হ্যারি বলল, এটা কি কোনো দ্বীপ না দেশ?
এটা কর্সিকা দ্বীপ। এই বন্দরের নাম বোনিফেসিও—কর্সিকার দক্ষিণ প্রান্তের শেষ বন্দর। এখানকার সামন্ত রাজা সিনার্কা। দলনেতা বলল।
হ্যারি সব কথা ফ্রান্সিসকে বুঝিয়ে বলল। তারপর দলপতিকে বলল, তল্লাশি শেষ হলেই বুঝবেন আমরা জলদস্যু বা লুটেরার দল নই। আমাদের দেশের রাজকুমারী এই জাহাজে সাংঘাতিক অসুখে মৃতপ্রায়। আমাদের বিনীত অনুরোধ—আমরা নির্দোষ প্রমাণিত হলেই যত শিগগির সম্ভব রাজকুমারীর সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেবেন।
সেসব মাননীয় সিনার্কাকে বলবেন কাল সকালে। দলনেতা বলল।
হ্যারি বলল, না কাল সকালে নয়। আজ রাতেই চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
দলপতি বেশ কড়া চোখে হ্যরির দিকে তাকাল। বলল, একটু পরেই সবাইকে কয়েদঘরে ঢুকতে হবে। তার জন্যে তৈরি হোন।
হ্যরি চিৎকার করে বলে উঠল, আমাদের নরকে নিয়ে যান—কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু রাজকুমারীর সুচিকিৎসার ব্যবস্থা আজ রাতেই করতে হবে। হ্যারিকে ক্রুদ্ধস্বরে এভাবে চিৎকার করে কথা বলতে ভাইকিং বন্ধুরা কখনও দেখেনি। ওরা বেশ আশ্চর্য হলো। হ্যারি ও দলপতির কথা ওরা না বুঝলেও হ্যারিকে সমর্থন জানাতে ওরা একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল—ও-হো-হো-হো।
ভাইকিংদের এভাবে উত্তেজিত হতে দেখে দলপতি বেশ ঘাবড়ে গেল। তবু গম্ভীরভাব বজায় রেখে বলল, মাননীয় সিনার্কা উত্তরে সারিনে গিয়েছেন বিদ্রোহীদের শায়েস্তা করতে। উনি কাল সকালে ফিরবেন। তখন উনিই যা করবার করবেন।
হ্যারি ফ্রান্সিসকে সব কথা বুঝিয়ে বলল। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বলল, হ্যারি, এখন উত্তেজিত হয়ো না। মাথা ঠাণ্ডা রেখে সব কাজ করতে হবে।
—কিন্তু ফ্রান্সিস, বৈদ্য বলেছে আজ রাতের মধ্যেই সুচিকিৎসা চাইই চাই। হ্যারি বলল। জানি জানি। দেখা যাক দলপতি কী করে। ফ্রান্সিস বলল।
সবাই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। সমুদ্রের মৃদু গর্জন আর শোঁ শোঁ হাওয়ার শব্দ। যারা তল্লাশি চালাচ্ছিল তারা দলপতির কাছে এলো। ওরা বলল, জাহাজে সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায়নি। শুধু একজন অসুস্থ মহিলার ঘরে কিছু গয়নাগাঁটি পাওয়া গেছে।
তেমন মূল্যবান কিছু জাহাজে লুকানো নেই।
দলপতি একবার মাথা ঝাঁকাল। তারপর গলা চড়িয়ে বলল—এই জাহাজটা দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে বন্দরে চলো। তারপর যা করার করবো।
দলপতি নিজেদের যুদ্ধজাহাজে চলে গেল। তার সৈন্যরা কয়েকজন মিলে ফ্রান্সিসদের জাহাজটা ওদের যুদ্ধজাহাজের পেছনের হালের সঙ্গে শক্ত কাছি দিয়ে বাঁধল। তারপর টেনে নিয়ে চলল ফ্রান্সিসদের জাহাজটা।
শাঙ্কো, ফ্রান্সিস আর বৈদ্য ভেন-এর কথাবার্তা থেকে বুঝতে পেরেছিল আজ রাতের মধ্যেই মারিয়ার চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে না পারলে মারিয়ার বাঁচার আশা কম। তাই শাঙ্কো জাহাজ থেকে পালাবার উপায় ভাবতে লাগল। তখনই সৈন্যরা জাহাজের তল্লাশি সেরে দলপতিকে সব জানাচ্ছিল। শাঙ্কো দেখল—এই সুযোগ। সৈন্যরা সব দলপতিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। এদিকে নজর নেই। ও আস্তে আস্তে নিজেদের দল থেকে সরে এলো। গলা নামিয়ে হ্যারিকে বলল, হ্যারি আমি পালাচ্ছি। তারপর ডেক-এর ওপর নিঃশব্দে শুয়ে পড়ল। দ্রুত গড়িয়ে গিয়ে মাস্তুলের পেছনে চলে গেল তারপরই সিঁড়িঘর। সিঁড়িঘরের আড়ালে গড়িয়ে চলে এলো পেছনে হালের কাছে। ঝোলানো দড়ি ধরে ঝুলে পড়ল। তারপর হালের খাঁজে খাঁজে পা রেখে রেখে নেমে এলো জলের ওপর। আস্তে জলে ডুবিয়ে দিল নিজেকে। দম বন্ধ করে ডুব সাঁতার দিয়ে বেশ দূরে গিয়ে আস্তে আস্তে জলের ওপর মাথা ভাসাল। দেখল, সেই সৈন্যরা কয়েকজন ওদের জাহাজের হালের সঙ্গে কাছি বাঁধছে। শাঙ্কো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল—যাক সময়মতোই পালানো গেছে। আর একটু দেরি হলে ও ধরা পড়ে যেত। শাঙ্কো জলে শব্দ না তুলে আস্তে আস্তে ওদের জাহাজের পেছনে পেছনে সাঁতরে চলল।
বোনিফেসিও বন্দরের ঘাটে এসে ফ্রান্সিসদের জাহাজ লাগল। দলপতির নির্দেশে সৈন্যরা কাঠের পাটাতন ফেলল। ফ্রান্সিসরা তখনও বুঝতে পারছে না দলপতি ওদের নিয়ে কী করবে।
এবার দলপতি ফ্রান্সিসদের জাহাজে উঠে এলো। পাটাতনের সামনে দাঁড়িয়ে হ্যারির দিকে তাকিয়ে বলল, সবাইকে নামতে হবে। তুমি সবাইকে নেমে আসতে বলো।
হ্যারি বলল, আপনাকে আগেই বলেছি আমাদের রাজকুমারী অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাকে অন্তত এই জাহাজে থাকতে দিন। পাহারা দিয়েই রাখুন।
দলপতি মাথা ঝাঁকিয়ে গলা চড়িয়ে বলে উঠল, না না—সবাইকে দুর্গে যেতে হবে। ওসব অসুখ-বিসুখ বুঝি না। হ্যারি, ফ্রান্সিসকে সব কথা বলল।
ফ্রান্সিস বলল, হ্যারি, এখন ওর কথা শুনে চলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। ও যা বলছে। তাই করতে হবে।
কিন্তু সাংঘাতিক অসুস্থ রাজকুমারীকে—
ফ্রান্সিস ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল, আমিই মারিয়াকে নিয়ে যাবো। দলপতির আদেশ মেনে চললে হয়তো মারিয়ার চিকিৎসার ব্যবস্থা ঐ দলপতিই করে দেবে। দলপতি চিৎকার করে বলল, কী হলো? নামো সবাই।
ফ্রান্সিস হ্যারিকে বলল, সবাইকে নামতে বলো। আমি মারিয়াকে নিয়ে আসছি। ফ্রান্সিস নিজের কেবিনঘরের দিকে চলল।
হ্যারি এবার ভাইকিং বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল, সবাই জাহাজ থেকে নেমে এসো। আমি জানি—এভাবে আমরা কখনো বিনা লড়াইয়ে বিনা প্রতিবাদে হার স্বীকার করি না। কিন্তু আজকের অবস্থা অন্যরকম। ফ্রান্সিস বলেছে দলপতি যা বলে তাই মেনে নিতে।
