পেছল সিঁড়িগুলো সাবধানে পার হয়ে নৌকোয় উঠল দু’জনে।
নৌকো ছেড়ে দিয়ে ফ্রান্সিস বলল—দোনিয়া, যোদ্ধামূর্তির একটা ভাঙা ঢাল আমি পেয়েছি।
দোনিয়া ভীষণ চমকে উঠে বলল—সত্যি?
ততক্ষণে নৌকো সুড়ঙ্গটার বাইরে চলে এসেছে। ফ্রান্সিস কোমরে গুঁজে রাখা ভাঙা ঢালটা বের করল। উজ্জ্বল রোদে দেখল, ওটা ঢালই। দোনিয়া হাত বাড়িয়ে ঢালটা নিলো। দেখে বলল—আপনার অনুমান ঠিক, এটা সৈন্য মূর্তির ভাঙা ঢাল।
—তার মানে আস্ত মূর্তিটা তাহলে যেখানে ঢালটা পেয়েছি সেখানেই কোথাও পাথরের নীচে চাপা পড়ে আছে—ফ্রান্সিস বলল।
দোনিয়া একটু ভেবে বলল—তারমানে অন্তত একটা মূর্তি মুবারক উদ্ধার করতে পেরেছিল। কিন্তু কোনো কারণে সেটা ফেলে যেতে হয়েছে আর ঐ মূর্তিটা ওখানেই পাওয়া যাবে।
ফ্রান্সিস দোনিয়ার হাত থেকে ঢালটা নিয়ে উঠে দাঁড়াল। ভাবল—ঢালটা উঁচুতে তুলে মারিয়া হ্যারি আর বিস্কোকে দেখাবে। দোনিয়া দ্রুত চারদিকে তাকাল। দেখল, খাঁড়ির পুবপারে একটা নৌকো ভাসছে। নৌকোর দু’জন জেলে ফ্রান্সিসের দিকেই তাকিয়ে আছে। দোনিয়া চাপাস্বরে বলে উঠল –ফ্রান্সিস, ঢালটা লুকোও নজরদারি চলছে।
ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে সাবধান হ’ল। আলগোছে ঢালটা হাত থেকে ছেড়ে দিল। নৌকোর গলুইয়ে পড়ল এটা। হ্যারি ওদের নৌকো থেকে গলা চড়িয়ে বলল—কি বলছিলে ফ্রান্সিস ?
ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে গলা চড়িয়ে বলল—কিছু না।
ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে দাঁড় টানতে লাগল। নৌকো দু’টো লল নুরাঘির ঘাটের দিকে। সারা নৌকাপথে ফ্রান্সিস কোনো কথা বলল না। ঘাটে নৌকো দুটো এসে লাগল। তার আগেই ফ্রান্সিস সোনার ঢালটা নৌকোর গলুই থেকে তুলে কোমরে গুঁজে নিয়েছিল। নুরাঘিতে ঢোকার মুখে সদর দেউড়িতে সেনাপতির সঙ্গে দেখা। সেনাপতি দোনিয়াকে বলল—হদিশ পেলেন কিছু?
তল্লাসি চালাচ্ছি দেখা যাক। দোনিয়া বলল।
একেবারে ঘরে ঢুকে ফ্রান্সিস চাপা স্বরে বলল—হ্যারি একটা যোদ্ধামূর্তির ভাঙা ঢাল পেয়েছি। সোনার ঢাল।
হ্যারি চমকে ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। মারিয়া চেঁচিয়ে উঠলো-বলো কি?
তখনই দু’জন সৈন্য ওদের দুপুরের খাবার নিয়ে ঢুকল। ফ্রান্সিস চোখের ইশারায় হ্যারি আর মারিয়াকে চুপ করে থাকতে বলল। সবাই বিছানায় বসে খেতে লাগল। খাওয়া শেষ হ’ল। সৈন্য দু’জন এঁটো থালা চিনামাটির বাটি নিয়ে চলে গেল।
এবার ফ্রান্সিস কোমর থেকে ভাঙা ঢালটা নিয়ে মারিয়ার হাতে দিল। মারিয়া খুশিতে আত্মহারা তখন। হ্যারি আর বিস্কো ঝুঁকে পড়ে সোনার ঢালটা দেখতে লাগল।
ফ্রান্সিস এসময় যা করে তাই করল। দু’হাতের তালু মাথার নীচে রেখে শুয়ে পড়ল। দোনিয়াও ওর পাশে আধশোয়া হলো। ফ্রান্সিসের মাথায় তখন অনেক চিন্তা। সেই চিন্তার কথাই বলবার জন্যে ডাকল—দোনিয়া।
—বলুন—দোনিয়া ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকাল।
-দেখুন, আমার মনে হয় মুবারক একাই মূর্তিগুলো জলের তলা থেকে উদ্ধার » করতে এসেছিল ফ্রান্সিস বলল।
—আমারও তাই মনে হয়—দোনিয়া বলল কিন্তু ক’টা মূর্তি মুবারক উদ্ধার করতে পেরেছিল, সেটাই বোঝা যাচ্ছে না।
ফ্রান্সিস বলল—আজ থাক, বিকেল হয়ে গেলে খোঁজা যাবে না। কালকে সকালে গিয়েই যে জায়গায় ঢালটা পেয়েছি সেখানে ভালো করে খুজতে হবে। মারিয়া হ্যারি নৌকোয় থাকবে। আমরা তিনজন উঠে পাথর সরিয়ে খুঁজবো।
—হুঁ সাবধানে খুঁজতে হবে। আজকেও তো ধস নেমেছিল। আমরা নীচে থেকে পাথর গড়িয়ে পড়ার শব্দ শুনেছি, দোনিয়া বলল।
ফ্রান্সিস আর কিছু বলল না। চোখ বুজে শুয়ে রইল। মারিয়া ঢালটা হ্যারির হাতে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে গির্জাঘরের দিকে চলল। গির্জায় ঢুকে যে কুলুঙ্গিতে ব্রোঞ্জের যে ছোট্ট মূর্তিটা ছিল সেটার কাছে গেল। মূর্তির ঢালটার কারুকাজের সঙ্গে সোনার ঢালটার কারুকাজ মিলিয়ে। বুঝল—হুঁবহু এক। শুধু সোনার ঢালটা আকারে বড়ো। ঘরে ঢুকে বলল, ফ্রান্সিস—ব্রোঞ্জের মূর্তির ঢালের সঙ্গে মিলে গেছে। হুবহু এক, একইরকম কাজ।
ফ্রান্সিস চোখ না খুলেই মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
পরদিন সকালের খাবার খেয়েই নৌকায় চড়ে ফ্রান্সিসরা ভাঙা নুরাঘির দিকে চলল। অন্ধকারমতো সুড়ঙ্গটায় ঢুকল। নৌকো ভেড়াল পাথরের সিঁড়ির ধারে।
ফ্রান্সিস, বিস্কো আর দোনিয়া পেছল সিঁড়িতে নামল। ফ্রান্সিসের নির্দেশমতো বিস্কো আগেই একটা মশাল এনে নৌকোয় রেখেছিল। কোমরে গুঁজে এনেছিল লোহার টুকরো আর চকমকি পাথর। বিস্কোমশালটা তুলে ফ্রান্সিসকে দিল। তারপর চকমকি ঠুকে মশালটায় আগুন ধরাল। এবার মশালটা হাতে নিয়ে ভীষণ পেছল সিঁড়ি দিয়ে সাবধানে পা টিপে টিপে উঠতে লাগল। মশালের আলোয় সিঁড়ির ধাপগুলো স্পষ্টই দেখা যাচ্ছিল। তিনজনে সাবধানে উঠতে লাগল সেই কাদা ল্যাপটানো সিঁড়িগুলো দিয়ে। পেছল সিঁড়ি শেষ। এবার ওঠাটা সহজ হলো। ফ্রান্সিস উঠতে বলল—বিস্কো দোনিয়া কান খাড়া রাখুন। পাথরের সামান্য নড়াচড়ার শব্দ হলেই দাঁড়িয়ে পড়বেন দেয়াল ঘেঁছে।
আস্তে আস্তে তিনজনেই সেই বাঁ দিকের বিরাট খোঁদলের পাশে ছোট্ট চত্বরটায় এসে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস যে পাথর দু’টোর মাঝখানে আটকে-থাকা সোনার ভাঙা ঢালটা দেখেছিল, সেখানটা ভালো করে দেখতে লাগল। ওখানটায় পাথরের স্তূপ যেন। কিছুক্ষণ দেখেটেখে ফ্রান্সিস বলল—বিস্কো, মশালটা একটু ওপরে পাথরের খোঁজ বসিয়ে দাও।
