ফ্রান্সিসের ভাইকিং বন্ধুদের কারো মন ভালো নেই। ওরা শুকনো মুখে ডেক-এর এখানে-ওখানে কেবিনঘরে শুয়ে বসে সময় কাটাতে লাগল। কিছুতো করার নেই শুধু মারিয়ার সুস্থ হয়ে ওঠার জন্যে অপেক্ষা করা ছাড়া। শুধু শাঙ্কো রেলিঙের ধারে সারারাত দাঁড়িয়ে রইল। চারদিকে নজর রাখতে লাগল—কোনোদিকে ডাঙা দেখা যায় কিনা। কিন্তু কোথায় ডাঙা? চারদিকে শুধু জল আর জল।
সন্ধের পর চাঁদ উঠল। পূর্ণিমার কাছাকাছি সময়। তাই জ্যোৎস্না বেশ উজ্জ্বল। এতে চারদিকে নজর রাখার সুবিধে হলো।
জাহাজ চলেছে। জাহাজ-চালক ফ্লাইজার হুইলে হাত রেখে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু। চোরা স্রোতের টানের জোর কমেছে। কিন্তু ফ্লাইজার ভেবে পাচ্ছে না কোনদিকে জাহাজের মুখ ঘোরাবে। জাহাজ কোথায় এলো তাও বুঝতে পারছে না। অগত্যা জাহাজ যেদিকে যায় যাক। ম্লান মুখে অসহায়ভাবে ও দাঁড়িয়ে রইল।
একটু রাতে হঠাৎ পেড্রোর চোখে পড়ল ডানদিকে দূরে সাদাটে কুয়াশার পাতলা আস্তরণের মধ্যে দিয়ে আগুনের ক্ষীণ আভা। পেড্রো মাস্তুলের মাথা থেকে সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে বলে উঠল—ডাঙা—ডাঙার কাছে এসেছি আমরা। অনেক ভাইকিং বন্ধু। ছুটে এলো রেলিঙের ধারে। বিস্কো ছুটল ফ্রান্সিস আর হ্যারিকে খবর দিতে। জাহাজ চালক ফ্রান্সিসের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল।
একটু পরেই ফ্রান্সিস আর হ্যারি ছুটে এলো রেলিঙের ধারে। ওরা আলো দেখল। কিন্তু ঠিক বুঝতে পারল না ওটা সমুদ্রের বুকের আলোকস্তম্ভ কিনা। একটু পরেই বুঝল—ওটা ডাঙায় আছে। ওটা নিশ্চয়ই কোনো দ্বীপ বা দেশ।
ফ্রান্সিস ফ্লাইজারের কাছে এলো। বলল, যত দ্রুত সম্ভব ঐ আলো লক্ষ্য করে জাহাজ চালাও। ভাইকিং বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল, একদল দাঁড়ঘরে নেমে যাও। দাঁড় টানো। আর একদল পালের দড়িদড়া খুলে বেঁধে পাল ঠিক রাখো। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঐ আলোর কাছে আমাদের পৌঁছতে হবে। ভাইকিং বন্ধুরা সমস্বরে হাঁক দিল—ও-হো-হো-হো। তারপর ছুটল নিজেদের কাজের জায়গায়। জাহাজের গতি বাড়ল। জাহাজ ছুটল ঐ আলো লক্ষ্য করে।
ফ্রান্সিস কেবিন ঘরের দিকে যাচ্ছে তখন হ্যারি বলল, ফ্রান্সিস, একটু খোঁজখবর না নিয়ে এই বন্দরে জাহাজ ভেড়ানো কি উচিত হবে। ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলল, হ্যারি উপায় নেই। মারিয়ার শরীরের যা অবস্থা তাতে যত দ্রুত সম্ভব ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা না করতে পারলে মারিয়াকে—আর বলতে পারল না ফ্রান্সিস ওর গলা বুজে এলো।
জাহাজঘাটের কাছাকাছি আসতে চাঁদের আলোয় দেখা গেল একটা বন্দর এলাকা। বেশ কয়েকটা জাহাজ নোঙর করে আছে। নানা দেশের পতাকা উড়ছে জাহাজগুলোর মাথায়। যে আলো ফ্রান্সিসরা দূর থেকে দেখেছিল সেই আলো জ্বলছে একটা বেশ উঁচু মিনারের মাথায়। যেন অনেকগুলো মশাল একসঙ্গে জ্বলছে। বোঝাই যাচ্ছে সমুদ্রে নজরদারির জন্যেই এরকম পাথর গেঁথে মিনার তৈরি করা হয়েছে।
ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে ছিল জাহাজের রেলিঙ ধরে। তাকিয়ে ছিল জাহাজঘাটার দিকে। তখন দেখল একটা জাহাজ দ্রুত ফ্রান্সিসদের জাহাজের দিকে আসছে। ফ্রান্সিস জাহাজটা দেখেই বুঝল ওটা যুদ্ধজাহাজ।
ফ্রান্সিস দু’হাত তুলে চিৎকার করে বলে উঠল, ভাইসব, আমরা লড়াই করবো না। কেউ তলোয়ার হাতে নেবে না। আস্তে আস্তে সব ভাইকিংরা ডেক-এ এসে দাঁড়াল। কারো মুখে কথা নেই। শুধু বিস্কো আর বৈদ্যবন্ধু ভেন রইল মারিয়ার কাছে। মারিয়া তখনও চোখ বুজে শুয়ে আছে। জ্বর কমলেও মারিয়ার শরীরের কোনো সাড়া নেই। যখন কাশি উঠছে তখন মারিয়ার কষ্ট হচ্ছে বেশি। কাশতে কাশতে দম বন্ধ হয়ে আসে যেন। বিছানায় এপাশে-ওপাশে ছটফট করে। কাশি কমলে মুখ হাঁ করে হাঁপাতে থাকে।
যুদ্ধ জাহাজটা ফ্রান্সিসদের জাহাজের গায়ে এসে লাগল। ফ্রান্সিসদের জাহাজটা জোর ধাক্কা খেয়ে দুলে উঠল। যুদ্ধজাহাজ থেকে জনা দশেক সৈন্য তলোয়ার হাতে লাফ দিয়ে ফ্রান্সিসদের জাহাজের ডেকে উঠে এলো। সর্বপ্রথমে যে উঠে এলো সে ফ্রান্সিসদের দিকে এগিয়ে এলো। বোঝা গেল সেই দলনেতা। বেশ শক্তসমর্থ চেহারা। মুখে দাড়ি-গোঁফ। লম্বা টান টান শরীর। সৈন্যদের গায়ে হাঁটুঝুল মোটা কাপড়ের পোশাক। মাথায় শিরস্ত্রাণ, গায়ে বর্ম নেই। কোমরে চামড়ার ফেট্টি। তাতে তলোয়ারের খাপ গোঁজা।
দলনেতা ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে গলা চড়িয়ে লো ল্যাতিন ভাষায় বলল, তোমরা তো এই অঞ্চলের লোক নও। তোমরা এখানে এসেছে কেন?
হ্যারি এগিয়ে এলো। ভাঙা ভাঙা লো ল্যাতিন ভাষায় বুঝিয়ে বলল, আপনার অনুমান ঠিক। আমরা বিদেশি, জাতিতে ভাইকিং আমরা। আমাদের মধ্যে একজন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তার চিকিৎসার জন্যে আমরা এখানে আসতে বাধ্য হয়েছি। আমরা শান্তি চাই—যুদ্ধ চাই না।
দলনেতা একটু ভাবল। তারপর বলল, শুধু তোমার মুখের কথায় বিশ্বাস নেই। আমরা জাহাজ তল্লাশি করবো। তোমরা দস্যু লুটেরার দল হতে পারো।
হ্যারি ফ্রান্সিসকে মৃদুস্বরে সব কথা বুঝিয়ে বলল। ফ্রান্সিস বলল, ওরা যা করতে চায় করুক। বাধা দিও না।
হ্যারি বলল, আপনি জাহাজ তল্লাশি করুন—আমাদের কোনো আপত্তি নেই। তবে জেনে রাখুন আমরা জলদস্যু নই। আমরা ভাইকিং—বীরের জাতি।
দলনেতা এসব কথায় বিশেষ কান দিল না। সঙ্গের সৈন্যদের ইঙ্গিত করল জাহাজ তল্লাশির জন্যে। চারজন সৈন্য সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে গেল। দুজন সৈন্য ডেক-এ ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল।
