উপায় নেই দোনিয়া। জাহাজের এতগুলো মানুষের তো খাবার জল চাই। এই অচেনা অজানা জায়গায় কোথায় খুঁজে পাবো জল। একমাত্র ইগনোতিই পারে ঠিক জলের সন্ধান দিতে—ফ্রান্সিস বলল।
দোনিয়া শুধু বলল সাবধানে থাকবেন। পিপে বসানো নৌকোটায় শাঙ্কো উঠল। অন্য নৌকোটায় ফ্রান্সিস আর হ্যারি দাঁড় টেনে চলল ওরা। তখন চাঁদের আলো বেশ উজ্জ্বল। ঢেউয়ের ওপর চাঁদের আলো চিকচিক্ করছে। সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।
তীরের কাছাকাছি একটা জায়গা আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে ইগনোতি বলল—ঐ জায়গায় নামতে হবে। হ্যারি ফ্রান্সিসকে বলল সেকথা। ফ্রান্সিস সেই ঢালু জায়গাটায় নৌকো লাগিয়ে। নামল তিনজনে। বেশ ভেজা কাদামাটি। জোয়ারের সময় বোধহয় ডুবে যায়। কাদার ওপর দিয়ে চলল তিনজনে। ফ্রান্সিস ঠিকই করেছিল আগে জলের জায়গাটার হদিশ করবে। তারপর ফিরে এসে পিপেগুলো নিয়ে যাবে।
কাদায় পা ডুবে যেতে লাগল। একটু এগোতেই আর কাদা নেই, শক্ত জমি। ফ্রান্সিস লক্ষ্য করল ওখান থেকে একটা সরু পায়ে চলা পথের মতো, তার মানে এই পথটা দিয়ে লোকজনের যাতায়াত আছে।
একটু এগিয়েই গাছপালার জঙ্গল। অবশ্য পথটা দেখা যাচ্ছে চাঁদের আলোয়। চলল ওরা। উত্রাই পড়ল। ফ্রান্সিস ভাবল—তার মানে এখানে পাহাড়-টাহাড় মতো আছে। পাহাড়ি এলাকায় ঝর্ণার জল পাওয়া যাবে।
উৎরাই শেষ হতেই দেখা গেল একটা পাথরের লম্বাটে ঘর। ঘরের গরাদ দেওয়া জানালায় আলোর আভাস নেই। ফ্রান্সিস ঠিক বুঝল না জায়গাটা বসতি এলাকা কিনা। একটাই মাত্র ঘর। ওরা ঘরের কাছকাছি আসতেই হঠাৎ ঐ ঘরটা থেকে দ্রুতপায়ে কারা ছুটে আসতে লাগল। ফ্রান্সিসরা নিরস্ত্র অবস্থায় এসেছিল। জল খুঁজতে সঙ্গে তলোয়ার আনা প্রয়োজন মনে করে নি। শাঙ্কো বিপদ আঁচ করে সঙ্গে সঙ্গে জামার গলার মধ্যে বড় ছোরাটা কোমর থেকে খুলে ভেতরে ঢুকিয়ে রাখল।
লোকগুলো তখন অনেক কাছে এসে পড়েছে। চাঁদের আলোয় ওদের হাতের খোলা তলোয়ার যেন ঝলসে উঠছে। ফ্রান্সিসের মনে পড়ল দোনিয়ার কথা। কিন্তু তখন আর কিছু করার নেই। ফ্রান্সিস চাপাগলায় বলল-কেউ বাধা দিওনা।
লোকগুলো মূরজাতীয়, কাফ্রিও আছে। বিশাল বলিষ্ঠ শরীর। হ্যারি চিৎকার করে লো ল্যাতিন ভাষায় বলল—আমরা লড়াই চাইনা, আমরা নিরস্ত্র। ওদিকে ইগনোতিকে দেখা গেল নিশ্চিন্তে একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। যোদ্ধার দল তখন ফ্রান্সিসদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে। ইগনোতি ওদের কি বলল। যোদ্ধার দল তলোয়ার নামাল। তারপর ফ্রান্সিসদের পেছনে এসে ঘিরে দাঁড়াল। একজন যোদ্ধা তলোয়ার উঁচিয়ে ওদের সেই পাথরের বাড়ির দিকে যেতে ইঙ্গিত করল।
ফ্রান্সিসদের ঘিরে নিয়ে চলল সবাই। এবার ইগনোতির দিকে ফ্রান্সিসের নজর পড়ল। ফ্রান্সিস হ্যারিকে বলল—ইগনোতিকে বলো তো, ও এই অমানবিক কাজটা করল কেন?
হ্যারি কথাটা ইগনোতিকে বলল। ইগনোতি কথাটার খুব একটা গুরুত্ব দিল না। আসলে ওর মতলব তো হাসিল হয়েছে। ওর কাজই হলো ওদের দাস ব্যবসায়ীদের কাছে লোকজন ধরে আনা। তারজন্যে ও মূল্য পায়। সেইজন্যেই এভাবে ও মানুষ ধরার জাল ফাঁদে।
ফ্রান্সিসদের সেই ঘরে ঢোকানো হলো। দেখা গেল অনেক যোদ্ধা ঘরটায় শুয়ে-বসে আছে। এককোণে কাপড় ঢাকা গদীমতো। একজন বেশ বলিষ্ঠ লোক শুয়ে আছে। ফ্রান্সিসদের দেখেই লোকটা উঠে বসল। যোদ্ধাদের দিকে তাকিয়ে লো লাতিন ভাষায় বলল—ভালো শিকার ধরেছিস। চড়া দামে বিকোবে। বলল-তোর পাওনা নিয়ে যাস। ইগনোতি দাঁত বের করে হাসল।
তলোয়ারের ডগা দিয়ে একরকম ঠেলেঠুলে রক্ষীর দল ফ্রান্সিসদের নিয়ে চলল ঘরটার বাইরে। ঘরটার বাইরে আসতেই দেখা গেল কাঠের মোটা খুঁটি পুঁতে মোটা লোহার জাল মতো। তার মধ্যে দিয়ে হাত গলে যাবে মাথা গলবে না।
অন্ধকারে পশুর খাঁচার মতো লাগছে দেখতে। একজন রক্ষী গিয়ে দু’দিকের দুটো তালা খুলে ফেলল। ফ্রান্সিসদের ঠেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। দড়ি দিয়ে লোহার সঙ্গে ফ্রান্সিসদের হাত বেঁধে দরজা বন্ধ করে চলে গেল।
এতক্ষণে ফ্রান্সিস ভেতরটা দেখল। অন্তত জনা দশ-পনেরো লোক ওদের মতোই বন্দি অবস্থায় বসে আছেনয়তো লোহার খুঁটির ওপর এলিয়ে পড়ে আছে। তাদের গায়ে শতছিন্ন পোশাক। তবে অধিকাংশই সুস্থদেহী। কারণটা ফ্রান্সিস অনুমান করল। ঐ বলিষ্ঠ লোকটা দাস ব্যবসায়ী। সুস্থ দাস ভালো দামে বিক্রি হবে। কাজেই সুস্থ রাখা চাই। কিছু বন্দি আবার রোগাক্রান্ত। বোঝাই যাচ্ছে ভয়ানক অসুস্থ। অন্ধকারে এক নরকের মতো দৃশ্য। পায়ের নীচে মাটি লালচে। বন্দিদের পায়ের চাপে ধুলোটে।
ফ্রান্সিসরা বসে পড়ল। বন্দিরা কাছাকাছি দেশগুলোর লোক, কাফ্রিও আছে। সংখ্যায় তারাই বেশি। ফ্রান্সিস অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বুঝল পাহারাদারের সংখ্যা অন্তত ছ’সাতজন। বোধহয় আগে কিছু বন্দি পালিয়েছিল। তাই এত কড়াকড়ি।
ওদিকে তার এক চিন্তা। জাহাজে পানীয় জল ফুরিয়ে এসেছে। ওরা তে পিপে ভরে জল নিয়ে যেতে পারলনা। কালকে থেকেই হয়তো নির্জলা কাটাতে হবে ওদের। এতগুলো মানুষ জন্তুজানোয়ারের মত শুয়ে-বসে আছে। কেউ কথা বলছে না মৃতদেহের স্তূপ যেন নিস্তব্ধ চারদিক।
—শাঙ্কো মৃদুস্বরে বলল—ফ্রান্সিস ছোরা লুকিয়ে রেখেছি। কি করবে?
