জাহাজ চলল। তখন আকাশের অন্ধকার ফিকে হয়ে আসছে। কিছুক্ষণ পরেই পুব আকাশে লাল আলো ছড়িয়ে সূর্য উঠল। সূর্য তখন মাথার ওপর উঠে এসেছে। তখনও ডাঙা নুরাঘিটা নজরদার পেড্রোর চোখে পড়ল না।
দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষ হতেই দেখা গেল ধরে রাখা বৃষ্টির জল প্রায় শেষ। ফ্রান্সিসের নির্দেশে দুপুরের খাওয়ার সময় জল খুব হিসেব করে খেল সবাই। মারিয়া কিন্তু এক ফোঁটা জলও খেল না। ফ্রান্সিস শুনল সেটা, কিন্তু কিছু বলল না।
জাহাজ চলেছে। পেড্রো নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ডাঙা নুরাঘির মাথার দেখা নেই। সারারাত জাহাজ চলল। ফ্রান্সিস প্রায় সারা রাত না ঘুমিয়ে কাটাল। মারিয়ারও একঅবস্থা। কেউ কোনো কথা বলল না। ভাইকিং বন্ধুরা জলতৃষ্ণা নিয়েও কেউ ঘুমোল, কেউ ঘুমোল না।
ভোর হলো। বৃষ্টির ধরে রাখা জল কতটা আছে, তা দেখবার জন্যে ফ্রান্সিস বিছানা ছেড়ে উঠতে যাবে তখনই হ্যারি ঢুকল। বলল—ফ্রান্সিস কি করবে?
—জল শেষ, এই তো, ফ্রান্সিস বলল
—খুব সামান্য তলানি আছে, হ্যারি বলল, ফ্রান্সিস মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ ভাবল। মাথা তুলে বলল—বন্ধুদের মধ্যে যারা একটু দুর্বল, যারা জলতৃষ্ণা সহ্য করতে পারবে, একমাত্র তারাই অল্প জল খেতে পাবে। আর কেউ জল খাবেনা। সবাইকে বলে দাও।
—কিন্তু কার জলের খুবই প্রয়োজন মানে অসুখে মৃতপ্রায় হলে যেমন হয় সেটা বুঝবে কি করে? হ্যারি বলল।
ফ্রান্সিস একটু ভেবে নিয়ে বলল—বৈদ্যি ভেনকে ডাকো তো।
হ্যারি কেবিনঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মারিয়া বলে উঠল—জল সংগ্রহ করা না পর্যন্ত আমি একফোঁটা জলও খাবো না।
—ধরো দিন সাতেকের আগে জল পাওয়া গেল না। সেই সাতদিন পারবে জল না খেয়ে থাকতে? ফ্রান্সিস বলল।
—নিশ্চয়ই পারবো, মারিয়া গলায় বেশ জোর দিয়ে বলল।
তখনই ভেন কেবিনঘরে ঢুকল। ফ্রান্সিস বলল—ভেন তুমি তো সব শুনেছো।
ভেনই ভাইকিং বন্ধুদের মধ্যে বয়স্ক। চুলে দাড়িতে পাক ধরেছে। সে মাথা ওঠানামা করল। অর্থাৎ সবই জানে সে। ফ্রান্সিস বলল, শুধু তুমিই যাকে জল খাওয়াতে বলবে, তাকেই এই সামান্য জল থেকে জল খেতে দেওয়া হবে। কারণ তুমিই ঠিক বুঝবে কাকে জল খাওয়ানো প্রয়োজন।
ভেন কোনো কথা বলল না। শুধু আবার মাথা ওঠানামা করল। বুঝল বড় কঠিন দায়িত্ব চাপলো ওর ওপর। সকালের খাওয়া-দাওয়া শেষ হলো। কমবেশি তৃষ্ণার্ত সকলেই। তবু কেউ জল খেল না।
দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার সময় বোঝা গেল জল না খেয়ে থাকার প্রতিক্রিয়া কী? বেশ কয়েকজন ভাইকিং বন্ধু অসুস্থ হয়ে পড়ল। এই অঞ্চলে রোদের তাপ প্রখর নয়। তবু দিনের গরম তো। জলের তৃষ্ণা তো হবেই আর সময়ের সঙ্গে তা তো বাড়বেই। কিন্তু সহ্য করার ক্ষমতা তো সবার সমান নয়। ভেন অসুস্থদের চোখ জিভ পরীক্ষা করছে। তখনই ফ্রান্সিস এলো। বলল—ভেন, অন্য কোনোভাবে জলতেষ্টা সামান্য হলেও মেটানো সম্ভব?
ভেন মাথা নাড়ল। তারপর বিস্কোর দিকে তাকাল। বিস্কোর হাতে কাঠের লম্বা চোঙমতো। তাতেই বৃষ্টির শেষ জলটুকু রাখা হয়েছে। ভেন-এর নির্দেশে কয়েকজনকে অল্প জল খাওয়ানো হলো।
বিকেল থেকেই আরো অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ল। কেবিনঘরে ডেক এর এখানে ওখানে তারা শুয়ে পড়ে রইল। মারিয়া, হ্যারি, শাঙ্কোও শুয়ে পড়ে রইল। শুধু ফ্রান্সিস ডেক-এর ওপর চুপ করে বসে রইল। মাঝেমাঝেই তাকাতে লাগল আকাশের দিকে যদি মেঘের দেখা পাওয়া যায়। বিস্কো ভেন-এর নির্দেশমতো অসুস্থদের এক ফোঁটা দুফোঁটা করে জল খাইয়ে দিতে লাগল।
নজরদার পেড্রোকে ডাকবার জন্যে ভেন বিস্কোকে বলল। বিস্কো মাস্তুলের মাথার। দিকে তাকিয়ে ডাকল—পেড্রো, নেমে এসো। গলা চড়িয়েই ডাকতে গেল কিন্তু বিস্কোর। গলা দিয়ে জোর শব্দ বেরুলো না। গলা শুকিয়ে কাঠ। বিস্কো হাত ধরা জলের চোঙটা ভেনের হাতে দিয়ে বেশ কষ্ট করে দড়ির মই বেয়ে বেশ কিছুটা আস্তে আস্তে উঠল। বেশি তাড়াতাড়ি করতে গেলে পরিশ্রম হবে। জলের ষ্টো বেড়ে যাবে। ওখানে থেকেই ভাঙা গলায় ডাকল—পেড্রো।
পেড্রো শুনল ডাকটা। নীচের দিকে তাকাল। দেখল ডেক-এর ওপর অনেক বন্ধু চুপচাপ শুয়ে আছে। ভাগ্য ভালো রোদের তেজ কম, বাতাসও জোরে বইছে। তাই জলতৃষ্ণা কাতর ভাইকিংরা ডেক-এ শুয়ে একটু স্বস্তি পাচ্ছে।
পেড্রো এবার উঠল। আস্তে আস্তে দড়ির মইদড়ি ধরে নামতে লাগল। বিস্কোও নেমে এলো। পেড্রো ডেক-এ এসে দাঁড়াল। ভেন ওকে মুখ হাঁ করতে ইঙ্গিত করল। পেড্রো মুখ হাঁ করল। ভেন কিছুটা বেশিই জল ওর মুখে ঢেলে দিল। পেড্রো জল খেয়ে আবার চলল ই নিজের জায়গায়, মাস্তুলের মাথায়।
সূর্য অস্ত গেল। হালকা অন্ধকার নেমে এলো। একটু পরেই পূর্ব দিগন্তে চাঁদ উঠল। চাঁদের আলো ছড়ালো সমুদ্রের জলে। চাঁদের আলো খুব উজ্জ্বল না হলেও সমুদ্রের তীরের গাছপালা টিলা এসব দেখা যাচ্ছিল।
পেড্রো সামনে তাকিয়ে আছে সেইদিকে। যেন চোখে পলক পড়ছে না। দোনিয়া বলেছিল—একটা কালো রঙের ভাঙা নুরাঘির মাথা দেখা যাবে। ওখানেই ছোট্ট বন্দরমতো। কুয়োর জল পাওয়া যাবে ওখানে।
হঠাই পেড্রো চাঁদের অস্পষ্ট আলোয় দেখল—কয়েকটা গাছের মাথা ছাড়িয়ে কালো উঁচু গোল দেয়ালমতো। পেড্রো তখনও দমবন্ধ করে তাকিয়ে আছে। জাহাজ আরো এগিয়ে যেতেই পেড্রো দেখল ভাঙা নুরাঘিটা। ও চিৎকার করে উঠল—ভাঙা নুরাঘি ভাঙা নুরাঘি। গলায় সেই জোর নেই। তবু কথা তো বেরিয়ে এলো গলা থেকে। অস্পষ্ট হলেও ফ্রান্সিসের কানে গেল কথাটা। ও বেশ দুর্বল শরীর নিয়েও দ্রুত উঠে দাঁড়াল। বোধহয় একা ফ্রান্সিস ই বারবার মেঘ দেখার আশায় আকাশের দিকে তাকাচ্ছিল আর কান খাড়া রাখছিল যদি পেড্রো কিছু বলে।
