জাহাজ-চালকের কপালে তখন চিন্তার ভাঁজ। ও শুধু বলল, ফ্রান্সিসকে ডাকো একবার।
বিস্কো বলল, তা ডাকছি। কিন্তু তোমার কি আশঙ্কা প্রচণ্ড ঝড় আসবে?
জাহাজ-চালক ফ্লাইজার শুধু বলল, ফ্রান্সিসকে খবর দাও।
বিস্কো আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। বিপদ আশঙ্কা করে ছুটল ফ্রান্সিসকে খবর দিতে। একটু পরেই ফ্রান্সিস হ্যারিকে নিয়ে জাহাজের ডেক-এ উঠে এলো।
ফ্লাইজারের কাছে এসে বলল, কী হয়েছে? ঝড় আসবে?
জাহাজ-চালক একবার ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকাল। তারপর আস্তে আস্তে বলল, ফ্রান্সিস, সমুদ্রে চোরা স্রোত থাকে। আমরা সেই চোরা স্রোতে পড়েছি। আমার দিকজ্ঞান লোপ পেয়েছে। চোরা স্রোতের টান কাটাতে পারছি না। জাহাজ কোথায় চলেছে আমি জানি না।
সর্বনাশ। বলো কি? ফ্রান্সিস চিন্তিত স্বরে বলল।
হ্যারি জাহাজ-চালককে বলল, যদি সব দাঁড় টানা যায়?
জাহাজ-চালক ফ্লাইজার মাথা এপাশ-ওপাশ করল। বলল, তাহলেও এই চোরা স্রোতের প্রচণ্ড টান থেকে জাহাজকে মুক্ত করা যাবে না। জাহাজ ডুবে যাবার ভয় নেই। কিন্তু জাহাজের গতিমুখ নিয়ন্ত্রণ করা এখন অসম্ভব।
তবে তো আমাদের এখন কিছু করার নেই। হ্যারি বলল।
হ্যাঁ, যতক্ষণ না এই চোরা টান নিস্তে হবে ততক্ষণ জাহাজ যেদিকে যাবে যাক। ফ্লাইজার বলল।
এই চোরা টান কতক্ষণ চলবে? ফ্রান্সিস বলল।
জাহাজ-চালক মাথা নাড়ল। বলল, জানি না। সমুদ্রের অনেক জায়গায় এরকম চোরা টান থাকে। জাহাজকে যেন টেনে নিয়ে যায়।
ফ্রান্সিস মাথা নিচু করে ভাবতে লাগল—জাহাজ ডুবে যাবে না। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে জাহাজ কোথায় কোনদিকে যাবে কে জানে। ফ্রান্সিস মুখ তুলে বলল, হ্যারি জানো, সার্দিনিয়ার ধারে কাছে কোনো দ্বীপ আছে বা মূল ভূখণ্ড কতদূর?
হ্যারি বলল, রাজকুমারী মারিয়ার ভূগোল জ্ঞান আমার চেয়ে অনেক বেশি। রাজকুমারী হয়তো বলতে পারবেন।
হুঁ, চলো, মারিয়াকে জিজ্ঞেস করি। কথাটা বলে ফ্রান্সিস নীচে নামার সিঁড়ির দিকে চলল।
দু’জনে ফ্রান্সিস ও মারিয়ার কেবিন ঘরে এলো। ফ্রান্সিস দেখল মারিয়া চুপ করে শুয়ে আছে। এসসম মারিয়া কখনো শুয়ে থাকে না। ডেক-এ গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সমুদ্রের আকাশ দেখে। সূর্যাস্তের রঙিন খেলা দেখে, সূর্য অস্ত গেলে, কেবিনে ফিরে আসে। আজকে মারিয়া শুয়ে আছে। ফ্রান্সিস বলল, শুয়ে আছো কেন?
মারিয়া আস্তে আস্তে উঠে বসল। হেসে বলল, এক্ষুণি ডেক-এ যাবো ভেবেছিলাম। যাক গে, বিস্কো তোমাকে ডেকে নিয়ে গেল। কী হয়েছে?
ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে জাহাজ-চালকের কথা, সমস্যার কথা বলল। তারপর জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা মারিয়া, সার্দিনিয়ার কাছাকাছি কোনো দ্বীপ বা মূল ভূখণ্ড আছে?
মারিয়া একটু ভেবে নিয়ে বলল, সার্দিনিয়ার উত্তরে আছে কর্সিকা দ্বীপ। কিন্তু সেটা কত দূরে তা আমি জানি না।
আর মূল ভূখণ্ড? হ্যারি জিজেস করল।
সেটা আরো উত্তরে—দূরে। মারিয়া বলল, এটুকুই বলতে পারি।
হুঁ। ফ্রান্সিস মুখে শব্দ করল। তারপর বলল, ডেক-এ চলো। মারিয়া হেসে বলল, এতক্ষণে সূর্য ডুবে গেছে বোধহয়। আজ থাক।
বেশ। ফ্রান্সিস বলল। তারপর হ্যারিকে সঙ্গে নিয়ে জাহাজ-চালকের কাছে চলল।
আসলে সকাল থেকেই মারিয়ার শরীর ভালো নেই। ঘুম থেকে ওঠা পর্যন্ত মুখে একটা তেতো বিস্বাদ ভাব। সকালের খাবার তো খেতেই পারেনি। ও খাবার ঘরেই খাচ্ছিল। বিস্কো পাশে বসে খাচ্ছিল। ফ্রান্সিসের আগেই খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। বিস্কো বলল, রাজকুমারী, আপনি যে কিছুই খেলেন না।
মারিয়া হেসে বলল, খিদে পায়নি তেমন। রাতে বেশি করে খাবো। মারিয়া বিস্কোকেও বুঝতে দিল না যে ওর শরীর খারাপ।
দুপুরের দিকে মারিয়া বুঝতে পারল জ্বর এসেছে। গা হাত-পায়ের ব্যথাটা বেড়ে চলেছে। মাথায় টনটনানি শুরু হলো। মুখ বুজে মারিয়া সব সহ্য করতে লাগল। ফ্রান্সিস যতক্ষশ ঘরে রইল ততক্ষণ মারিয়া ফ্রান্সিসের ছেঁড়া পোশাক সেলাই করছিল। ফ্রান্সিস কিছু বুঝতে পারেনি। দু’একটা কথাটথা যা বলেছে স্বাভাবিকভাবেই বলেছে। মাথার টনটনে ব্যথায় মারিয়া দুচ চোখেই দেখতে পারছিল না। উল্টে মাথা নিচু করে সেলাই করতে গিয়ে মাথার ব্যথা বেড়ে যাচ্ছিল। তবু মারিয়া নিজের শরীরের কষ্ট ফ্রান্সিসকে বুঝতে দেয়নি। বিস্কো যখন ফ্রান্সিসকে ডেকে নিয়ে গেল তখন আর পারল না। শুয়ে পড়ল। তখনও অল্প অল্প কাশি হচ্ছিল। বুকে একটা হাঁপধরা ভাব। মারিয়া বুঝল—বুকে কফ জমেছে। গত রাতে ডেক এ একটু রাত পর্যন্ত ছিল। ভালো হয়নি সেটা। ঠাণ্ডা লেগেছে।
সন্ধের পর থেকেই জ্বর বাড়তে লাগল। সেইসঙ্গে কাশিও বাড়ল। বুকের হাঁপ-ধরা ভাবটাও বেড়ে চলল। মারিয়া একটা মোটা গায়ের কাপড় জড়িয়ে শুয়ে রইল। সারা শরীরে ব্যথা আর শীত শীত ভাব। কঁপুনি। মারিয়া দাঁত চেপে সব সহ্য করতে লাগল।
বেশ রাতে ফ্রান্সিসকেবিনঘরে এলো। দেখল মারিয়া কাপড় জড়িয়ে শুয়ে আছে। মারিয়া ঘুমিয়ে আছে ভেবে ফ্রান্সিস আর ডাকল না। রাঁধুনি বন্ধু মারিয়াকে রাতের খাবার খেতে ডাকতে এসেছিল। মারিয়া বলে দিয়েছিল, খিদে নেই।
হঠাৎ বুকের হাঁপ-ধরা ভাবটা বাড়তেই মারিয়া কাশতে লাগল। ও উঠে বসল। কাশতে কাশতে যেন দম বন্ধ হয়ে গেল। ফ্রান্সিস দ্রুত দু’হাতে মারিয়াকে জড়িয়ে ধরল। জুরে গা পুড়ে যাচ্ছে যেন। ফ্রান্সিস ভীষণভাবে চমকে উঠল। মারিয়া কাশছে। তখনও। ফ্রান্সিস কিছু বলল না। কাশিটা কমল। মারিয়া হাঁপাতে লাগল। ফ্রান্সিস মারিয়াকে ধরে আস্তে আস্তে বিছানায় শুইয়ে দিল। দুশ্চিন্তায় ফ্রান্সিস তখনও গুছিয়ে কিছু ভাবতে পারছে না। শুধু একটু অভিমানের সুরে বলল, মারিয়া, তুমি এত অসুস্থ অথচ আমাকে একবার বললেও না।
