ওদিকে অন্য বন্দিরা সবাই লোহার ডান্ডায় ভর রেখে দাঁড়িয়ে ফ্রান্সিসদের কান্ড দেখছিল। শাঙ্কো ছুটে গিয়ে একে একে বন্দিদের হাত বাঁধা দড়ি কেটে দিতে লাগল। বন্দিরা ছাড়া পেয়ে জলকাদা ভেঙে খোলা লোহার দরজা দিয়ে মুহূর্তে উধাও।
ফ্রান্সিসরা ছুটে বাইরের অন্ধকারে এসে পড়ল। এবার চিন্তা কোথায় পিপেসুদ্ধ নৌকো তিনটি বেঁধে রেখে এসেছিল। আকাশে তখনও বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। বিদ্যুতের আলোয় দেখল ওরা পাথরের লম্বাটে ঘরটার কোণার দিকে এসেছে আর তখনই বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। বিদ্যুতের আলোয় দেখল ওরা পাথরের লম্বাটে ঘরটার কোণের দিকে এসেছে। আর তখনই দেখল লম্বাটে ঘরটা থেকে কে যেন বেরিয়ে এলো। ফ্রান্সিসরা দ্রুত গাছের আড়ালে গা ঢাকা দিল। লোকটা কাছাকাছি এসেছে তখন। ইগনোতি। বন্দিশালার দিকেই যাচ্ছে। ফ্রান্সিস ফিসফিস্ করে ডাকল শাঙ্কো’শাঙ্কো মাটিতে উবু হয়ে বসল। তারপর বিদ্যুৎগতিতে ছুটে গিয়ে পেছন থেকে হাত দিয়ে ইগনোতির মুখ চেপে ধরে ওর পিঠে ছোরাটা আমূল ঢুকিয়ে দিল। ইগনোতির মুখে শব্দ উঠল-ঘর। শাঙ্কো ইগনোতিকে একটুক্ষণ ধরে তারপর ছেড়ে দিল। ইগনোতি মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। দু’একবার নড়ে ওর শরীরটা তারপর স্থির হয়ে গেল।
ফ্রান্সিস আগে আগে ছুটল। পেছনে হ্যারি আর শাঙ্কো। ফ্রান্সিসের লক্ষ্য সমুদ্রের ধার যাওয়া। নৌকো থেকে নেমে ওরা বেশিদূর আসে নি। কাজেই বুঝে নিতে অসুবিধে হবে না। অন্ধকারে যতটা দেখে সম্ভব ওরা দু’টো চড়াই পার হলো। তখনই ফ্রান্সিসের গায়ে এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়া লাগল। ফ্রান্সিসরা সমুদ্রে সমুদ্রে ঘুরে বেড়ায়। সমুদ্রের সঙ্গে ওদের নাড়ি যোগ। ঠান্ডা হাওয়া গায়ে লাগতেই বুঝল—সমুদ্র কাছেই। বিদ্যুৎ চমকাল। দেখা গেল গাছগাছালি পাতলা হয়ে এসেছে। আর একটা উবাইতে উঠতেই কানে এল সমুদ্রের মৃদু গর্জন।
ফ্রান্সিস বলে উঠল—এসে গেছি।
সমুদ্রের ধারে পৌঁছল ওরা। অন্ধকারে চারদিকে নজর চালাল। তখনই বিদ্যুৎ চমকাল। দেখা গেল ডানদিকে হাত পঞ্চশেক দূরে ওদের নৌকো তিনটে ঢেউয়ের দোলায় দুলছে। হঠাৎ তীরভূমির দিকে শোনা গেল রক্ষীদের চিৎকার করে ডাকাডাকি, হৈ-হল্লা ঝোঁপঝাড় ভাঙার শব্দ, ওরা এতক্ষণে জেনেছে পেরেছে বন্দিরা পালিয়ে গেছে।
আর একমুহূর্তে অপেক্ষা না করে ফ্রান্সিসরা অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে নৌকোগুলোর দিকে ছুটল। ফ্রান্সিস আর হ্যারি প্রায় লাফ দিয়ে নৌকোয় উঠে পড়ল। গাছের গোড়ার সঙ্গে বাঁধা দড়ি তিনটে শাঙ্কো দ্রুত ছোরা দিয়ে কেটে ফেলল। সেই দড়ি তিনটে নৌকোর সঙ্গে তাড়াতাড়ি বেঁধে ফেলে লাফিয়ে নৌকোয় উঠল। অন্ধকারে দূরে ওদের জাহাজটা আবছা ছায়ার মতো দেখা যাচ্ছে। দাঁড় তুলে নিল ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো। নৌকো চালাল ওদের জাহাজ লক্ষ্য করে। ততক্ষণে সমুদ্রতীরে পৌঁছে গেছে রক্ষীর দল। হৈ-হল্লা করছে। কিন্তু ওখানে ওদের কোনো নৌকো বাঁধা নেই।
অন্ধকার সমুদ্রের ওপর দিয়ে নৌকোগুলো চলল জাহজের দিকে। আকাশে এখনও থেকে থেকে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।
জাহাজের ডেক-এ মারিয়া ঠায় দাঁড়িয়েছিল। বিস্কোরাও কয়েকজন ছিল। ফ্রান্সিসদের নৌকোগুলো অস্পষ্ট দেখল ওরা। চিৎকার করে উঠল-ও-হো-হো।
আস্তে আস্তে ফ্রান্সিসদের নৌকোগুলো এসে জাহাজের গায়ে লাগল। দড়ির সিঁড়ি ফেলা হলো। ওরা একে একে জাহাজের ডেক-এ উঠে এলো। মারিয়া ফ্রান্সিসদের দিকে এগিয়ে এলো। বলল—জল এনেছো?
ফ্রান্সিস মাথা নাড়ল। ফ্রান্সিসদের জলকাদমাখা চেহারা দেখেই মারিয়া, বিস্কোরা বুঝেছিল—কিছু একটা হয়েছে। ফ্রান্সিস এবার বিস্কোর দিকে তাকাল। বলল-বিস্কো বৃষ্টির জল কিছু জমাতে পেরেছো?
বিস্কো বলল সে আর বলতে। সবাই মিলে প্রায় আধ পিপে জমিয়েছি। জাহাজ ছাড়ো! এখানে আর এক মুহূর্তও থাকা যাবে না।
—তাহলে আর দেরি না।
—এই জলটুকু থাকতে থাকতে জলসংগ্রহ করতে হবে-ফ্রান্সিস বলল।
কয়েকজন ভাইকিং ছুটে গেল নোঙর তুলতে জাহাজে পাল খাটাতে। ওদিকে হ্যারি তখন বন্ধুদের সব ঘটনা বলছে। দোনিয়া তখনই ডেক-এ উঠে এলো। হ্যারির কথাবার্তা শুনেই বুঝল, ওরা জল পায় নি। ফ্রান্সিস এবার দোনিয়াকে জিজ্ঞেস করল—আপনি তো এই এলাকা মোটামুটি চেনেন। জল কোথায় পাবো বলতে পারেন?
দেখুন, কাছাকাছি একটা বন্দরমতো আছে। ওখানে একটা কূপ আছে। অনেক জাহাজই ওখানে থেমে প্রয়োজনীয় জল নেয়। কিন্তু সেটা এখন কতদূর, আমি সঠিক বলতে পরবো তবে সমুদ্রের তীরের ধারে ধারে জাহাজ দক্ষিণমুখে চালালে ছোট্ট বন্দরটা পাওয়া যাবে।
ফ্রান্সিস জাহাজচালক ফ্লাইজারের কাছে গেল। দোনিয়ার কথাবার্তা বলল। ফ্লাইজার মাথা ওঠানামা করল। তার মানে ও নির্দেশটা বুঝল। তীরভূমির যতটা সম্ভব কাছাকাছি দূরত্ব রেখে জাহাজ চালাতে লাগল।
ফিরে এসে দোনিয়াকে বলল—ঐ ছোট্ট বন্দরটার কোনো নিশানা দিতে পারেন।
-হ্যাঁ, সমুদ্র থেকেই একটা ডাঙা নুরাঘির মাথা কালো রঙের দেখা যায়।
দোনিয়াও ফ্রান্সিসের পাশেই দাঁড়িয়েছিল নজরদার পেড্রো। কথাটা শুনে পেড্রো দড়িদড়া ধরে মাস্তুল বেয়ে নিজের জায়গায় উঠে গেল। হ্যারি, শাঙ্কো ততক্ষণে স্নান করে গায়ের, মুখের শুকিয়ে আসা কাদা ধুতে গেল। ফ্রান্সিস ও চলে গেল স্নান করে গায়ের কাদা ধুতে।
