—অন্য মূর্তিগুলো দেখেছিল কি? দোনিয়া বলল।
—হয়তো দেখেছিল, কিন্তু জলে ডুব দিয়ে মূর্তিতে দড়ি বাঁধতে যেটুকু দমের দরকার তাতে একটা মূর্তিতেইদড়ি বাঁধা সম্ভব। যা হোক যে কারণেই হোক বা কোনো জেলেনৌকো বা জাহাজ এসে পড়েছিল বলেই হোক মুবারক আর জলে নামে নি—ফ্রান্সিস থামল।
-–তারপর মুবারক কি আর মূর্তি তুলতে পারে নি? হ্যারি বলল।
—না পারেনি-কারণ মূর্তিটা মুবারকনুরাঘির ওপরে ঐ ছোট চত্বরটার কাছে রেখেছিল এবং সেই রাতেই নুরাঘিতে ধস নেমেছিল। মুবারক নিজেকে বাঁচাবার মতো সময় পায়নি। ধসের পাথর ধুলোবালির সঙ্গে সে ছিটকে পড়েছিল খাঁড়িরজলে। মুবারকমারা গিয়েছিল এবং হঠাই। শুধুমূর্তিটাই থেকে গেল। তবে অটুট নয়। ধসের পাথরের ধাক্কায় মূর্তির হাতের ঢাল ভেঙে গড়িয়ে পড়েছিল। ওটাই আমার প্রথমে পেয়েছিলাম—ফ্রান্সিস থামল।
সকলেই চুপ করে রইল। একসময় দোনিয়া বলল তাহলে বাকি মূর্তিগুলো এবং সবচেয়ে বড় মূর্তিটা সবই এখানে জলের নীচেই আছে?
—হ্যাঁ, আমার এটাই অনুমান—ফ্রান্সিস বলল—তবে আজকে নয়—কালকে একটু বেলার কড়া রোদের সময় সুড়ঙ্গ থেকে জলে নামবো। তারপর জলের নীচে যতটা সম্ভব দেখে বুঝতে পারবো। চড়া রোদে জলের নীচে অনেকটা দেখা যাবে।
পরের দিন একটু বেলায় ফ্রান্সিসরা নৌকো নিয়ে ভাঙা নুরাঘির সুড়ঙ্গমতো মুখটার কাছে এলো৷ ফ্রান্সিস অনেকটা নিঃশ্বাস নিয়ে জলে ডুব দিল। নীচেহাত দশেক নামতেই দেখল ভাঙা নুরাঘিটার পাথর ছড়িয়ে আছে। ফ্রান্সিস দিকঠিক রেখে খাঁড়ির মাঝখানের দিকে চলল। হিসেব করে হাত কুড়ি আসার আগেই ওরদম ফুরিয়ে এলো। হাতে-পায়ে জল ঠেলে ও জলের ওপর উঠল। দোনিয়া আশ্চর্য হয়ে বলল—ফ্রান্সিস এতক্ষণ জলে ডুবে থাকতে পারে?
হ্যারি হেসে বলল—ফ্রান্সিস মুক্তো শিকারীদের সঙ্গে থেকে জলের নীচে অনেকক্ষণ ডুবে থাকার কায়দাকানুন শিখেছে।
ফ্রান্সিস আবার ডুব দিল। জল এখানে ততটা ঘোলা নয়, রোদেরও তেজ আছে। দেখল—নুরাঘির ভাঙা পাথরগুলো এতদূর পর্যন্ত আসেনি। ফ্রান্সিস জায়গাটায় একবার চক্কর দিয়ে জলের ওপরে উঠল। এবার সুড়ঙ্গটার দিকে তাকাল। সুড়ঙ্গটার সমান্তরালে সরে এলো। তারপর হিসেব করে হাত দশেক স’রে একটা দূরত্ব আন্দাজ করে ডুব দিল।
দ্রুত জল দু’হাত পায়ে ঠেলে নেমে এলো তলে মাটি, পাথরকুচি, কাদার কাছে। বাইরের উজ্জ্বল রোদ এখানে অল্পই পৌঁছেছে। একটা চক্কর দিতেই কেমন ঝাপসা দেখল কাদামাটিতে একটা বড় নৌকোর লোহার খাঁচা অনেকটা গেঁথে আছে। লোহার খাঁচাটা হদে কালো জং ধরা। নৌকোর কাঠ পচে গিয়ে কাদার সঙ্গে মিশে গেছে। হঠাৎ ফ্রান্সিসের অস্পষ্ট নজরে পড়ল লোহার খাঁচার পাশে, কাদায় কি যেন উঁচু হয়ে আছে। ফ্রান্সিস ওটা ধরে টানতেই উঠে এলো। আর একটা সোনার যোদ্ধামূর্তি। দম শেষ হয়ে এসেছে। ফ্রান্সিস বুঝল ভারী মূর্তিটা এক হাতে নিয়ে জল ঠেলে ওঠা যাবে না। ও মূর্তিটা রেখে হাতে পায়ে জল ঠেলে দ্রুত ওপরে উঠে দেখল হাত কুড়ি দূরে দোনিয়ার নৌকো। ফ্রান্সিস হাঁপাতে হাঁপাতে ডাকল—দোনিয়া।
দোনিয়া ওর দিকে তাকাল। ফ্রান্সিস হাত নেড়ে ডেকে বলল—এখানে আসুন।
দোনিয়া দাঁড় টেনে নৌকোটা ফ্রান্সিসের কাছে নিয়ে এলো। ফ্রান্সিস বলল—ঠিক এখানে নৌকোটা রাখুন, আপনার দড়ি বাঁধা বঁড়শিটা দিন। দোনিয়া নৌকোর গলুই থেকে বঁড়শি তুলে ফ্রান্সিসের হাতে দিল। বঁড়শি ঝুলিয়ে রেখে ফ্রান্সিস কিছুটা দড়ি কোমরে পেঁচিয়ে নিল। তারপর বলল—দড়ি ধরে দুটো হ্যাঁচকা টান দিলেই আপনি দড়ি টানতে শুরু করবেন।
কথাটা বলে বেশ দম নিয়ে ফ্রান্সিস ডুব দিল। যখন হাতে পায়ে জল ঠেলে নামছে তখন ও ভাবল—ঐ মূর্তিটা মুবারক হয়তো মাটি কাদা থেকে তুলে রেখে এসেছিল যে পরে রাতে দড়ি বেঁধে তুলবে বলে। দুর্ভাগ্য মুবারকের, তার সুযোগ আর ওর জীবনে এলো না।
ফ্রান্সিস মূর্তিটার কাছে পৌঁছল। কোমর থেকেদড়ি খুলল। মাথার সিং-এ মতো শিরস্ত্রা মাঝখানে বঁড়শিটা আটকে ও দড়িতে দুটো হ্যাঁচকা টান দিল। দোনিয়া দড়ি টানতে লাগল। মূর্তির প্রায় সঙ্গে ফ্রান্সিস জলের ওপর দিকে উঠতে লাগল। জল থেকে যখন মাথা তুলল তখন দেখল বঁড়শিতে ঝোলা অবস্থায় মূর্তিটার দিকে দোনিয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। হ্যারি, মারিয়া দেখল সেটা। ওরা ওদের নৌকো চালিয়ে দোনিয়ার নৌকোর কাছে এলো। ওরাও দেখতে লাগল মূর্তিটা। মারিয়া হাত বাড়িয়ে বঁড়শি থেকে মূর্তিটা খুলে নিয়ে নৌকোর মধ্যে রাখল। ফ্রান্সিস রাজার নৌকোটাতে উঠল। পাটাতনের ওপর শুয়ে পড়ল। হাঁ করে শ্বাস নিতে লাগল। অসহ্য ক্লান্তিতে শরীর নাড়াতে পারছে না। মারিয়া, হ্যারি দু’জনেই ফ্রান্সিসের কাছে সরে এলো। মারিয়া নিজের ঢোলা ঘেরের পোশাক পায়ের কাছে বেশ কিছুটা ছিঁড়ে ফেলল। ফ্রান্সিসের চোখ, মুখ, হাত, পা ঐ টুকরো কাপড় দিয়ে মুছিয়ে দিতে লাগল।
আস্তে আস্তে ফ্রান্সিসের শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক হলো। বলল—জানো হ্যারি, নুরাঘির পাথর ভেতরে বেশ কিছুটা দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে। ভাগ্যি ভালো তারপরে কাদার মধ্যে মুবারকের নৌকোটা গেঁথে আছে। অন্য মূর্তিগুলো ওখানেই ছড়িয়ে আছে। যদি ওগুলো নুরাঘির ভাঙা পাথরে ভাঙা পাথরের নীচে চাপা পড়তো, তাহলে ওগুলো আর উদ্ধর করা যেতো কি না সন্দেহ
