বিস্কো কয়েকটা ধসে—পড়া পাথর ডিঙিয়ে একটা পাথরের খাঁজ বের করে। জুলন্ত মশালটা বসিয়ে দিল। জায়গাটা বেশ স্পষ্টই দেখা গেল।
একটু পরে ফ্রান্সিস বলল, বিস্কো পাথরের চৌকোনো খণ্ডগুলো আস্তে আস্তে সরাতে হবে। দোনিয়া, আপনিও হাত লাগান। তিনজনে মিলে আস্তে আস্তে সাবধানে পাথরগুলো সরিয়ে চত্বরের একপাশে রাখতে লাগল। পাথরগুলো ভারী, তিনজনেরই যথেষ্ট পরিশ্রম হ’তে লাগল। হাঁপাতে লাগল তিনজনেই।
কিছুক্ষণের মধ্যেই জায়গাটা অনেকটা পরিস্কার হলো। কিন্তু কোনো যোদ্ধামূর্তির হদিশ পাওয়া গেল না। ফ্রান্সিস বলল—বসে একটু জিরিয়ে নেওয়া যাক।
তিনজনেই সিঁড়িগুলোয় বসল। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করার পর ফ্রান্সিস ই প্রথম উঠল। ওপরের সিঁড়ি যতটা পরিষ্কার হয়েছে, ততটা পর্যন্ত উঠল। তারপর কয়েকটা পাথর ডিঙিয়ে ওপরে একটা কাত হয়ে থাকা পাথরে পা রাখতেই ওখানে পাথরগুলো নাড়া খেল। আশেপাশের কয়েকটা পাথর গড়িয়ে গেল। ফ্রান্সিস ভারসাম্য হারিয়ে পড়তে গিয়ে কোনরকমে উঠে দাঁড়াল। গড়ানো পাথর ডিঙিয়ে আসতে গিয়ে হঠাৎ দেখল পাথরের জটলার নীচে সিঁড়িতে কি যেন পড়ে রয়েছে। জায়গাটা অন্ধকার, মশালের আলো পৌঁছোয় নি। ওদিকে পায়ের নীচে পাথর গড়িছে যাচ্ছে। ফ্রান্সিস পা রাখতে পারছেনা। ও দ্রুত একটা গড়ানো পাথরে ভর রেখে লাফ দিয়ে নীচের দুটো সিঁড়ির ধাপ পেরিয়ে পরিষ্কার সিঁড়িতে নেমে এলো। তখনও হাঁপাচ্ছে ফ্রান্সিস একটু দম নিয়ে ফ্রান্সিস আঙুল দিয়ে ওপরটা দেখিয়ে বলল—বিস্কো, ওখানের সিঁড়িতে একটা কিছু নজর পড়ল। ঐ পর্যন্ত পাথরগুলো সরাতে। হাত লাগাও।
তিনজনে আবার পাথর নামিয়ে আনতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যে সিঁড়ির সেই ধাপটা দেখা গেল। ফ্রান্সিস দ্রুত পায়ে উঠে এলো। এবার ভালোভাবেই দেখল ধুলো পাথরের কুচির নীচে কি যেন কিছুটা বেরিয়ে আছে। ফ্রান্সিস নুয়ে পড়ে ধুলো পাথরকুচি সরিয়ে ওটা টান দিতেই দেখল—সিংওয়ালা শিরস্ত্রাণ। সবটা বের করতেই দেখল সোনার যোদ্ধামূর্তি। ব্রোঞ্জের মূর্তিটার তিনগুণ। মূর্তির সোনার গা-টায় কেমন কালচে, ছোপ ছোপ। অনেকদিনের বৃষ্টি ধুলোবালিতে সোনালি রংটা যেন ঢাকা পড়ে গেছে। ফ্রান্সিস মূর্তিটা হাত দিয়ে তুলতে গিয়ে দেখল ঠিক শিং-এর জোড়াটায় দড়িবাঁধা। মূর্তি কিছুটা তুলতে বাঁধা দড়িটাও উঠল কয়েক হাত। তবে বৃষ্টির জলে পচে কালো হয়ে যাওয়া দড়িটা একটানেই ছিঁড়ে গেল। ফ্রান্সিস বুঝল মুবারক দড়ি বেঁধেইমূর্তিটা জলের তলা থেকে তুলেছিল। ও শ্যেন দৃষ্টিতে কাছাকাছি পাথরের নীচে তাকাতে লাগল। নাঃ—আর কোনো মূর্তি নেই।
নীচে থেকে বিস্কো চেঁচিয়ে বলল—কি হলো ফ্রান্সিস ?
ফ্রান্সিস ঘুরে দাঁড়িয়ে মূর্তিটা উঁচু করে ধরল। বিস্কো আনন্দে চিৎকার করে উঠল—ও—হো—হো—হো। দোনিয়াও হাসল। নীচে নৌকোয়-বসা মারিয়া আর হ্যারির কানে ভাইকিংদের এই উল্লাসধ্বনির শব্দ গিয়ে পৌঁছল। হ্যারি হেসে বলল—রাজকুমারী, ফ্রান্সিস নিশ্চয়ই মূর্তিগুলোর হদিশ পেয়েছে।
কিছুক্ষণ পরে বিস্কো মশাল হাতে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল। পেছনে ফ্রান্সিস আর দোনিয়া। ওদের ভাগ্য ভালো আজ আর ধস নামেনি।
ফ্রান্সিস নৌকোয় ওঠার আগে হাত বাড়িয়ে মূর্তিটা মারিয়ার হাতে দিল। মারিয়া মূর্তিটা হাতে নিয়ে খুশিতে হেসে উঠল। তখনই লক্ষ্য করল মূর্তিটার হাতের ঢালটা নেই। তার মানে আস্ত মূর্তি একটাই। মারিয়া গায়ের পোশাকের কাপড় দিয়ে মুর্তিটার গায়ে ঘষে দিল। মশালের আলোয় সোনালি রং একটু ঝিকিয়ে উঠল। হ্যারি বলল রাজকুমারী, সুড়ঙ্গের বাইরে যাবার আগে মূর্তিটা পোশাকে লুকিয়ে রাখুন।
মারিয়া তাই করল। মশাল জলে চুবিয়ে নিভিয়ে বিস্কো এসে নৌকোয় উঠল। দু’টো নৌকোই সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে খাঁড়ির জলে এসে। চলল নুরাঘির দিকে।
নুরাঘিরসদর দেউড়িতে আজও সেনাপতি দাঁড়িয়েছিল। দোনিয়াকে বলল—কতদূর এগোলেন?
-আর কয়েকটা দিন যাক—দোনিয়া বলল।
ঘরে ঢুকে ফ্রান্সিস যথারীতি মাথার পেছনে দু’হাতের তালু রেখে শুয়ে পড়ল। সবাই মূর্তিটা হাতে নিয়ে দেখতে লাগল। দোনিয়াও দেখল,তারপর হাঁটুর ওপর দু’হাত আড়াআড়ি রেখে মাথা গুঁজে রইল। খাওয়ার সময় হয়েছে বুঝে মারিয়া মূর্তিটা বিছানার কোণে নীচে ঢুকিয়ে রাখল। ঢালটাও ওখানেই রেখেছিল।
খাওয়া-দাওয়ার পর ফ্রান্সিস আর শুয়ে পড়ল না। দোনিয়া বিছানায় আধশোওয়া হলো। হ্যারি বলল—ফ্রান্সিস এবার কি করবে?
ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বলল—দেখো, আমার মনে হয় মুবারক ঐ একটা মূর্তিই দড়ি বেঁধে তুলতে পেরেছিল। আরগুলো তুলতে পারেনি।
দোনিয়া বলল—কি করে বুঝলেন যে বাকিগুলো তুলতে পারেনি?
—আমার এটা অনুমান। ব্যাপারটা এই রকম ঘটেছিল।
—মুবারক একাই এখানে এসেছিল। তখন নুরাঘিটায় ধস নামেনি। মুবারক গোপন পথটা দিয়ে নুরাঘির ওপরের দিকে ছোট চত্বরটায় আশ্রয় নিয়েছিল। মুবারক নৌকোর সাহায্য নেয় নি। কারণ ও ঠিক জায়গাটা বুঝতে পেরেছিল। ও পাথুরে দেয়ালের কথা যে চিঠিতে লিখে কেটে দিয়েছিল, সেটা ছিল সুড়ঙ্গের সামনের দেয়ালটা—ফ্রান্সিস থামল।
তারপর ভেবে নিয়ে বলতে লাগল –মুবারক দিনের বেলা সুড়ঙ্গটি দিয়ে জলে সাঁতরে খাড়ির জলে আসতো। তারপর চারদিকে কোনো জেলেদের নৌকো বা জাহাজ যখন দেখতো না তখন নিশ্চিন্ত হয় নিঃশব্দে সাঁতরে দেয়াল থেকে দূরত্ব আন্দাজ করে জলে ডুব দিতো। জলের নীচে মাটিতে কাদায় ডুবে যাওয়া নৌকোটা খুঁজতো। এইভাবে দিনের পর দিন খুঁজেমুবারক একটা মূর্তি পেয়েছিল। সেটাতে দড়ি বেঁধে সুড়ঙ্গের অন্ধকার থেকে দড়ি টেনে মূর্তিটা নিয়ে এসেছিল।
