দাঁড়াও—কালকের দিনটা দেখি। কত লোকজন এদের-সেটা এখনও বুঝতে পারছি না। এখানে আমরা সবাই তো নিরস্ত্র। ওদের সংখ্যাটা কত, অস্ত্রশস্ত্র কেমন সেটা আগে আঁচ করে নি। তারপর পালাবার ছক কষবো—ফ্রান্সিস বলল।
ভোর হলো। একটা ঠাণ্ডা হাওয়া বইতে শুরু করল। অনেক বন্দিই তখন ঘুম ভেঙে বসেছে। কেউ লোহার খুঁটিতে কাঁধ রেখে মুখ ঝুঁকিয়ে ঘুমিয়ে আছে তখনও।
সকালের আলো পড়ল বন্দিশালায়। এবার স্পষ্ট দেখা গেল বন্দিশালার নারকীয় পরিবেশ। কারো গায়ে ছেঁড়াখোঁড়া জামা, অনেকেরই খালি গা—শুধুমাত্র কৌপিনের মতো কোমর পরা কাপড়ের টুকরো।
শাঙ্কোর পাশেই শুয়েছিল একটা বিশাল চেহারার কাফ্রি। সে ঘুম ভেঙে উঠে বসল। বিরাট এক হাই তুলল। তারপর শাঙ্কোকে নতুন মানুষ দেখে জিজ্ঞেস করল-জালে ধরা পড়লে কী করে?
কথাটা বুঝল না শাঙ্কো। আঙ্গুল দিয়ে হ্যারিকে দেখাল। লোকটা হাসল। এবার হ্যারিকে লোল্যানি ভাষায় জিজ্ঞেস করল—কোথাকার লোক তোমরা? এক নরক কুন্ডে এসে জুটলে কী কবে?
কথাটা আঞ্চলিক ভাষা মেশানো। তবে হ্যারি মোটামুটি বুঝল, বলল যে ওরা ভাইকিং জাহাজে জলাভাব—ইগনোতি জলের হদিশ দিতে ওদের নিয়ে এসেছিল। ইগনোতি নামটা শুনে লোকটার মুখ কঠিন হলো। কপালের শিরা ফুটে উঠল। বলল ইগনোতি একটা নরকের কীট। সুযোগ পেলে ওটাকে আমি হাতের কাছে যা পাবো, তাই দিয়ে হত্যা করবো।
-ইগনোতিরই তাহলে এই জঘন্য কাজ? হ্যারি বলল।
—হ্যাঁ। এই দরিয়া দিয়ে যেসব জাহাজ যাতায়াত করে ও মাঝেমাঝেই জাহাজডুবির গল্প ফেঁদে সেইসব জাহাজে আশ্রয় নেয়। অসহায় মুমূষু মানুষকে দেখে লোকের তো করুণা হবেই। ওরা ওকে জাহাজে তুলে নেয়। এটাই হল ইগনোতির আসল কাজ। গোপনে। ও জাহাজের মজুত জলভান্ডার থেকে জল ফেলে দেয়। তখন জাহাজটিতে জলের হাহাকার পড়ে যায়। তখন ও পরামর্শ দেয় কাছেই জল পাওয়া যাবে। সেই জলের হদিশ ও জানে। ওকে বিশ্বাস করে ওর দেখানো পথ দিয়ে নাবিকেরা আসে আর এই ক্রীতদাস ব্যবসায়ী সেসব লোককে এখানে বন্দি করে রাখে আর ক্রীতদাস কেনাবেচার বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেয়। ততদিন পর্যন্ত এই বন্দিদের দেখাশুনো করে—যাতে মরে না যায়, তার ব্যবস্থা করে। মরে গেলেই তো ক্ষতি। আমাদেরও সেভাবেই আনা হয়েছে এখানে।
হ্যারি কথাগুলো ফ্রান্সিসকে বলল। ফ্রান্সিসের মুখ রাগে লাল হয়ে গেল। কি সাংঘাতিক ইগনোতি লোকটা। ক্রুদ্ধস্বরে বলল—ওটাকে কায়দায় পেলে আমি নিকেশ করবো।
একটু পরেই সকালের খাবার আনা হলো। একজন পাহারাদার ঠং-ঠুং শব্দে লোহার দরজা খুলে দিল। বন্দিরা উঠে বসল। অনেকে আগে থেকে বসেও ছিল।
একজন রক্ষী একরকমের লম্বা পাতা ধুলোভরা মেঝেয় পেতে দিয়ে গেল। অন্যজন গোল করে কাটা রুটি পাতায় দিল। অন্যজন দিয়ে গেল আলু, আনাজপাতা মেশানো ঝোলমতো। দু’হাত বাঁধা অবস্থাতেই বন্দিরা দু’হাতের মুঠো দিয়ে রুটি খেতে লাগল। ফ্রান্সিস দেখল সেটা। বুঝল বন্দিরা এভাবে খেতেই অভ্যস্ত। কিন্তু ফ্রান্সিসের এটা সহ্য হলো না। ও দু’পায়ে পাতাসুদ্ধ খাবার ছিটকে ফেলল। একজন রক্ষী তেড়ে এলো। ফ্রান্সিস লোহার খুঁটিতে বাঁধা হাত নিয়েও উঠে দাঁড়াল। চিৎকার করে বলল—আমরা কি জানোয়ার? জানোয়ারের মতো খাবার খাবো?
রক্ষীটা ফ্রান্সিসের কথা বুঝল না কিন্তু ওর এই উগ্রমূর্তি দেখে একটু থমকাল। বুঝে উঠতে পারলো না কি করবে। ফ্রান্সিস রুখে দাঁড়াতে হ্যারি আর শাঙ্কোও উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল-ও-হো-হো। দেখাদেখি অন্য বন্দিরাও চিৎকার চ্যাঁচামেচি শুরু করল। রক্ষীরা বেশ ভয় পেয়ে গেল।
দাসব্যবসায়ী বোধহয় ফ্রান্সিসের চ্যাঁচামেচি শুনেই সেই বলিষ্ঠদেহী লোহার জালঘেরা জায়গাটায় এলো। বলল-কি হয়েছে?
রক্ষীরা ফ্রান্সিসদের বিরুদ্ধতার কথা বলল। লোকটা একটু ভেবে। বলল—ঠিক আছে—একজন করে হাত খুলে দিয়ে খেতে দিবি। আর অন্য রক্ষীরা তলোয়ার হাতে পাহারায় থাকবি—কথাটা বলে চলে গেল। এবার এক একজন বন্দিকে হাতের দড়ি খুলে খুলে খেতে দেওয়া হলো। ফ্রান্সিস এবার খেলো। এই খাওয়ার ব্যবস্থায় বেশ দেরি হলো। সবার খাওয়া হলে এককোণের একটা বড় পিপে থেকে কাঠের পাত্রে জল ভরে এনে জল খাওয়ানো হলো। অন্য রক্ষীটি প্রত্যেকের হাত খাওয়া হয়ে যাওয়ার সঙ্গেই দড়ি বেঁধে দিতে লাগল।
দরজার দুটো তালা বন্ধ করে দিয়ে রক্ষীরা চলে গেল। সময় কাটতে লাগল। ফ্রান্সিসের মাথায় চিন্তা। যখন জল খাচ্ছিল তখনই মনে পড়ছিল—মারিয়া আর বন্ধুদের তৃষ্ণার্ত মুখের কথা। তৃষ্ণার্ত হওয়া সত্ত্বেও সামান্য জল খেল।
—পাশে আধশোয়া হ্যারি বলল-কি করবে ফ্রান্সিস ?
—রাত নামার জন্যে অপেক্ষা করছি-ফ্রান্সিস বলল।
—রাতে তো পাহারাদার সৈন্যদের সংখ্যা বাড়ে—হ্যারি বলল।
—দেখি সন্ধের পর ক’জন থাকে—ফ্রান্সিস বলল।
দুপুরে সকালের খাওয়ার মতোই ফ্রান্সিসরা একে একে খোলা হাতে খেলো। বড় আকারের রুটি আর আলু আর কিসব সবজি মেশানো পাখির মাংস। খেতে খেতে ফ্রান্সিস বেশ আইহলো—সুস্বাদু রুটি। কেক-এর মতো স্বাদ। ঝোলও তাই, মাংসের পরিমাণও বেশি। খেতে খেতে ফ্রান্সিস মৃদু হাসল ক্রীতদাস কেনাবেচার হাটে বিক্রি করতে গেলে সুস্থ আর বলশালী মানুষদের দাম বেশি পাওয়া যাবে। তাই এত সুখাদ্যের আয়োজন।
