জলের নীচে ভাঙা নৌকোর লোহার খাঁচাটার পাশে কাদা মাটিতে একটা বঁড়শি দিয়ে খুচিয়ে দ্রুত কাদামাটি সরাতেই দুটো মূর্তি পাশাপাশি পেল। জলে কয়েক পাক খেয়ে কোমরে পাক দেওয়া দড়ি খুলল। মূর্তি দু’টোয় দুটো বঁড়শি আটকে দড়িতে দু’টো হ্যাঁচকা টান দিল। দোনিয়া নৌকো থেকে দড়ি টানতে লাগল। মূর্তিদুটো জলের উপরে উঠে এলো। ফ্রান্সিস ও ভু করে ভেসে উঠল। সেনাপতি একজন সৈন্যকে বলল—মূর্তিদুটো তোমাদের নৌকোয় রাখো।
সৈন্যটি হাত-বড়িয়ে বঁড়শি থেকে মূর্তিদুটো খুলে নিজেদের নৌকোয় রাখল। অন্য সৈন্যটি এবার দোনিয়ার হাত থেকে বঁড়শি বাঁধা দড়িটা কোমরে জড়িয়ে জলে ঝাঁপ দিল। যেমন ফ্রান্সিস দেখিয়ে দিয়েছিল।
সবাই জলের দিকে তাকিয়ে রইল। একটু পরেই দোনিয়া হাত ধরে দড়িতে দুটো হ্যাঁচকা টান দিল। দোনিয়া দড়ি টানতে লাগল। একটি মূর্তি উঠে এলো। সৈন্যটা জলে ভেসে উঠল। খুশিতে ও হাসছে তখন। মূর্তিটি রাজার নৌকোয় রাখা হলো।
ছ’টা মূর্তি উদ্ধার হলো। এবার সবচেয়ে বড়ো আর সবচেয়ে মূল্যবান মূর্তিটি উদ্ধার করতে হবে। সেনাপতিকে দেখা গেল খুব উৎসাহী। অন্য সৈন্যটিকে হাত-পা নেড়ে কি সব বলে উৎসাহিত করল। সৈন্যটি দড়ি পেঁচিয়ে নিয়ে জলে ঝাঁপ দিল।
সকলেই জলের দিকে তাকিয়ে আছে। সকলেই ভাবছে বড় মূর্তিটি কি সৈন্যটি উদ্ধার করতে পারবে? জলে কয়েকটা বুদ্বুদ উঠে ভেঙে গেল। ফ্রান্সিস সেদিকে তাকাল। ও নিশ্চিত জানে সৈন্যটি পারবে না। অন্য মূর্তিগুলো ভাঙা নৌকোর লোহার খাঁচাটার আশেপাশে ছিটকে পড়েছে। তাই পাওয়া গেল। বড় মূর্তিটা নিশ্চয়ই ওগুলোর তুলনায় ভারী ছিল। ছিটকে পড়ার সম্ভাবনা কম। তবু জায়গাটা ভালো করেনা দেখে এখনই কিছু বলা যাবেনা। তবে সৈন্যটি যে এত অল্প সময়ে খুঁজে বের করতে পারবে না, এটা ঠিক।
কিছু পরেই সৈন্যটি ভুস করে জলের ওপর মাথা তুলল। হাঁপাতে হাঁপাতে দু’হাত নাড়িয়ে জানাল বড় মূর্তিটার হদিশ ও পায়নি।
সেনাপতির উৎসাহে তবু ভাটা পড়ল না। সেনাপতি দোনিয়ার হাত থেকে দড়িটা নিজে নিল। অন্য সৈন্যটিকে নামতে ইঙ্গিত করল। বোবচারার তখনও হাঁপভাবটা যায়নি কিন্তু সেনাপতির হুকুম। সৈন্যটি দড়ি কোমরে পেঁচিয়ে ঝাঁপ দিল।
আবার সবার আগ্রহ উৎকণ্ঠা। কি হয়? কিছুক্ষণ সময় কাটল। সৈন্যটি আস্তে আস্তে জল থেকে মাথা তুলল। ও তখন সমস্ত শরীর ছেড়ে দিয়েছে অসহ্য ক্লান্তিতে। নৌকোর সৈন্যটি বেশ কসরৎ করে হাত বাড়িয়ে ওকে নৌকোয় তুলে নিল।
সেনাপতির এখন আর সেই উৎসাহ নেই। মনে করেছিল গৌরব ও একই নেবে। সেটা হলো না। সেনাপতি এবার ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বলল—আমার সৈন্যদের একটু বিশ্রাম দরকার। আপনারা এবার নামলে ভালো হয়।
হ্যারি কথাটা ফ্রান্সিসকে বুঝিয়ে বলল। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। মারিয়া ভীতস্বরে বলল।—এক্ষুণি আবার নামছো?
ফ্রান্সিস হেসে বলল—কি করি। আমি ছাড়া কেউ পারবে না। যদি আমার কথা সত্য হয় তাহলে বেশিক্ষণ লাগবে না।
ফ্রান্সিস জলে ঝাঁপ দিয়ে জলের নীচে দ্রুত নেমে এলো। ঠিক জংধরা নৌকোর খাঁচাটার মাঝখানে নামল। বঁড়শি দিয়ে দ্রুত নৌকোর মাঝখানটা খুঁড়তে লাগল। পচা কাঠকাদা তুলে সরাতে লাগল। কিন্তু মূর্তির হদিশ নেই। পচা কাঠের টুকরো আর কাদায়ও জায়গার জলটা কালো হয়ে গেল। দম ফুরিয়ে আসছে। ফ্রান্সিস আর দাঁড়াল নাত জলের ওপরে উঠে এলো। সবাই হতাশ হলো। হারি বুঝল ফ্রান্সিস যখন বিফল হলো তখন বড়মূর্তি উদ্ধার করা সহজ হবেনা।
ফ্রান্সিস জল থেকে উঠল না। জলের ওপর মুখ তুলে হাঁপাতে লাগল। একটু পরে বলল—বিস্কো তুমিও নামো। একা হবে না।
বিস্কো সঙ্গে সঙ্গে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস বলল—আমি আঙুল দিয়ে যে জায়গাটা দেখিয়ে দেবো, সেই জায়গাটাই খুঁড়বে।
ফ্রান্সিস ঠিক করল একটা বঁড়শি খুলে বিস্কোকে দেবে কাদামাটি খোঁড়ার জন্যে, কিন্তু বঁড়শিগুলো এত শক্ত করে বাঁধা যে দড়িনা কেটে খোলা যাবেনা। শাঙ্কোর কোমরে সবসময় ছোরা থাকে। বিস্কোর তো ছোরা নেই। ফ্রান্সিস বঁড়শিগুলো জলের ওপর তুলে সেনাপতির নৌকোয় রাখল। বলল—আপনার তলোয়ার দিয়ে একটা বঁড়শিদড়ি কেটে খুলে দিন।
সেনাপতি সঙ্গে সঙ্গে কোমর থেকে রূপোর ওপর মীনে করা তলোয়ারের বাঁট ধরে এক টানে তলোয়ার বের করল। ধারালো তলোয়ারের দুটো পোঁচেই দড়ি কেটে গেল। একটা বঁড়শি খুলে এলো। বিস্কো নিল ওটা।
এবার দুজনেই ডুব দিল। নৌকোর খাঁচাটার মাঝখানটায় দাঁড়াল দু’জন। ফ্রান্সিস ঠিক নৌকোর মাঝখানটা আঙুল টেনে দেখাল। দুজনেই মাঝখানটা দ্রুতহাতে খুঁড়তে লাগল। পচা কাঠ, কাদাটে জল ছড়িয়ে পড়তে লাগল। একটা চৌকোনো মতো কাঠের পাটাতনের কোণায় হঠাৎ বিস্কোর বঁড়শিটা আটকে গেল। বিস্কো জোরে একটা হ্যাঁচকা টান দিতেই পচা কাঠ ভেঙে টুকরো হয়ে গেল। কাদাজলের মধ্যে দিয়ে বিস্কো দেখল বড় মূর্তিটা কাত হয়ে আছে। ফ্রান্সিস ঠিক পেছনেই দ্রুতহাতে খুঁড়ছে। বিস্কো ফ্রান্সিসের গায়ে হাত দিয়ে ধাক্কা দিল। ফ্রান্সিস মুখ তুলে তাকাল। বিস্কো আঙুল দিয়ে মূর্তিটা দেখাল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে জলের ওপর দিকে আঙুল তুলে বিস্কোকে উঠে যেতে বলল। বিস্কো বুঝতে পারছিল দম ফুরিয়ে আসছে। ও হাতের বড়শিটা ফেলে দিয়ে দ্রুত হাতে পায়ে জল ঠেলে ওপরে উঠতে লাগল। ফ্রান্সিসের দম বেশি। একটা বঁড়শি মূর্তিটার শিংওয়ালা শিরস্ত্রাণের মাঝখানে আটকে দাঁড়িয়ে দু’টো হ্যাঁচকা টান দিল। দড়িটা একজন সৈন্য ধরে ছিল। টান লাগতে ও সেনাপতির দিকে তাকিয়ে বলল সেকথা। নিয়ম না জানলেও সেনাপতি সঙ্গে সঙ্গে দড়িটা ধরে টেনে দিল। দেখল বেশ ভারী। সেনাপতি হেসে উঠল। সৈন্য দু’জনকে দড়ি ধরে টানতে বলল। তিনজনে দড়ি ধরে এসসঙ্গে টানল। নৌকোর একপাশের তিনজন। দাঁড়িয়ে তখন। নিচু হয়ে জোর দিয়ে আবার টানতেই ভারসাম্য হারিয়ে নৌকোটা উল্টে গেল। তিনজনেই জলে পড়ে গেল। সেনাপতির হাত থেকে দড়িও ছিটকে গেল।
