—তুমি অন্য মূর্তিগুলো দেখেছো? হ্যারি বলল।
—না, তবে ওখানেই ছড়িয়ে আছে। বেশ খোঁজখুঁজি করতে হবে আর কি। ফ্রান্সিস বলল। মারিয়া বলল—আজকে আর তুমি নেবো না, বিস্কো নামুক। বিস্কো সঙ্গে সঙ্গে উঠে দোনিয়ার নৌকোয় লাফিয়ে উঠল। ফ্রান্সিসের মতো বঁড়শিবাঁধা দড়িটা কোমরে পেঁচিয়ে নিয়ে জলে ঝাঁপ দিল।
বিস্কো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হাতে পায়ে জল ঠেলে নীচে নেমে এলো। এখানে আলো বেশ কম। সেটুকু আলোতেই বিস্কো পাথরকুচি মেশা কাদামাটির ওপর দাঁড়াল। ভাঙা নৌকোর লোহার জংধরা খাঁচটার ধারে নীচু হয়ে কাদামাটি সরাতে লাগল। হঠাৎই কি একটা হাতে ঠেকল। জোরে হঁচকা টান দিতেই একটা কাদামাখা পেতলের সুন্দর কারুকাজ করা ভাঙা বর্শা উঠে এলো। বিস্কোওটা ফেলে দিল। আবার কাদামাটি সরাতে লাগল। কিন্তু দম ফুরিয়ে আসছে। বিস্কো কাদামাটিতে পা দিয়ে ধাক্কা দিয়ে জল ঠেলে উঠতে লাগল। যখন জলের মধ্যে পরিষ্কার আলোর আভাস পেল তখন ওর দম প্রায় শেষ। জলে জোরে পা চালিয়েও এক ধাক্কায় জলের ওপর উঠে এলো। ভুস করে উঠেই ও হাঁ করে শ্বাস নিতে লাগল।
ফ্রান্সিস দেখল সেটা। বুঝল আর একটু দেরি হলে বিস্কোর প্রাণসংশয় হত। ও চেঁচিয়ে বলল—বিস্কো উঠে এসো। একটু বিশ্রাম নিয়ে আমি নামছি।
বিস্কোরা তো জাতিতে ভাইকিং। যেমন দুঃসাহসী, তেমনি একরোখা। বিস্কো নৌকোয় উঠে এলো না। হাত দিয়ে জল ঠেলে একটুক্ষণ দম নিয়ে তারপর আবার ডুব দিল। বিস্কোর কপাল ভালো। দু’হাত দিয়ে তিন চারবার কাদা সরাতেই হাতে ঠেকল একটা যোদ্ধামূর্তি। কাদামাখা যোদ্ধামূর্তিটা টেনে তুলেই বঁড়শিতে আটকাল। তারপর জলের ওপর উঠে এলো। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল—দোনিয়া, দড়ি টানুন।
দোনিয়া তৈরিই ছিল। দড়ি টানতে লাগল। লেপ্টে থাকা কাদা নিয়ে মূর্তিটা উঠে এলো। দোনিয়া মূর্তিটা বঁড়শি থেকে খুলে নিয়ে নৌকোয় রাখল। দেখল হুবহু আগের মূর্তিগুলোর মতোই। ফ্রান্সিস একটু গলা চড়িয়ে বলল-বিস্কো আজ থাক। আবার কালকে নামা যাবে। একদিনে সব মূর্তি তোলা যাবে না। নৌকোয় উঠে এসো।
বিস্কো রাজার নৌকোয় উঠে এলো। মখাঁকরোঁপাতে লাগল। ফ্রান্সিসের নির্দেশে নৌকোদুটো চলল নুরাঘির ঘাটের দিকে। দুটো নৌকোই পাশাপাশি চলল। দোনিয়া ডাকল –ফ্রান্সিস
ফ্রান্সিস বলল—বলুন।
—ঘাটের দিকে তাকিয়ে দেখুন। নজরদাররা ঠিক বুঝেছে আর আমরা যে সোনার মূর্তি উদ্ধার করেছি, সেটা সবাই জেনে গেছে, সোনিয়া বলল।
সত্যিই তাই। দূর থেকেই ফ্রান্সিসরা দেখলো ঘাটে অনেক লোক জমে গেছে।
আস্তে আস্তে নৌকো দুটি ঘাটে লাগল। দেখা গেল সৈন্যরা তো আছেই আশেপাশের বসতি থেকেও অনেক লোক এসেছে। বৌ-মেয়েরা, বুড়োবুড়ি আর বাচ্চা ছেলেমেয়ের দল। এখানে সকলেইজানে মুজাহিদ যোদ্ধামূর্তিগুলো চুরি করে পালিয়ে গিয়েছিল। সেগুলো যে এই খাঁড়ির জলের নীচেই পড়েছিল এটা কেউ ভাবতেও পারে নি।
ফ্রান্সিস নৌকায় উঠে দাঁড়িয়ে বিস্কোকে বলল—বিস্কো মূর্তিদুটো উঁচু করে তুলে সবাইকে দেখাও। বিস্কো মূর্তিদুটি দু’হাতে তুলে সবাইকে দেখাতে লাগল। ঘাটে অত লোক। কিন্তু কারো মুখে কোনো কথা নেই। সকলেই অবাক হয়ে সেই মূর্তিদুটো দেখতে লাগল। উজ্জ্বল রোদ পড়েছে মূর্তিদুটোয় কাদামাটিতে ময়লা মূর্তির গায়ে এখানে-ওখানে সোনালি রঙটা দেখা গেল। বিস্ময়ভাব কেটে গেলে জমায়েত লোকেদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হলো। তারপর আনন্দোল্লাস শুরু হ’ল নৌকো থেকে নামল সবাই। সেনাপতি দোনিয়ার কাছে এসে বলল—মহামান্য রাজা আপনাদের ডেকে পাঠিয়েছেন। হ্যারি বলল—আমাদের এখনও খাওয়া হয় নি।
দুই বন্ধুর গায়ের পোশাক ভেজা।
—ওসব জানি না। মহামান্য রাজা আপনাদের এক্ষুনি যেতে বলেছেন।
সেনাপতি গলায় বেশ জোর দিয়ে বলল। হ্যারি কথাটা ফ্রান্সিসকে বলল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে বলল—দুটো মূর্তিই নিয়ে চলো।
মূর্তিতে বিস্কো আগে চলল। সেনাপতি দু’একবার মূর্তিদুটোর দিকে বেশ লোভাতুরদৃষ্টিতে তাকাল। ফ্রান্সিস লক্ষ্য করল সেটা। বলল—বিস্কো, মূর্তিদুটো সেনাপতির হাতে দাও।
বিস্কো তাই করল। গোমড়ামুখো সেনাপতি মূর্তিদুটো হাতে নিয়ে খুশিতে আটখানা। সবকটা দাঁত বের করে হাসতে লাগল যেন সেই জলের তলা থেকে মূর্তিদুটো উদ্ধার করেছে। সেনাপতি মূর্তিদুটো দুহাতে উঁচু করে তুলে হাঁটতে লাগল। পেছনে লোকের জটলাও চলল। হঠাৎ ফ্রান্সিসের মনে পড়ল ভাঙা মূর্তিটা ওদের ঘরে রয়েছে। বিস্কোকে বলল—বিস্কো, আমাদের আস্তানা থেকে ভাঙা মূর্তিটা নিয়ে এসো।
সঙ্গে সঙ্গে মারিয়া ফিস ফিস করে বলল—ওটা থাক না।
ফ্রান্সিস মারিয়ার দিকে তাকাল। তারপর বলল—মারিয়া, মূর্তিটা রাজা এনজিওর সম্পত্তি। ওটার ওপর আমাদের কোনো অধিকার নেই।
—কি সুন্দর মূর্তিটা! মারিয়া যেন আপন মনে বলল।
—উপায় নেই, ফিরিয়ে দিতেই হবে। ফ্রান্সিস বলল।
মারিয়া কয়েক পা দ্রুত হেঁটে গেল। ফ্রান্সিস বুঝল, মারিয়া মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছে। ও মৃদু হেসে হাঁটতে লাগল।
রাজ এনজিও সিংহাসনেই বসে ছিল। মাথায় মুকুট গায়ে রাজকীয় পোশাক নেই। হাল্কা হলুদ রঙের একটা জোব্বামতো গায়ে। জোব্বায় সোনালি রূপোলি সুতোর কাজ করা। বাঁ দিকের ডানদিকের দুটো আসনে স্পিনোলা আর স্পিনোলারই সঙ্গী একজন
