সন্ধের আগেই আকাশে মেঘ জমতে শুরু করল। সূর্যাস্তের আগেই অন্ধকার হয়ে গেল চারদিক। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল। কেমন একটা ঠান্ডা হাওয়া সমুদ্রের দিকে থেকে ছুটে এলো। ফ্রান্সিস লোহার খুঁটিটায় শরীরের ভর রেখে কিভাবে অক্ষত অবস্থায় পালানো যায়, তাই চোখ বুজে ভাবছিল। সমুদ্রের দিক থেকে ঠাণ্ডা হাওয়া এসে গায়ে লাগতেই ওর তন্দ্রা ছুটে গেল বিদ্যুতের ঝলকে চোখ ঝলসানো আলোয় ও চমকে উঠল। আকাশের দিকে তাকাল। দেখল পশ্চিম আকাশ থেকে মেঘ উঠে আসছে। অল্পক্ষণের মধ্যে চারদিক ঘন অন্ধকারে ঢেকে গেল। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল। তারপরই বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়তে লাগল। পরক্ষণেই তুমুল বৃষ্টি শুরু হলো। ফ্রান্সিস খুশিতে উঠে দাঁড়াল। চিৎকার করে বলল—হ্যারি—এই বৃষ্টি যীশুর আশীর্বাদ।
হ্যারি ঠিক বুঝল না। বলল—একথা বলছো কেন?
—ভেবে দেখো—এই বৃষ্টি আমাদের জাহাজের ওপরও পড়ছে। সমুদ্রে বৃষ্টির জল ধরে রাখাটা নতুন কিছু নয়। বিস্কো ওরা নিশ্চয়ই জল ধরে রাখবে। তাতে সকলের সবটা তেষ্টা মিটবে না। কিন্তু অন্তত কালকের দিনটা তো চালাতে পারবে।
হ্যারি বলল—সত্যি একথাটা আমি ভাবিনি তো—
—এবার পালানো-ফ্রান্সিস বলল। অন্ধকার আকাশেমুহূমুর্হবিদ্যুৎ চমকাতে লাগল। সেইসঙ্গে বাজপড়ার প্রচন্ড শব্দ। লোহার জালঘেরা সেই বন্দিশালার ওপর তো কোনো ছাউনি নেই। ফ্রান্সিসরা ও অন্য বন্দিরা প্রবল বৃষ্টিধারায় ভিজতে লাগল। বৃষ্টিতে এরকম জানোয়ারের মতো ভিজতে ভিজতেও কিন্তু ফ্রান্সিসের মন আনন্দে ভরে উঠল। একেবারে স্নান করার মতো ভিজে গেছে। ভিজতে ভিজতে এখন শীত শীত করতে লাগল। তবু মনে আনন্দ-মারিয়া আর বন্ধুদের জল খাওয়ার সমস্যা তো আপাতত মিটলো।
বেশ কিছুক্ষণ বৃষ্টি চলল। তারপর আস্তে আস্তে থেমে গেল। পায়ে লালচে মাটি কাদার তাল হয়ে গেল। সেই কাদার মধ্যেই অনেকে গা এলিয়ে দিয়েছে। বাকিরা বসে আছে। মুখে লালচে কাদার ছিটে। গায়ে-পায়ে কাদা লেপ্টে আছে। জন্তু জানোয়ারের মতো দশা মানুষগুলোর, জল কাদায় ছপাৎ ছলাৎ শব্দ তুলে কেউ কেউ এদিক-ওদিক চলাফেরা করছে। পরিচিতদের সঙ্গে মৃদুস্বরে কথা বলছে।
এই দৃশ্যের নির্মমতায় ফ্রান্সিস নিজেকে সংযত করতে পারল। গভীর দুঃখে, বেদনায় আবার ভীষণ রাগে ওর দু’চোখ ভিজে উঠল। ও মনে মনে স্থির করে ফেলল এই নির্মমতার শোধ ও নেবে। প্রয়োজনে এদের হত্যা করবে। হাতের কাছে পেলে কাউকে রেহাই দেবে না।
রাত হচ্ছে। রাতের খাবার দেবার সময়ই পালাতে হবে—ফ্রান্সিস ভাবল। আস্তে ডাকল—শাঙ্কো।
শাঙ্কো ওর দিকে তাকাল। ফ্রান্সিস বলল—এগিয়ে এসো।
শাঙ্কো ফ্রান্সিসের কাঁধের ওপর মাথা রাখল। ফ্রান্সিস বাঁধা দু’হাত শাঙ্কোর পোশাকের ঢোলা গলা দিয়ে ঢোকাল। ছোরাটা তুলে আনল। তরপর দু’থাবায় ছোরাটা ধরে শাঙ্কোর হাত বাঁধা দড়িতে ঘষে ঘষে দড়িটা কেটে ফেলল।
ফ্রান্সিস অপেক্ষা করতে লাগল রাতের খাবার দেবার সময়ের জন্যে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই রাতের খাবার দিতে তিনজন পাহারাদার এলো। ঢং ঢং শব্দে লোহার দরজা খুলল। ফ্রান্সিস নজর রাখল পেছনের দিকে। না, কোনো সশস্ত্র রক্ষী নেই। লক্ষ্য করল—মাঝের পাহারাদারটা বেশ লম্বাচওড়া, বলশালী। বাকি দুটোর সাধারণ শরীর। চাপা গলায় ফ্রান্সিস বলল—আমি মাঝেরটা, শাঙ্কো বাঁ দিকেরটা, হ্যারি ডানদিকেরটা—একসঙ্গে। গলা চেপে-টুঁ-শব্দটি যেন না করতে পারে। পাহারাদারদের একজনের হাতে জ্বলন্ত মশাল। সে ওটা দরজার একটা লোহার আংটায় বসিয়ে দিল।
ফ্রান্সিসরা তিনটে লোহার দন্ড ধরে রাখার ভান করে রইল। তিন পাহারাদারের মধ্যেরটির হাতে ছিল কাঠের বড় থালাটা, তাতে খাবার। সে উবু হয়ে থালাটা রাখতে যাবে, তখনই ফ্রান্সিস বিদ্যুৎবেগে লোকটার থুতনিতে প্রচন্ড জোরে লাথি চালাল। জল কাদা ছিটকোল। লোকটা লাথির মারে চিত হয়ে জলকাদার মধ্যে ছিটকে পড়ল যেন। ততক্ষণে শাঙ্কো আর হ্যারি ও বাকি দুজনের গলা চেপে ধরেছে যাতে টু শব্দটিও না করতে পারে। পাহারাদার দু’জনেই ঝটকাচ্ছে গলার চাপ মুক্ত করতে। শাঙ্কো ঠিক চেপে ধরে আছে। কিন্তু হ্যারি তো বরাবরই দুর্বল শরীরের। কোনোরকমে চেপে ধরে আছে। বন্দিশালার লোহার দরজার মাথায় মশাল জ্বলছে। তারই আলোয় দেখা গেল ফ্রান্সিস সেই বলশালী লোকটাকে শরীরের সমস্ত জোর দিয়ে গলা চেপে ধরে আছে। লোকটা দুহাতে ফ্রান্সিসের দু’হাত চেপে গলার চাপ কমাবার চেষ্টা করছে। জলে, কাদায়, সবারই শরীরে তখন লালচে কাদামাটির আস্তরণ।
ঠিক তখনই তিনজন সশস্ত্র রক্ষী বন্দিশালার কাছে এলো। হয়তো রাতে পাহারা দেবে বলে। মশালের আলোয় ফ্রান্সিসদের ঝটাপটি দেখে থমকে দাঁড়াল। তারপরই কোমর থেকে তলোয়ার খুলে নিয়ে খোলা দরজা দিয়ে ছুটে এলো। ফ্রান্সিস এক লাফে উঠে দাঁড়াল। তারপর প্রথমে ছুটে আসা রক্ষীটার দিকে প্রচণ্ড বেগে ছুটে গিয়ে রক্ষীটা কিছু বোঝবার আগেই ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কুঁক করে মুখে শব্দ তুলে ছিটকে গিয়ে জলকাদায় মুখ থুবড়ে পড়ল। ওর হাত থেকে তলোয়ারটা ছিটকে গেল। ফ্রান্সিস এক ঝটকায় জলকাদা থেকে তলোয়ারটা তুলে নিল। তারপরই ঘুরে দাঁড়াল থমকে দাঁড়িয়ে পড়া দু’টির দিকে। মশালের আলোয় ফ্রান্সিসের জলকাদা মাখা রুদ্রমূর্তি দেখে রক্ষী দু’জন ভয় পেল ঠিকই কিন্তু ওরাও তো এরকম তলোয়ারের লড়াই অনেক লড়েছে। দুজনই একসঙ্গে ফ্রান্সিসের দিকে লাফিয়ে এলো। একজন তলোয়ার চালাল ফ্রান্সিসের গলা লক্ষ্য করে। ফ্রান্সিস দ্রুত মাথা নামিয়েই ঐ রক্ষীটার বুকে তলোয়ার বিঁধিয়ে দিল। অন্যটা এগিয়ে আসতেই ফ্রান্সিস প্রচন্ড জোরে ওর তলোয়ারে নিজের তলোয়ারের ঘা মারলো। রক্ষীটির হাত থেকে তলোয়ার ছিটকে গেল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে ওর ঘাড়ে তলোয়ারের বাঁট দিয়ে ঘা মারল। লোকটা জলকদার মধ্যে ঝন্ শব্দ তুলে পড়ে গেল। জল, কাদা ছিটকালো। কাদায় চোখ ঢেকে গেল রক্ষীটির। ওদিকে শাঙ্কো যেটাকে গলা চেপে ধরেছিল সেটার মুখ দিয়ে কোনো শব্দই বেরোচ্ছিল না। কিন্তু হ্যারি যেটাকে চেপে ধরেছিল সেটার মুখ দিয়ে তখনও গোঁ গোঁ শব্দ বেরোচ্ছিল। উপায় নেই ফ্রান্সিস ভাবল। এটাকে নিকেশ করতেই হবে। তলোয়ার চালিয়ে করলোও তাই। ফ্রান্সিস দুতিনপা দ্রুত এগিয়ে শাঙ্কোকে বলল—ছেড়ে দাও। শাঙ্কো রক্ষীটার গলা ছেড়ে দিল। রক্ষীটা তখন মুখ হাঁ করে হাঁপাচ্ছে। ওর গলায় তলোয়ারের ফলাটা ঠেকিয়ে ফ্রান্সিস বলল—হ্যারি, ওকে বলো তো টু শব্দটি করলে ওকে মেরে ফেলব। হ্যারি তখন হাঁপাচ্ছে। মুখ নীচু করে লোকটার কানের কাছে হ্যারি লো লাতিন ভাষায় বলল—একেবারে শব্দ করবেনা। শব্দ করলেই তোমাকে মেরে ফেলা হবে। রক্ষীটি হ্যারির কথা বুঝল। ফ্রান্সিস তলোয়ার নাচিয়ে ওকে উঠে বসতে বলল। রক্ষীটি উঠে বসল। ফ্রান্সিস আবার তলোয়ার নাচিয়ে উঠে দাঁড়াতে বলল। রক্ষীটি হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে দাঁড়াল। ওর পিঠে তলোয়ার ঠেকিয়ে ফ্রান্সিস বলল—শাঙ্কো, সব বন্দিদের দড়ি কেটে দাও! তাড়াতাড়ি, ফ্রান্সিস তলোয়ারের বাঁট দিয়ে রক্ষীটার মাথায় আঘাত করতে রক্ষীটা অজ্ঞান হয়ে গেল।
