অমত্য বসে আছেন।
সেনাপতি মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানিয়েই মূর্তিদুটো দু’হাতে তুলে ধরল। তারপর সিংহাসনের কাছে গিয়ে একটি মূর্তি রাজাকে অন্যটি স্পিনোলাকে দিল। তখন বিস্কো এসে দাঁড়িয়েছে। সেনাপতি বিস্কোর হাত থেকে ভাঙা মূর্তিটা নিয়ে অমাত্যকে দিল।
তিনজনই পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল। এত সহজে মূর্তিগুলো উদ্ধার করা হবে আর তাদের হাতে আসবে, এটা বোধহয় তারা কল্পনাও করেন নি। রাজা এনজিও আনন্দে সিংহাসন থেকে উঠে পঁড়িয়ে মূর্তিটা দু’হাতে উঁচু করে তুললাম। মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে রাজা হাসতে লাগল। রাজা এনজিও সিংহাসনে আবার বসতে স্পিনোলা ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বললেন—কিন্তু সবচেয়ে বড় পঞ্চম মূর্তিটা কোথায়?
ফ্রান্সিস একটু হেসে বলল—ওটা এখনও জলের নীচেই আছে।
ঠিক আছে—স্পিনোলা এবার রাজাকে বললেন—মহামান্য রাজা। বাকি মূর্তিগুলো আমাদের নৌসেনা বাহিনীর বাছাই করা কয়েকজন সৈন্য তুলবে। আপনি কী বলেন?
—বেশ তো-তবে আমার তাড়াতাড়ি চাই, রাজা বলল।
ফ্রান্সিস বুঝল স্পিনোলার মতলব ভালো নয়। নিজেরা বাকিমূর্তি গুনে দোনিয়ার সমমূল্যের চারভাগের এক ভাগ অর্থ পাওয়ার দাবিটা নস্যাৎ করে দেবেন স্পিনোলা। ফ্রান্সিস রাজার দিকে তাকিয়ে বলল—মান্যবর রাজা দোনিয়ার কিন্তু একটা শর্ত ছিল।
—কি শর্ত বলুন তো? রাজা একটু আশ্চর্য হয়ে বলল।
মূর্তিগুলো উদ্ধার করা হ’ল সেসবের সমমূল্যের অর্থের চারভাগের একভাগ দোনিয়ার প্রাপ্য হবে—ফ্রান্সিস বলল।
—কই আমি তো মনে করতে পারছি না, রাজা বলল।
ফ্রান্সিস স্পিনোলার দিকে তাকাল। বলল—স্পিনোলা সেদিন আপনার এই শর্তে দোনিয়াকে এবং আমাদের দিনের বেলা অনুসন্ধানের কাজ চালাতে সম্মতি দিয়েছিলেন। বোধহয় আপনার মনে আছে?
স্পিনোলা মাথা ঝাঁকিয়ে বলে উঠলো “ঠিক আছে—ওসব পরে ভাবা যাবে।
ফ্রান্সিস দৃঢ়স্বরে বলল—না—ঐ শর্তের ফয়েসালা এখনই করতে হবে। স্পিনোলা ফ্রান্সিসের দৃপ্তভঙ্গী লক্ষ্য করল। তিনি যথেষ্ট কুবুদ্ধি ধরেন, বুঝলেন, ফ্রান্সিসদের সাহায্য ছাড়া বাকি মূর্তিগুলো উদ্ধার করা সম্ভব নয়। কারণ ফ্রান্সিসরাই সঠিক জানে বাকি মূর্তিগুলো কোথায়। এখনই শর্ত অস্বীকার করলে এই বিদেশির ওদের জাহাজ দোনিয়াকে নিয়ে পালিয়ে যেতে পারে। ওদের এক্ষুনি বন্দি করা যেতে পারে কিন্তু তাহলে উদ্ধারের কাজ পিছিয়ে যাবে। স্পিনোলা একটু গম্ভীর স্বরে বললেন—রাজা এনজিও শর্ত রক্ষা করবেন। কিন্তু উদ্ধারকার্যে আপনাদের সাহায্য করতে হবে।
—বেশ—আমরা রাজি, ফ্রান্সিস বলল।
রাজা, অমাত্য দু’জন উঠে দাঁড়াল। স্পিনোলা ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বলল—কাল সকালে উদ্ধারের কাজ শুরু করবে আমাদের সৈন্যরা। আপনাদেরও সঙ্গে থাকতে হবে। রাজা স্পিনোলা ও অমাত্যকে নিয়ে অন্দরমহলের দিকে চলল।
—ফ্রান্সিসরাও রাজপ্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এলো। ওরা তখন খুবই ক্ষুধার্ত। ওদের স্নান-খাওয়া হয়নি। ফ্রান্সিস বিস্কোর অবশ্য পোশাক পরেই স্নান হয়ে গেছে।
পরের দিন রাজা এনজিওর জাহাজ বাঁধা নৌকোটা চড়ে তিনজন সৈন্য এলো। ফ্রান্সিসরা রাজার অন্য নৌকোটা আর দোনিয়ার নৌকোটায় চড়ে এলো সেই নির্দিষ্ট জায়গাটায়। তিনটে নৌকো সেই জায়গায় একত্র হল। একজন সৈন্য নৌকোয় উঠে দাঁড়িয়ে বলল—দোনিয়া, কোথায় ডুব দিতে হবে?
দোনিয়া আঙুল তুলে জায়গাটা দেখাল। সৈন্যটা অতি উৎসাহে তখনই জলে ঝাঁপ দিল।
সময় কাটতে লাগল। সবাই নৌকো থেকে ঐ জায়গায় জলের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু সৈন্যটির ওঠার নাম নেই। ফ্রান্সিস বলল—হ্যারি, এতক্ষণ আমিই জলের নীচে থাকতে পারি না। সৈন্যটি অনভ্যস্ত নিশ্চয়ই। একটা ভুল সৈন্যটা করেছেই। মূর্তি খুঁজে পেয়ে নিশ্চয়ই এক হাতে নিয়ে উঠে আসছিল। বোকামি আর কাকে বলে। শুধু এক খোলা হাতে জল ঠেলে দ্রুত ওপরে ওঠা যায় না। নৌবাহিনীর সৈন্য। সমুদ্রের ভারী জল সম্বন্ধে এটুকু অভিজ্ঞতা তো থাকা উচিত।
দোনিয়া বলল,—সোনার মূর্তি উদ্ধার করছে—এই উত্তেজনায় সৈন্যটি সাবধানতার কথা গুলিয়ে ফেলেছে।
বাকিদু’জন সৈন্য পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল। একজন ডুবে যাওয়া সৈন্যটার নাম ধরে ডাকল। পরক্ষণেই নিজের ভুল বুঝে চুপ করে গেল।
বেশ সময় কাটল। বোঝা গেল যে কারণেই হোক সৈন্যটি আর বেঁচে নেই।
তখনই দেখা গেল রাজার জাহাজটা আস্তে আস্তে এদিকে আসছে। কাছে এলে দেখা গেল সেনাপতি রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সৈন্যদের একজন গলা চড়িয়ে সেনাপতিকে একজন সৈন্য কিভাবে মারা গেছে সেটা জানাল।
সেনাপতি সব শুনে ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনারা বলেছিলেন এ খোঁজ চালাবার জন্যে আপনারা সৈন্যদের সাহায্য করবেন। ফ্রান্সিস বলল, সৈন্যটি তো আমাদের কোনো সাহায্য চায়নি। ও জানতে চেয়েছিল, কোথায় ডুব দেবে। আমরা তা দেখিয়ে দিয়েছি।
—যাক গে সেনাপতি বলল এবার সাহায্য করুন।
ফ্রান্সিস নৌকোয় উঠে দাঁড়াল। সৈন্য দু’জনের দিকে তাকাল। হ্যারিকে বলল, হ্যারি—আমি তো ওদের ভাষা জানি না। তুমি বুঝিয়ে বলো আমি যেভাবে নামছি সেভাবে ওদের নামতে হবে। মূর্তি ফেলে সেটা এই বঁড়শির একটাতে আটকে দিয়ে কোমরের দড়ি খুলে ওপরে উঠে আসতে হবে। হ্যারি লো লাতিন ভাষায় সৈন্য দু’জনকে সব বুঝিয়ে বলল। ফ্রান্সিস দোনিয়ার দড়িবাঁধা বঁড়শিগুলো ঝুলিয়ে নিয়ে কিছুটা দড়ি কোমরে পেঁচিয়ে নিল। তারপর জলে ঝাঁপ দিল।
