ফ্রান্সিস তখনই জল থেকে ভুস করে মুখ তুলল। উল্টোনো নৌকো আর সেনাপতি ও সৈন্য দু’জনকে জলে ভেসে থাকতে দেখে বুঝল কি হয়েছে। প্রবল উত্তেজনায় উৎসাহে ভারসাম্যের কথা ভাবতেও পারে নি সেনাপতি। তাই যা হবার তাই হয়েছে। নৌকো উল্টে গেছে। ফ্রান্সিস হাত ঘুরিয়ে হতাশার ভঙ্গী করল। ওদিকে দু’জন সৈন্য মিলে ঠেলে নৌকোটা সোজা করেছে। নিজেরা নৌকোয় উঠেভুড়িওয়ালা সেনাপতিকে কোনোরকমে টেনে নৌকোয় তুলল। সেনাপতি নৌকোর পাটাতনে শুয়ে চিৎ হয়ে হাঁপাতে লাগল। ওর মধ্যেই একবার কাত হয়ে দোনিয়াকে বলল জিজ্ঞেস করুন বড়মূর্তিটা পেয়েছে কিনা।
দোনিয়া ফ্রান্সিসকে জিজ্ঞেস করল, কথাটা। ফ্রান্সিস বলল—হ্যাঁ, মূর্তির শিংওয়ালা শিরস্ত্রাণে বঁড়শিটা ভালো করেই এঁটে লাগিয়ে এসেছি।
এবার সেনাপতি মশাইকে বলুন জলের নীচে থেকে ছিটকে পড়া দড়িটা নিয়ে আসতে। দোনিয়া সেনাপতিকে ডেকে বলল সেকথা। সেনাপতি কিছুক্ষণ গুম হয়ে থেকে তার সৈন্য দু’জনকে জলে ডুবে দড়ির মাথাটা ধরে নিয়ে আসতে বলল। ভীষণ ক্লান্ত সৈন্য দু’জন বোধহয় কিছুক্ষণ বিশ্রাম করতে চাইল। সেনাপতি তড়াক করে উঠে। বসল। কোমরে তালোয়ারের বাঁটে হাত রাখল। সৈন্য দু’জন আর কোনো কথা না বলে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস দোনিয়ার নৌকোয় উঠে এলো।
কিছু পরেই সৈন্য দুজন দড়িটার মাথাটা ধরে উঠে এলো। সেনাপতির নৌকোয় উঠল ওরা। ফ্রান্সিস দোনিয়াকে বলল—হারিদের নৌকোয় চলুন। দোনিয়াকে নিয়ে ফ্রান্সিস হ্যারি দের নৌকোয় উঠল। সেনাপতিকে ইঙ্গিতে তাদের নৌকোটা কাছে আনতে বলল। দু’টো নৌকো কাছাকাছি এলো। এবার ফ্রান্সিসের নির্দেশে মারিয়া, হ্যারি আর দোনিয়া নৌকোটার একপাশে বসল। ওপাশে নৌকো বেশ কাত হলো। অন্য পাশে দাঁড়াল বিস্কো। ফ্রান্সিস সেনাপতির নৌকোয় উঠল। সেনাপতি ও সৈন্য দু’জনকে ইঙ্গিতে নৌকোর একধারে বসাল। নৌকো ওদিক কাত হ’ল। আর একপাশে ফ্রান্সিস নিজে দাঁড়াল। সেনাপতির হাত থেকে দড়ির মুখটা নিল। এবার দু’নৌকোয় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ফ্রান্সিস আর বিস্কো দড়ি ধরে একসঙ্গে টানতে লাগল। নৌকো দু’টো আর একপাশে কাতহ’য়ে রইল না। দুলতে থাকলেও সোজা রইল নৌকোদুটো ভারসাম্য ঠক থাকার জন্যে।
একসময় বঁড়শিতে গাঁথা বড়মূর্তিটা উঠে এলো। মূর্ডিার গায়ে খুব কাদামাটি ময়লা লেগে নেই। তাই সোনার রঙটা মোটামুটি বোঝা যাচ্ছিল। সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল বঁড়শিতে গাঁথা মূর্টিার দিকে। উজ্জ্বল ঝকঝকে রোদ পড়েছে মূক্টিায়। সামান্য ঝিকিয়ে উঠছে মূর্টিার এখানে ওখানে। এই দেখে সেনাপতির আর সবুর সইল না। সে লাফিয়ে উঠতে গেল। নৌকো টাল গেল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে আঙুল দেখিয়ে সেনাপতিকে বসতে বলল। সেনাপতি বাধ্য ছেলের মতো বসে পড়ল। মূর্তিটা সেনাপতির নৌকোয় রেখে ফ্রান্সিস দড়িটা খুলে নিল। সৈন্যদুজন নৌকোয় দড়িটা নাচতে লাগল। সেনাপতি মূর্তিটার দিকে চেয়ে হাসতে লাগল—হা হা।
তিনটে নৌকো ফিরে চলল নুরাঘির ঘাটের দিকে। কালকের চেয়েও আজকে ভিড় আরো বেশি। দুরদুরান্ত থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে চাষিরাও এসেছে। জেলে পরিবারের লোকেরা তো আছেই। সৈন্যরাও ভিড় করে দাঁড়িয়েছে। নৌকোগুলো ঘাটে ভিড়ল। বড় মূর্তিটা সৈন্য দু’জন ধরে নিয়ে নৌকো থেকে নামল। এগিয়ে চলল রাজবাড়ির দিকে। ঠিক পেছনেই সেনাপতি। দু’হাত দুটো মূর্তি ঝুলিয়ে।
ফ্রান্সিসরা চলল নুরাঘির সদর দেউড়ির দিকে। দেউড়ির কাছাকাছি আসতেই একজন সৈন্য ছুটতে ছুটতে দোনিয়ার সামনে এলো। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–মহামান্য রাজা আপনাকে ডেকেছেন।
দোনিয়া ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। তারপর সৈন্যটির সঙ্গে রাজপ্রাসাদের দিকে গেল।
নিজেদের ঘরে ঢুকে ফ্রান্সিস বিস্কো নিজেদের ভেজা পোশাক ছেড়ে মারিয়া ওদের জন্যে যে পোশাক নিয়ে এসেছিল, সেই শুকনো পোশাক পরল। কিছু পরেই দুজন ওদের জন্যে খাবার নিয়ে এলো। ওরা খেতে বসল। কেউ কোনো কথা বলল না।
খাওয়া শেষ হলো এতক্ষণে হ্যারি বলল—ফ্রান্সিস, এখন তো আর এখানে থাকার প্রয়োজন নেই। চলো জাহাজে ফিরে যাই।
ফ্রান্সিস একটু আধশোয়া হয়ে ছিল। উঠে দাঁড়াল। দেয়াল লেখা সেই অস্পষ্ট স্বরলিপির দিকে তাকাল একবার। ততক্ষণে হ্যারি রাও উঠে দাঁড়িয়েছে। ফ্রান্সিস ঘরের দরজার দিকে এগোতে এগোতে বলল—চলো।
নুরাঘির বাইরে ঘাটের কাছে এলো ওরা। মারিয়া বলল—রাজা এনজিওর সঙ্গে একবার দেখা করবে না?
—কি দরকার। রাজার স্বার্থোদ্ধার হয়ে গেছে। এখন আমাদের হয়তো চিনতেই পারবেন না—ফ্রান্সিস বলল।
ওরা ওদের নৌকোয় উঠতে যাবে, দেখল দোনিয়া ছুটে আসছে। কাছে এসে দোনিয়া বলল—আপনারা চলে যাচ্ছেন?
হ্যারি হেসে বলল—হ্যাঁ, জাহাজে ফিরে যাচ্ছি।
—মূর্তিগুলো হাতে পেয়ে রাজা এনজিও, স্পিনোলা, অমাত্যরা খুব খুশি তাই না? মারিয়া হেসে বলল।
দোনিয়া হেসে বলল—খুশি বলে খুশি! নাচানাচি শুধু বাকি।
একটু হেসে দোনিয়া বলল, স্পিনোলা বার বার রাজা এনজিওকে বলছিল মূর্তিগুলো রাজধানী কাগলিয়ারিতে নিয়ে যেতে। কিন্তু আশ্চর্য! রাজা এনজিও সম্মত হলো না। বলল—আমাদের পূর্বপুরুষ রাজা ফ্রেডারিক যে গির্জায় যে ভাবে এই মূর্তিগুলো যে কারণে ঝুলিয়ে রোখছিলেন সেখানেই মূর্তিগুলো থাকবে। স্পিনোলা যুক্তি দেখাল মূর্তিগুলো এখানে বাজাবার মতো কোনো বাদ্যকর নেই। অমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম—সেইদুশো বছর আগের মতো প্রতিদিন ভোরবেলা মূর্তিগুলো বাজিয়ে সুর তোলার সম্পূর্ণ দায়িত্ব আমি নিলাম।
