এবার হ্যারি বলল সত্যিই আপনাকে প্রশংসা করতেই হয়।
দোনিয়া ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বলল—ফ্রান্সিসের চেয়ে বেশি প্রশংসা পাবার যোগ্য আমি নই। কথাটা বলে দোনিয়া ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরল। আবেগে ওর শরীর কাঁপতে লাগল। দু’চোখ জলে ভিজে উঠল। ফ্রান্সিস একটু হেসে নিজেকে আস্তে আস্তে ছাড়িয়ে নিল।
নৌকোয় গিয়ে উঠল সবাই। বিস্কো দাঁড় বাইতে লাগল। নৌকো চলল ওদের জাহাজের দিকে। জাহাজে উঠইে সব ভাইকিং বন্ধুরা ছুটে এলো। ফ্রান্সিসদের ঘিরে হৈহৈ করতে লাগল। ওর মধ্যে বিস্কো গলা চাড়িয়ে বলল ভাইসব ফ্রান্সিসের নেতৃত্বে আমরা জলের তলা থেকে নিখোঁজ সব যোদ্ধামূর্তিগুলো উদ্ধার করেছি। সব বন্ধুরা একসঙ্গে ধ্বনি তুলল—ও হো-হো-হো।
খুব ভোরে ফ্রান্সিসের হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। শুকনো সুন্দর সুরধ্বনি। দূর থেকে আসছে সেই সুরধ্বনি। মারিয়ারও ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। মারিয়াও কান পেতে শুনছিল ঐ সুরলহরী। ফ্রান্সিস দ্রুত বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। বলল—মারিয়া চলো নুরাঘির ঐ গির্জাটায়। দোনিয়াই ঐ বাজনা বাজাচ্ছে।
দু’জনে জাহাজে বাঁধা নৌকোটা খুলল। ফ্রান্সিস দাঁড় বইতে লাগল। তখনই পুর্ব আকাশে লাল রঙের ছোপ লাগল। একটু পরে সূর্য উঠল। ভোরের ঠাণ্ডা হাওয়া। খাঁড়ির জলে নুরাঘি দুটোয় ছড়িয়ে পড়া ভোরের নরম আলো সমুদ্রের পাখির ডাক—সমস্ত পরিবেশটা যেন মায়াময় হয়ে উঠল।
ওরা যখন নুরাঘির গির্জাটায় ঢুকল তখন দেখল গির্জাটায় কিছু জেলে চাষি জড়ো হয়েছে। দোনিয়া রূপোর হাতাটা মূর্তিগুলোর গায়ে ঠুকে ঠুকে সুরমূৰ্ছনা তুলছে। ফ্রান্সিস, মারিয়া চুপ করে দাঁড়িয়ে সেই সুরমূর্ঘনা শুনতে লাগল।
একসময় বাজনা থামিয়ে দোনিয়া পিছু ফিরে তাকাল। দেখল,ফ্রান্সিস আরমারিয়াকে। ছুটে এসে ফ্রান্সিসের নহাজ্জা দুহাতে জড়িয়ে ধরল। মারিয়া বলল—আপনি একদিনেই বেশ সুন্দর বাজাচ্ছেন।
দোনিয়া হেসে বলল—ছেলেবেলায় আমার এক কাকা আমাকে গ্রীসীয় বীণা বাজাতে শিখিয়েছিলেন। আমিও শিখেছিলাম। সেই সুরজ্ঞানটাই আজ কাজে লেগে গেল।
মারিয়া হেসে বলল, কিছু মনে না করলে একটা কথা বলি
—নিশ্চয়ই—বলুন। দোনিয়া বলল।
—তৃতীয় সুরধ্বনিটা কিন্তু একটু বেসুরো লাগছে, মারিয়া হেসে বলল।
দোনিয়া সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঝুঁকিয়ে মারিয়াকে সম্মান জানিয়ে বলল—রাজকুমারী—আপনার সুরজ্ঞানের প্রশংসা করছি। তৃতীয় মূর্তিটা হচ্ছে সেই ঢাল-ভাঙা মূর্তিটা। তাই বেসুরো ধনি তুলছে। স্বর্ণকারকে দিয়ে ঢালটা লাগিয়ে নিলেই শুদ্ধসুর বেরোবে।
—রাজা এনজিও কি আপনাকে অর্থমূল্য দেবেন? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
—এখনো আমি চাই নি। ভেবেছি, আর চাইব না। এখানেই আমি বাদ্যকর হয়ে সারাজীবন থাকবো। প্রতিভভারে এই বাজনা বাজাবো। সেই অন্ধ বাদ্যকরের স্বরলিপি থেকে সুর উদ্ধার করবো। দু’শো বছর আগে যেমন দূর-দূর দেশ থেকে মানুষ ছুটে আসতো এই বাজনা শোনার জন্যে, আমিও এমন বাজানো শিখবো যে তেমনি মানুষজন ছুটে আসবে আমার বাজনা শুনতে। বদলে কিছু অর্থদান চাইবো। সেই অর্থ আমি ব্যয় করবো সার্দিনিয়ার দরিদ্র চাষি-জেলেদের কল্যাণে।
ফ্রান্সিস একটু চুপ করে থেকে বলল—দোনিয়া, আপনার মতো মানুষের সঙ্গে পরিচয় হলেই বোঝা যায় পৃথিবী কত সুন্দর, মানুষ কত ভালো আর জীবন কত আনন্দের।
ফ্রান্সিস, মারিয়া ঘাটে এসে নৌকোয় উঠল। নৌকো চালাতে চালাতে চারদিকে উজ্জ্বল রোদে হেসে-ওঠা প্রকৃতিকে দেখতে দেখতে ফ্রান্সিস হেসে ডাকল—মারিয়া মারিয়া ওর দিকে তাকাল।
—আমার হাত এবারও শূন্য। মূল্যবান কিছুই নেই। ফ্রান্সিস বলল।
মারিয়া আবেগআপ্লুতস্বরে বলে উঠল “আজ আমার যে কী আনন্দ হচ্ছে তা আমি বলে বোঝাতে পারবো না।
মারিয়ার কথা শুনে ফ্রান্সিস খুব খুশি হয়ে হাসল।
কোনোকথা না বলে ওদের জাহাজের দিকে নৌকো চালাতেলাগল। এই আনন্দের অনুভূতি ফ্রান্সিস ওর সমস্ত দেহমন দিয়ে অনুভব করতে লাগল। নৌকো চলল ওদের জাহাজের দিকে।
রাণীর রত্ন ভাণ্ডার
ফ্রান্সিসদের জাহাজ চলেছে ওদের দেশের দিকে। ভূমধ্যসাগরের জল শান্ত। ঢেউয়ের মাতামাতি নেই। ফ্রান্সিসের ভাইকিং বন্ধুরা খুব খুশি। কতদিন পরে দেশের দিকে চলেছে ওরা। মারিয়া অবশ্য মুখ ফুটে কিছু বলেনি। তবে ফ্রান্সিস বেশ বুঝতে পারছিল মারিয়াও দেশে ফেরার আনন্দে অধীর। মারিয়ার দোষ নেই। ফ্রান্সিসদের মতো দেশে দেশে বিদেশ-বিভূইয়ের বন্দরে বন্দরে ঘুরে বেড়াবার অভ্যস তো মারিয়ার নেই। কাজেই ওর আনন্দ হবে এ তো স্বাভাবিক।
জোর বাতাসে জাহাজের পাল ফুলে উঠেছে। বেশ দ্রুতগতিতে জাহাজ চলেছে। ভাইকিংদের দাঁড় টানতে হচ্ছে না। ডেক-এর এখানে-ওখানে কেউ কেউ শুয়ে বসে আছে। কোথাও কয়েকজন জড়ো হয়ে বসে ছক্কা-পাঞ্জা খেলছে। বেশ অবসরের মেজাজ সকলের।
সেদিন দুপুর থেকে কিন্তু হাওয়া পড়ে গেল। হাওয়ায় আর সেই জোর নেই। পালগুলো নেতিয়ে পড়ল। বিকেল নাগাদ জাহাজের গতি আরও কমে গেল। সমুদ্রের চারদিকে একটা গভীর স্তব্ধতা। যেন একফোঁটা হাওয়া নেই। সমুদ্রের সোঁ সোঁ ডাকও কেমন নিস্তেজ। ভাইকিংরা ঝড়ের আশঙ্কা করল। জাহাজ-চালক ফ্লাইজারের কাছে এলো বিস্কো। সঙ্গে দু’জন ভাইকিং বন্ধু। বিস্কো জাহাজ-চালককে বলল, কী ব্যাপার বলো তো? হাওয়া বন্ধ। চারদিক থমথমে।
