পরদিন ফ্রান্সিসদের সকালের খাওয়া শেষ হতে সেনাপতি এলো। ওরা সেনাপতির সঙ্গে সাসারির রাজপ্রাসাদের দিকে চলল।
রাজা এনজিও সিংহাসনে বসে আছেন। বাঁপাশের আসনে স্পিনোলা বসে। রাজা এনজিও দোনিয়াকে বললেন-যোদ্ধামূর্তিগুলোর কোনো হদিশ পেলেন?
দোনিয়া বলল যা বলার ফ্রান্সিস বলবেন।
ফ্রান্সিস একটু এগিয়ে বলল—মান্যবর রাজা আমরা একটু গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পেয়েছি। তার ওপর নির্ভর করেই আমরা সন্ধানকার্য চালাবো।
—সেই গুরুত্বপূর্ণ সূত্রটা কি? স্পিনোলা কুটিলদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল।
ফ্রান্সিস সাবধান হলো। বলল—সেটা যথাসময় বলবো। তবে সবটাই এখনো অনুমানের পর্যায় আছে। কয়েকটা দিন সন্ধান চালিয়ে তবেই যাচাই করতে পারবো।
—কতদিন লাগবে?আমাকে তো রাজধানীতে ফিরে যেতে হবে—রাজা এনজিও বলল।
—কিছুদিনের মধ্যেই ঠিক করে উদ্ধার করতে পারবো কিনা সেটা বলতে পারবো ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক আছে, চেষ্টা চালিয়ে যান। তবে মহামান্য রাজাকে আমি বলেছি—আপনারা মিছিমিছি খাটাখাটুনি করেছেন। সেই মূল্যবান মূর্তিগুলো মুজাহিত তার রাজ্যে নিয়ে গিয়েছে—স্পিনোলা বলল।
—হয়তো আপনার অনুমান সত্য, তবে আমার কিন্তু স্থির বিশ্বাস মূর্তিগুলো এই খাঁড়ির জলের নীচেই আছে—ফ্রান্সিস বলল।
—হুঁ—স্পিনোলা আর কোনো কথা বলল না।
-আপনারা এবার যেতে পারেন। তবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব খুঁজে বের করুন। রাজা এনজিও বলল।
—আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি—দোনিয়া বলল। সবাই মাথা নুইয়ে রাজাকে সম্মান জানিয়ে রাজপ্রাসাদের বাইরে চলে এলো।
বিস্কো সকালেই মারিয়াকে আনতে চলে গিয়েছিল। ফ্রান্সিসরা নুরাঘির ঘাটে এসে দেখল—রাজার নৌকোয় বিস্কো, মারিয়া বসে আছে। হ্যারি সেই নৌকোয় উঠল। দোনিয়ার নৌকোয় উঠল ফ্রান্সিস আর মারিয়া। সামনে ফ্রান্সিসদের নৌকো। নৌকো চলল ভাঙা নুরাঘিটার দিকে।
কাছাকাছি যখন নৌকো পৌঁছল তখন অনেকটা চৌকোনো আকারের সেই সুড়ঙ্গটা আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে ফ্রান্সিস বলল—দোনিয়া, এই গোপন পথটা মুবারক যেভাবেই হোক খুঁজে বের করেছিল। এখানেই মুবারক নৌকোর সঙ্গে নিজেকেও লুকিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। তখন এটার মুখে পাথুরে দেয়াল ছিল নিশ্চয়ই। গোপন পথটা লোকচক্ষুর আড়ালে রাখার জন্যে। ধস নামার সময় সেই দেয়ালটা ভেঙে পড়েছিল। লক্ষ্য করুন সুড়ঙ্গের মুখটার চারপাশের পাথরগুলো ভাঙা।
-বুঝলাম, কিন্তু নুরাঘিটার ধস নেমেছিল মুবারক এখানে আসার আগে না পরে? দোনিয়া বলল।
—আমার মনে হয় তার আগে—ফ্রান্সিস বলল।
দু’টো নৌকোই সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকল। এখানে অন্ধকার, সুড়ঙ্গপথে যেটুকু সামান্য আলো আসছে। অন্ধকারটা চোখে স’য়ে আসতে ফ্রান্সিস নৌকো থেকে সেই প্যাঁচপেচে পেছল কাদাভরা পাথরের সিঁড়িতে পা রাখল। বলল—বিস্কো তুমি আমার পেছনে এসো। কিন্তু সাবধান, ভীষণ পেছল, পা টিপেটিপে এসো।
বিস্কোও নামছে তখনই মারিয়া বলল—বিস্কো বলেছে সেনাপতি নাকি এই নুরাঘিতে উঠতে মানা করেছে।
অন্ধকার সিঁড়ি থেকে ফ্রান্সিস বলল—উপায় নেই, তবে ভয় নেই। আমরা সাবধান থাকবো। অন্ধকার সুড়ঙ্গে ফ্রান্সিসের কথাগুলো বেশ জোরালো শোনালো।
অন্ধকারে ফ্রান্সিস পা টিপে টিপে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল। তখনই ভাবল, ভুল হয়েছে, একটা মশাল আনতে হতো। পাঁচ-সাতটা সিঁড়ির পরেই আর জলকাদা নেই। শুকনো পাথর সিঁড়িতে আগেই পেতেছিল। নিশ্চিন্তে উঠতে লাগল।
চত্বরমতো জায়গাটায় আসতেই বাঁ দিকের বিরাট খোদল দিয়ে আলো আসছে দেখল। এখানটায় বেশি অন্ধকার নেই।
ফ্রান্সিস সারাক্ষণ কান খাড়া রাখছিল। যদি কোনো পাথর পড়ার শব্দ শোনে, সাবধান হতে পারবে। চত্বরটার পরে সিঁড়িটায় উঠতে যাবে তখনই ফ্রান্সিসের কানে এলো খুব মৃদু পাথর ঘষণির শব্দ। সঙ্গে-সঙ্গে ও পাশের পাথুরে দেয়ালে শরীরটা লেপ্টে দাঁড়াল আর গলা চড়িয়ে বলল—বিস্কো, ধস সাবধান।
বিস্কোও দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়ল।
সত্যিই ওপর থেকে বেশ কয়েকটা পাথর ঠকঠক শব্দ তুলে সিঁড়ির ওপর দিয়ে ধসে পড়ল, ছোট চত্বরটার ওপর। ফ্রান্সিসের গা ঘেঁষেই পাথরের বড় বড় চৌকোনো টুকরোগুলো গড়িয়ে পড়ল। একটা পাথর বিস্কোর পায়ের পাতায় প্রায় গড়িয়ে পড়েছিল। বিস্কো দ্রুত পা সরিয়ে নিল। ধুলো উড়ল।
ধস থামতে ফ্রান্সিস পাথর ডিঙিয়ে ছোট চত্বরটায় নামতে যাবে, তখনই ঐ অল্প আলোয় দেখল দু’টো পাথরের মধ্যে চৌকোনো মতো কি যেন আটকে আছে। ফ্রান্সিস নিচু হয়ে দেখেও বুঝল না জিনিসটা কি? ও হাত বাড়িয়ে দু’টো পাথরের জোড় থেকে জিনিসটা টেনে খুলে আনল। সামান্য আলোয় দেখল চৌকোনো মতো কি যেন। তামা বা পেতলের পাতের মতো জিনিসটার ওপর থেকে ধুলোবালি ময়লা হাত দিয়ে মুছে ফেলতেই বুঝল—পেতল-তামা নয়, সোনা আর তাতে গোল গোল কাজ করা।
ওদিকে নৌকো থেকে হ্যারি, মারিয়া ধস নামার শব্দ শুনে তখন ফ্রান্সিস, বিস্কোকে ডাকাডাকি শুরু করেছে। বিস্কো চেঁচিয়ে বলল—ভয় নেই, আমরা নিরাপদ।
সোনার জিনিসটায় কিছু কিছু কাজ করা আছে। ফ্রান্সিস দ্রুত ভাবতে লাগল—সোনার এই জিনিসটা কী হতে পারে। হঠাৎ ওর মনে পড়ল গির্জায় দেখা সেই ব্রোঞ্জের ছোটো যোদ্ধামূর্তির কথা। মূর্তিটার বাঁ হাতে ঠিক এমনি একটা ঢাল ছিল। তাহলে কি নিখোঁজ একটি যোদ্ধামূর্তির ঢাল এটা? ফ্রান্সিস চমকে উঠল। তাহলে মুবারক কি একটা মূর্তি উদ্ধার করতে পেরেছিল? ফ্রান্সিস আর দাঁড়াল না। ঢালটা কোমরে গুঁজে দ্রুত সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়ে বলল—বিস্কো, নামবো চলো।
