছে। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে মারিয়ার মাথার নীচে হাত দিল। মৃদুস্বরে বলল, মারিয়া একটা ওষুধ খেয়ে নাও। তারপর হাত দিয়ে মাথাটা একটু উঁচু করল। ভেন বড়িটা হ্যারির হাতে দিল। হ্যারি জল আর বড়িটা আস্তে আস্তে মারিয়াকে খাইয়ে দিল। মাথা নামিয়ে দিতেই মারিয়া গোঙাতে লাগল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে মারিয়ার মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিল। কপালে মাথায় হাত বুলোতে লাগল। আস্তে আস্তে মারিয়ার গোঙানি বন্ধ হলো।
হ্যারি চুপ করে বসেছিল। শরীর ক্লান্ত। ঘুমে চোখ বুজে আসছে। কিন্তু ফ্রান্সিস আর মারিয়ার দিকে চোখ পড়তে হ্যারি আর ঘুমের কথা ভাবতেই পারছিল না। হঠাৎ হ্যারি শুনল, আপনাদের মধ্যে অসুস্থ কে? হ্যারি মুখ ফিরিয়ে দেখল সেই লোকটি ওদের কাছে চলে এসেছে। হ্যারি হাত তুলে মারিয়াকে দেখাল। লোকটি বেশ আশ্চর্য হলো মারিয়াকে দেখে। বলল, ইনি তো মহিলা। তার ওপর অসুস্থ। সিনাৰ্কার সৈন্যরা এঁকেও বন্দি করল?
হ্যারি বলল, ইনি আমাদের দেশের রাজকুমারী।
আপনারা বিদেশি। লোকটি বলল।
হ্যাঁ, আমরা ভাইকিং। হ্যারি বলল।
আমার নাম রোক্কা। লোকটি বলল।
ফ্রান্সিসকে দেখিয়ে হ্যারি বলল, ও ফ্রান্সিস—রাজকুমারীর স্বামী। আমি হ্যারি রোক্কা একটু মাথা নুইয়ে নিয়ে এ অঞ্চলের ভদ্রতা দেখাল। ফ্রান্সিস কোনো কথা বলল না। চুপ করে মাথা নিচু করে বসে রইল। হ্যারি ভাবল রোক্কার সঙ্গে কথা বলে সময়। কাটানো যাবে। জেগেও থাকা যাবে।
—রোক্কা, আপনাদের এই বন্দিদশার কারণ কী?
সে অনেক কথা। শুধু এটুকু বলি—সিনার্কা জেনো। জেনোয়ার অধিবাসীদের আমরা জেনো বলি। কর্সিকার এই দক্ষিণ অঞ্চলে সিনার্কা তার রাজস্ব কায়েম করেছে। দরিদ্র চাষি আর জেলেদের ওপর তার অত্যাচার নিপীড়নের শেষ নেই। আমরা তাই সিনার্কার অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছি। আমাদের শক্ত ঘাঁটি হলো কিছু উত্তরে সারিন-এ। এখানে সব চাষি জেলেদের বিদ্রোহী করে তুলতে আমরা এসেছিলাম। সামান্য ভুলের জন্য ধরা পড়ি। মাস ছয়েক আমরা এখানে বন্দি হয়ে আছি। একবার এখান থেকে বেরুতে পারলে সিনার্কা ও তার তাবেদার ভূস্বামীদের কর্সিকা থেকে তাড়াবো। রোকা থামল। তারপর মারিয়ার চিকিৎসা কী হচ্ছে, ওরা কী করে এখানে এলো, এসব নিয়ে হ্যারির সঙ্গে কথা বলতে লাগল।
.
শাঙ্কো সমুদ্রের জলে ডুব দিয়ে কখনো আস্তে আস্তে সাঁতরে সমুদ্রতীরে এলো। জল থেকে উঠে শাঙ্কো বাড়িঘরের আড়ালে আড়ালে রাস্তার ধারে এলো। পাথুরে দেয়ালের ৭ আড়াল থেকে দেখল—ফ্রান্সিসরা দুর্গে ঢুকল। বুঝল, এখানে নিশ্চয়ই কোনো কয়েদঘর আছে। ফ্রান্সিসদের সেখানেই বন্দি করা হলো।
শাঙ্কো বিছুদূরের একটা চেস্টনাট গাছের আড়াল থেকে চাঁদের আলোয় দুর্গটা দেখতে লাগল। কালো পাথরের দেয়ালে দেয়ালে কোথাও কোথাও ফাটল ধরা। সবুজে শ্যাওলার ছোপ। দেখে বুঝল দুৰ্গটা পুরনো। তবে এদিকটা সারাই করে দেউড়িতে কাঠের বিরাট দরজা বসানো হয়েছে। শাঙ্কো বুঝল এখান দিয়ে দুর্গে ঢোকা যাবে না। শাঙ্কো চলল দুর্গার পেছন দিকে।
