ফ্রান্সিস যতটা সম্ভব দ্রুত রেলিঙের দিকে ছুটল। রেলিঙে ভর দিয়ে তীরভূমির দিকে তাকাল। চাঁদের আলোয় অস্পষ্ট দেখল নুরাঘির ভাঙা মাথা। পেড্রো তখনও একনাগাড়ে ভাঙা গলায় বলে চলেছে নুরাঘি-ভাঙানুরাঘি। ডেক-এ শুয়ে থাকা ভাইকিংরা ততক্ষণে অনেকেই উঠে পড়েছে। তারাও রেলিঙের ধারে এসে ভিড় করে দাঁড়াল। শাঙ্কোও উঠে এলো! ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে দেখে বলল—শিগগির দোনিয়াকে ডাকো, জলদি। . একটু পরেই শাঙ্কো দোনিয়াকে নিয়ে ডেক-এ উঠে এলো। দোনিয়া ফ্রান্সিসের কাছে এলো। ফ্রান্সিস আঙ্গুল তুলে ভাঙা নুরাঘিটা দেখাল। দোনিয়া একটুক্ষণ টেনে নিয়ে হা, ওটার সামনেই একটা ছোট্ট জাহাজঘাটা মতো আছে।
জাহাজ চলল। ভাঙা নুরাঘিটার কাছাকাছি আসতেই এবার চাঁদের আলোয় অনেকটা স্পষ্ট দেখা গেল—ঘাটে একটা মালবাহী জাহাজ নোঙর করা আছে।
ফ্রান্সিসদের জাহাজটা আস্তে আস্তে জাহাজঘাটায় ভিড়ল। একটা সুবিধে হলো যে নৌকোয় চড়ে গিয়ে পিপেয় ভরে জল আনতে হবে না।
জাহাজঘাটার খুব কাছেই আনা গেল ফ্রান্সিসদের জাহাজটাকে। কাঠের পাটাতন ফেলা হলো। জলের জায়গায় আসা গেছে এই কথাটা এর মধ্যেই সব ভাইকিংদের মধ্যে ছড়িয়ে গেছে। মারিয়াও পেল খবরটা। বেশ দুর্বল শরীর নিয়েও মারিয়া ডেক-এ উঠে এলো।
এবার কারা জল আনতে যাবে, তাই নিয়ে ফ্রান্সিসকে ভাবতে হলো। হ্যারিকে নেওয়া যাবে না। হ্যারি তো বরাবরই দুর্বল। তারপরও জল নিতে না পেরে আরো কাহিল হয়ে পড়েছে। বিস্কোর দিকে তাকিয়ে ফ্রান্সিস বলল—তুমি শাঙ্কো আরো কয়েকজন সুস্থ সঙ্গ নাও আর জলের চারটে পিপেই নিয়ে এসো। যতটা সম্ভব জল নেব। আমি দোনিয়াকে নিয়ে জলের খোঁজে যাচ্ছি। তোমরা পেছনে এসো।
পাটাতনে হেঁটে গিয়ে কিছুটা জলকাদা পার হয়ে দু’জনে উঁচু পাড়ে উঠল। দু’ধারে এদিকে-ওদিকে কিছু পাথরের বাড়িঘর। চাঁদের আলোয় পাথর ছড়িয়ে থাকা ধুলোটে পথ দিয়ে দু’জনে চলল। একটু এগোতেই কিছু গাছগাছালির পরেই একটা টিলার মতো। তার মা নীচেই ছড়ানো বড়ো পাথর। দোনিয়াই এতক্ষণ আগে আগে যাচ্ছিল। দোনিয়া সেই কাঠের লম্বা চোঙটা নিয়ে এসেছিল। কারণ ও জানতো জল তোলার জন্যে এটা লাগবে।
দোনিয়া দু’টো চ্যাপ্টা পাথর খণ্ডের ওপর দু’পা রেখে নিচু হলো। ফ্রান্সিস দেখল পাথর খণ্ড দু’টোতে মাঝখানটায় গর্ত। চাঁদের আলোয় বোঝা গেল না কতটা গভীর। সোনিয়া কাঠের চোঙটা নামাল। ছলাৎ-জলের শব্দ উঠল। দোনিয়া কাঠের চোঙ ভরে জল তুলে। ফ্রান্সিসের দিকে এগিয়ে দিল। গত প্রায় দিন তিনেকের মধ্যে ফ্রান্সিস খুব সামান্য জলই খেয়েছে। সেই তৃষ্ণার জল সামনে। তবু ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলল—না, আপনি খান।
দোনিয়াও তৃষ্ণাকাতর মুখে ম্লান হাসল। বলল-যে কারণে আপনি জল খেতে চাইছেন না একই কারণে আমিও খাবো না। তবে জল দিয়ে চোখ-মুখটা ধুয়ে নিন। এটা করা খুবই প্রয়োজন।
ফ্রান্সিস আপত্তি করল না। দু’জনেই ঐ জলে হাতমুখ চোখে জলের ঝাপ্টা দিল। আঃ কি ঠাণ্ডা জল। কি শান্তি।
তখন পিপে নিয়ে ক্লান্ত পায়ে শাঙ্কোরা এলো। ওরা একটু দূর থেকে ফ্রান্সিস আর দোনিয়ার মুখ ধোয়া দেখল। ওরা সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠল-ও—হো-হো, কিন্তু সকলের গলাই তো শুকিয়ে কাঠ। তেমন জোরালো শব্দ গলা দিয়ে বেরলো না।
ওরা এবার প্রায় ছুটে এলো পিপেগুলো নিয়ে। একজন ভাইকিং বন্ধু দোনিয়ার হাত থেকে কাঠের চোঙটা প্রায় টেনে নিল। ফ্রান্সিস বাধা দিতে গিয়েও দিল না। ওখান থেকে সরে দাঁড়াল। শাঙ্কো দেখল সেটা। ভাবল ফ্রান্সিস যখন মানা করছেনা তখন জল না খেয়ে উপায় কি। ওদিকে বন্ধুরা সব জল তুলে খেতে শুরু করেছে। তখন ওদের আনন্দ দেখে কে। জল খাওয়া মাথায়, গায়ে ঢালা হৈ চৈ চলল। শাঙ্কোও প্রায় এক চোঙ জল খেয়ে ফেলল চো চো করে।
এতক্ষণে ফ্রান্সিস বলল—এবার পিপেগুলো ভরে ফেল। জাহাজে যে তৃষ্ণার্ত বন্ধুরা রয়েছে তাদের ভুলে যেও না। ভাইকিংদের হৈ, হল্লা এবার বন্ধ হলো। পিপে এনে এনে জল ভরতে লাগল। যখন সবগুলো পিপেয় জল ভরা শেষ হলো, তখন সবাই হাত লাগাল। ধরাধরি করে চাঁদের আলোয় পথ দেখে দেখে চলল জাহাজের দিকে। সবার পেছনে ফ্রান্সিস আর দোনিয়া।
পাতা পাটাতন দিয়ে পিপেগুলো ধরে ধরে নিয়ে সবাই জাহাজের ডেক-এ উঠল। শাঙ্কো এতক্ষণে একটু গলা চড়িয়ে বলতে পারলসবাই এসো, জল এনেছি। তৃষ্ণায় কাতর বন্ধুরা ছুটে এলো। কাঠের চোঙে জল ভরে শাঙ্কো সবাইকে জল খাওয়াতে লাগল। আনন্দের হৈ হল্লা শুরু হল। সেইশব্দ কেবিনঘরে গিয়েও পৌঁছল। মারিয়া আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে চলল ডেক-এ ওঠার সিঁড়ির দিকে। হ্যারি তার আগেই উঠে এসেছে। ফ্রান্সিস আর দোনিয়া একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। হ্যারি আর বিস্কো এসে ওদের কাছে দাঁড়াল। মারিয়া তখনই এলো।
ভাইকিং বন্ধুরা কাঠের চোঙটায় জল ভরে মারিয়ার কাছে এলো। মারিয়া ফ্রান্সিসদের দিকে তাকাল। ফ্রান্সিস হেসে বলল—আমরাও খাচ্ছি, তুমি খাও।
মারিয়া চোঙটা থেকে আস্তে আস্তে খেতে লাগল। শুকনো গলা দিয়ে জল যেন, নামতে চায় না। খুব বেশি জল মারিয়া প্রথমেই খেতে পারল না। এবার ফ্রান্সিস, দোনিয়া।, আর বিস্কো জল খেল। মারিয়া আবার জল খেল। অল্প জল হাতে নিয়ে চোখ-মুখ ধুয়ে নিল। ততক্ষণে ভাইকিংদের আনেন্দে হৈ-হল্লা থেমে গেছে।
