এবার জলের পিপেগুলো বেশ কয়েকজন ধরে ধরে নিয়ে চলল রান্না ঘরের পাশে রেখে দেওয়ার জন্যে।
রাতের খাওয়া শেষ হতেই ঘর ঘর শব্দে নোঙর তোলা হলো। পাটাতন তুলে ফেলা হলো। নোঙরের দড়ি আলগা হতেই জাহাজ তীরভূমি থেকে সরে আসতে লাগল। দোনিয়াকে নিয়ে ফ্রান্সিস জাহাজ চালক ফ্লাইজারের কাছে এলো। দোনিয়ার নির্দেশমতো ফ্লাইজার জাহাজ চালাতে লাগল সরাসরি বন্দরের উদ্দেশ্যে।
জোর বাতাস, জাহাজের পালগুলো ফুলে উঠল। সমুদ্রে উঁচু ঢেউ উঠছে না। ছোট ছোট ঢেউয়ের মাথায় চাঁদের আলো চিক্ চিক্ করছে। ভাইকিং বন্ধুরা নিশ্চিন্তে ঘুমোতে গেল। দাঁড় টানার আর দরকার নেই। তৃষ্ণার জল পেয়ে এখন সবাই মোটামুটি সুস্থ। তার ওপর দাঁড় টানার পরিশ্রম থেকেও মুক্তি পেয়েছে।
জাহাজ চলল। পথে ঝড়বৃষ্টির পাল্লায় পড়তে হয় নি। শুধু এক সকালে ঘন কুয়াশায় দিগভ্রম হবার উপক্রম হয়েছিল। সোনিয়া দিক ঠিক করে চালক ফ্লাইজারকে জাহাজ চালাবার নির্দেশ দিয়েছিল। দু’দিন পরেই ফ্রান্সিসদের জাহাজ সার্দিনিয়া দ্বীপের কাছে এলো। সমুদ্রতীরের কাছ দিয়ে জাহাজ চলতে লাগল।
পরদিন বিকেলের দিকেদূর থেকে সাসারিবন্দর দেখা গেল। দুটো মালবাহী জাহাজ নোঙরকরা ছিল। রাজা এনজিওর শৌখিন জাহাজটার কাছে ফ্রান্সিসদের জাহাজ ভিড়ল। নোঙরকরা হলো।
ফ্রান্সিস আর দেরি করতে চাইছিল না। অনেক কষ্টে এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া গেছে। এই সূত্রে নির্ভর করেই সোনার যোদ্ধামূর্তিগুলো উদ্ধার করতে হবে।
ফ্রান্সিস হ্যারিকে বলল—দোনিয়া আর শাঙ্কোকে খবর দাও। আমরা এখুনি নুরাঘির ঘরটায় যাবো, রাতে থাকবো। কাল সকাল থেকেই অনুসন্ধান চালাবো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দুটো নৌকোয় চড়ে ফ্রান্সিসরা নুরাঘিটায় এলো। ফ্রান্সিস নিজেদের ঘরে ঢুকেই বিছানায় শুয়ে পড়ল। মাথার পেছনে দু’হাত রেখে চোখ বুজে রইল। হ্যারি দক্ষিণের জানালাটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। অস্তগামী সূর্যের আলো পড়েছে খাঁড়ির জলে। ছোট ছোট ঢেউ তোলা জল কেমন লালচে হয়ে উঠেছে। এতক্ষণ কেউ কোনো কথা বলে নি। দোনিয়া চুপ করে বসেছিল। ভাবছিল—ফ্রান্সিস একটা গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পেয়েছে। কিন্তু ঐ সূত্রের ওপর নির্ভর করে কি যোদ্ধামূর্তিগুলো উদ্ধার করা যাবে? দোনিয়ার মনের কথা যেন ফ্রান্সিস বুঝতে পারল। বলল—দোনিয়া, আমার দৃঢ় বিশ্বাস ঐ ভাঙা নুরাঘিটার হাত তিরিশেক দূরে নৌকোটা ডুবেছিল। কাজেই ঐ জায়গাটাকে কেন্দ্র করেই আমাদের তল্লাশি চালাতে হবে।
—কিন্তু সেই এলাকাটাও নেহাৎ ছোট নয়—দোনিয়া বলল।
—ঠিক, আস্তে আস্তে ঠিক জায়গাটার হদিশ পাবো—ফ্রান্সিস বলল।
ওদের কথাবার্তা শুনে হ্যারি এসে বিছানায় বসে বলল—আচ্ছা দোনিয়া,ঐ নুরাঘিটায় ধস নেমেছিল কবে?
—সঠিক সময়টা আমি কোথাও পাইনি। তবে অন্যান্য ঐতিহাসিক তথ্য থেকে হিসেব করে একটা আন্দাজ করা যায়—দোনিয়া বলল।
আন্দাজ করেই বলুন না—ফ্রান্সিস বলল।
—মানে ঐ নুরাঘির ধস নামার ব্যাপারটা নৌকোডুবিটার সঙ্গে জড়িয়ে যাবে এটা আমি কোনোদিন ভাবি নি—দোনিয়া বলল।
—এবার তো ভাবতেই হবে। হ্যারি বলল।
দোনিয়া আর কোনো কথা না বলে চুপ করে মাথা একটু ঝুঁকে হিসেবটা করতে লাগল। ফ্রান্সিস হ্যারি ও চুপ করে রইল।
সন্ধে হলো। ঘরটা অন্ধকার হয়ে গেল। একজন সৈন্য এসে দেয়ালের পাথরের খাঁজে বসানো মশালটা জ্বেলে দিয়ে গেল।
একসময় দোনিয়া বলল যতদুর হিসেবে পাচ্ছি তাতে ঐ নুরাঘির ধস নেমেছিল মুজাহিদ যুদ্ধে হেরে পালিয়ে যাবার পরে।
—কতদিন পরে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
—তাতে সঠিক বলতে পারবো না—দোনিয়া মাথা নেড়ে বলল।
হ্যারি বলল—ফ্রান্সিস তোমার কি মনে হয় মুবারক যোদ্ধামূর্তি উদ্ধার করতে এসেছিল?
ফ্রান্সিস গলায় বেশ জোর দিয়ে বলল—নিশ্চয়ই এসেছিল।
তারপর বলল—আমার মনে হয় মুবারক বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে নি। মুবারক একাই এসেছিল আর দিনে নয়, রাতে সন্ধান চালিয়েছিল।
—রাতে কেন—দোনিয়া বলল।
—দিনে সন্ধানের কাজ চালাতে গেলে সহজেই এখানকার লোকেদের চোখে, বিশেষ করে সমুদ্রে যারা মাছ ধরে সেই জেলেদের নজর পড়ে যেত। তাছাড়া ভুলে যাবেন না, মুবারক বিদেশি ছিল আরবি ছিল ওর মাতৃভাষা—হ্যারি বলল।
—হুঁ কথাটা ঠিক, দোনিয়া আপনমনে বলল। কেউ কোনো কথা বলল না।
রাতের খাওয়াদাওয়ার তখনও কিছু দেরি। সেনাপতি ঘরে ঢুকে। দোনিয়াকে বলল—মহামান্য রাজা আপনদের কাল সকালে দেখা করতে বলেছেন।
দোনিয়া মাথা কাত করে বলল—বেশ যাবো।
এবার চলে যেতে গিয়েও সেনাপতি ঘুরে দাঁড়িয়ে। বলল—আর একটা কথা। শুনলাম, আপনারা আজকে ঐ ধসে পড়া নুরাঘিটায় নাকি উঠেছিলেন।
—হ্যাঁ, খোঁজ করতে উঠেছিলাম। হ্যারি বলল।
—ভালো করেন নি। মহামান্য রাজার জাহাজ থেকে আমাদের সৈন্যরা দেখেছে, এখানকার জেলেরাও দেখেছে। এখনও ঐ নুরাঘির মাথা থেকে ধস নামে। আপনারা বিপদে পড়তে পারেন সেনাপতি বলল।
হ্যারি ফ্রান্সিসকে কথাটা বুঝিয়ে বলল। ফ্রান্সিস বলল—বলল যে আমরা এখন থেকে সাবধান হবো। তবে নুরার্থিটায় আর তার ধারে-কাছে খোঁজ করতেই হবে।
হ্যারি বলল সেকথা।
সে,আপনাদের দায়িত্ব! আমার সাবধান করার করে গেলাম—কথাটা বলে সেনাপতি চলে গেল।
