ভাইকিংদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হলো। দলপতি হ্যারির দিকে তাকিয়ে গলা চড়িয়ে বলল, এক্ষুণি সবাইকে নামতে বলো। নইলে সব ক’জনকে আমরা মেরে ফেলবো।
হ্যারি কথাটা বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল। ভাইকিংদের গুঞ্জন থামল। হ্যারি বলল, ফ্রান্সিস অনেক ভেবে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়। ফ্রান্সিসের কথার অবাধ্য হয়ো না। এতক্ষণে ভাইকিংরা আস্তে আস্তে পাটাতন দিয়ে জাহাজঘাটায় নামতে লাগল। ওরা বুঝল রাজকুমারী অসুস্থ। তার চিকিৎসার দরকার সবার আগে।
ওদিকে ফ্রান্সিস কেবিনঘরে ঢুকে দেখল—বৈদ্য ভেন মাথা নিচু করে মারিয়ার মাথার কাছে বসে আছে। ফ্রান্সিস বৈদ্যকে ডাকল। তারপর আস্তে আস্তে সব কথা বলল।
বৈদ্য ভেন মারিয়ার কপালে হাত দিল। গলায় হাত দিল। বলল, জ্বর বেশি নেই। কিন্তু বিপদ এখনও কাটেনি। এ অবস্থায় রাজকুমারীকে নিয়ে যাওয়া খুব ঝুঁকি।
ফ্রান্সিস বলল, উপায় নেই। এই ঝুঁকি নিতেই হবে। মাথা নিচু করে মারিয়ার মুখের কাছে। মুখ এনে ফ্রান্সিস ডাকল, মারিয়া। মারিয়া কোনো সাড়া দিল না। ফ্রান্সিস আবার ডাকল, মারিয়া।
মারিয়া আস্তে আস্তে চোখ খুলল। একটু হাসার চেষ্টা করল। কোনো কথা বলতে পারল না। ফ্রান্সিস বলল, মারিয়া তোমাকে সব পরে বলবো। এখন আমাদের সবাইকে তীরে নামতে হবে। তোমাকে আমি পাঁজাকোলা করে নিয়ে যাবো। যাতে তোমার কোনো কষ্ট না হয় তার জন্যে আমি আপ্রাণ চেষ্টা করবো। শুধু তুমি একটু কষ্ট হলে সহ্য কোরো। পারবে তো? মারিয়া খুব আস্তে আস্তে মাথা কাত করলো। ফ্রান্সিস অনেকটা নিশ্চিন্ত হলো।
মারিয়ার কাঁধের পেছনে হাত দিয়ে মাথাটা তুলল। হাঁটুর নীচে হাত দিয়ে আস্তে আস্তে মারিয়াকে বিছানা থেকে তুলল। তারপর বেশ আস্তে আস্তে দরজার দিকে চলল। পেছন না ফিরে বলল, ভেন তোমার দরকারি ওষুধগুলো আনতে ভুলো না।
মারিয়াকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে ডেক-এ ওঠার সময় বেশ অসুবিধে হলো ফ্রান্সিসের। অনেক আস্তে অনেক সাবধানতা সত্ত্বেও আঁকুনি লাগল। মারিয়ার মুখে কষ্টের শব্দ হলো—উঃ উঃ। মারিয়া কপাল কোঁচকাল। চোখ বন্ধই রইল। ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে পড়ল। আবার সাবধানে উঠতে লাগল।
কাঠের পাটাতনের সামনে এসে দেখল—বন্ধুরা আস্তে আস্তে সোজা রাস্তাটা দিয়ে চলেছে। সামনে পেছনে খোলা তলোয়ার হাতে সৈন্যরা পাহারা দিয়ে চলেছে। এসময় মারিয়ার হঠাৎ কাশি উঠল। ফ্রান্সিস বেশ ঘাবড়ে গেল। কাশি হলেই মারিয়ার কষ্ট হয় সবচেয়ে বেশি। কাশতে কাশতে মারিয়ার শরীরটা যেন বেঁকে যেতে লাগল। ফ্রান্সিস বহুকষ্টে মারিয়াকে ধরে থাকল। মুখ ঘুরিয়ে বৈদ্যকে ডাকল, ভেন—শিগগির এসো৷ বৈদ্য ভেন ছুটে এলো। মারিয়ার পিঠে দুহাতের তালু চেপে ধরল। কাশি কমল। ফ্রান্সিস তবু নড়ল না। কাশি থেমে গেল। মারিয়া মুখ হাঁ করে হাঁপাতে লাগল। ওর চোখমুখ কুঁচকে গেল। মারিয়ার রোগার্ত মুখের দিকে তাকিয়ে, মারিয়ার কষ্ট দেখে ফ্রান্সিসের মনটা হাহাকার করে উঠল। এত কষ্টের জীবন মারিয়ার সহ্য হবে না—এটা ওর আগে ভাবা উচিত ছিল। কিন্তু এখন ওসব ভাবলে মন দুর্বল হয়ে যাবে।
ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে পাটাতন দিয়ে নামতে লাগল। ওর চোখেমুখে তখন সংকল্পের দৃঢ়তা। আলোর মিনার ছাড়িয়ে দলপতির পেছনে পেছনে সৈন্যদের পাহারায় ফ্রান্সিসরা পাথর বাঁধানো রাস্তা দিয়ে চলল। দুপাশে ছাড়া ছাড়া পাথরের বাড়িঘর নিস্তব্ধ। এত রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। রাস্তার এখানে-ওখানে মশাল জ্বলছে।
বেশ কিছুক্ষণ পরে সবাই একটা দুর্গের সামনে এলো। দুর্গের সদর দেউড়িতে অনেক মশাল জ্বলছে। পাহারাদার সৈন্যরা দলপতিকে দেখে মাথা একটু নোয়ালো। পাহারাদারের সঙ্গে কী কথা হলো। ঘড় ঘড় শব্দে বিরাট কাঠের দরজা খোলা হলো। সবাই দুর্গের মধ্যে ঢুকল। একটা পাথর বাঁধানো ছোটো চত্বরের পরে একটা দরজার সামনে এসে সবাই দাঁড়াল। লোহার গরাদের দরজার মাথায় মশাল জ্বলছে। দুজন পাহারাদার সৈন্য পাহারা দিচ্ছিল। দলপতির নির্দেশে একজন এগিয়ে গিয়ে দরজার তালা খুলল। ঠং ঠাং শব্দে দরজা খোলা হলো। দলপতি হ্যারিকে বলল, সবাইকে ভেতরে ঢুকতে বলো।
হ্যারি বলল, কিন্তু আমাদের রাজকুমারী ভীষণ অসুস্থ। তাকে অন্তত রেহাই দিন।
দলপতি মাথা নেড়ে বলল, সেসব কাল সকালে সিনার্কাকে বলবেন।
হারি ফ্রান্সিসকে বলল সেকথা। ফ্রান্সিস বলল, আর কোনো অনুরোধ করো না। দেখা যাক কী হয়।
ঘরটা বেশ বড়ো। পাথুরে দেয়ালের আংটায় মশাল জ্বলছে। মশালের আলোয় ফ্রান্সিস দেখল ঘর জুড়ে দড়িবাঁধা শুকনো ঘাসের বিছানামতো। তার ওপর মোটা কাপড় পাতা। প্রায় দশ-বারো জন লোক শুয়ে আছে তাতে। ফ্রান্সিস বুঝল—ওরা বন্দি। এটা কয়েদঘর। ও মারিয়াকে নিয়ে ডানদিকের দেয়ালের কাছে এসে বিছানায় আস্তে আস্তে শুইয়ে দিল। মারিয়ার মুখ থেকে গোঙানির শব্দ বেরিয়ে এলো। ফ্রান্সিস মারিয়ার কপালে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। বৈদ্য ভেন মারিয়ার একপাশে বসল। হাতের পুঁটুলি রাখল পাশে। হ্যারি এসে বসল ফ্রান্সিসের কাছে। আস্তে আস্তে বলল, ফ্রান্সিস শাঙ্কো জলে নেমে পালিয়েছে।
ফ্রান্সিস বলল, শাঙ্কো কি জানে আমাদের এখানে বন্দি করা হয়েছে?
আমি জাহাজ থেকে নামার সময় গলা চড়িয়ে দুবার বলেছি—শাঙ্কো আমাদের অনুসরণ করো। হ্যারি বলল।
