দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষ হলো। জলের পরিমাণ আরো কমে গেল।
ফ্রান্সিসের চিন্তা বাড়ল। ওদিকে কোনোরকমে খাওয়াদাওয়া সেরেই পেড্রো মাস্তুলেরওপরে গিয়ে নিজের জায়গায় বসে পড়েছে। নজর রাখছে চারদিকে যদি ডাঙার দেখা পাওয়া যায়।
সন্ধে হয়ে এলো। অন্ধকার তেমন ঘন নয়। একটু পরেই পূর্ব দিগন্তের দিকে অনুজ্জ্বল চাঁদটা উজ্জ্বল হতে লাগল। চাঁদের আলো ছড়ালো সমুদ্রের বুকে।
জাহাজ চলেছে। তখনও ডাঙার দেখা নেই।
রাতের খাওয়াদাওয়ার সময় হলো। এবার জলের পরিমাণ কমে যাওয়ার কথা ফ্রান্সিস সবাইকে জানাবে ভাবল। হ্যারিকে বলল সে কথা। হ্যারি বলল-তাহলে কি সবাইকে ডেক-এ আসতে বলবো?
ফ্রান্সিস বলল—বেশ—সবাইকেই তো সমস্যাটার কথাটা জানাতে হবে।
হ্যারি সবইকে খবর দিল। আস্তে আস্তে ভাইকিং বন্ধুরা এসে ডেক-এ জড়ো হলো। ফ্রান্সিস হ্যারিকে নিয়ে উঠে এলো ডেক-এ। বন্ধুরা তখনও পরস্পরের সঙ্গে কথা বলছিল ফ্রান্সিস আর হ্যারি আসতেই চুপ করলো সবাই। ফ্রান্সিস বলতে লাগল—ভাইসব, তোমরা এরমধ্যেই নিশ্চয়ই জেনেছো যে জাহাজে জলাভাব দেখা দিয়েছে। কিভাবে জল এত তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে গেল আমরা জানি না। যাহোক—সবাইকে অনুরোধ জানাচ্ছি জল যতটা সম্ভব কম খাবে। যেটুকু জল আছে তাতে যে কটা দিন সম্ভব চালাতে হবে। এই কষ্টটুকু সবাইকে স্বীকার করে নিতে হবে। ফ্রান্সিস থামল।
বন্ধুদের একজন বলল—কিন্তু জল না খেয়ে আমাদের কতদিন আর চলবে।
ফ্রান্সিস বলল—আমরা জেনেছি যে কর্সিকা দ্বীপ কাছেই। ওখানে পৌঁছতে পারলে আমরা জল সংগ্রহ করতে পারবো। ততক্ষণ পর্যন্ত বুক দিয়ে তোমাদের কষ্ট স্বীকার করতে হবে। জলতৃষ্ণা সহ্য করতে হবে। বন্ধুরা সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠল-ও-হো-হো। সভা ভেঙে গেল।
রাতের খাওয়াদাওয়ার পর সব ভাইকিং বন্ধুরাই অল্প করে জল খেল। কেউ কেউ খেল না। রাত বাড়তে লাগল। সব ভাইকিং বন্ধুরা ঘুমিয়ে পড়েছে। ফ্রান্সিসের চোখে ঘুম নেই। ও কেবিনঘরের বিছানায় এই শুয়ে পড়ছে পরক্ষণেই উঠে পড়ছে। ডেক-এ উঠে আসছে, পূর্বদিকে তাকিয়ে থাকছে। মারিয়া লক্ষ্য করল সেটা। ডেক থেকে ফ্রান্সিস ফিরে আসতে মারিয়া জিজ্ঞেস করল—বারবার উঠে পড়ছ কেন।
ফ্রান্সিস বলল—জানো তো জাহাজে পানীয় জল ফুরিয়ে আসছে। ডাঙায় পৌঁছাতেই হবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।
তখনই পেড্রো চেঁচিয়ে বলে উঠল—ডাঙা—ডাঙা, দেখা যাচ্ছে। ডেক-এ শুয়ে থাকা কয়েকজন ভাইকিং-এর কানে গেল কথাটা। ওরা রেলিঙের ধারে এলো। দেখল, চাঁদের কুয়াশার মধ্যে দিয়ে অস্পষ্ট উঁচু-নীচু ডাঙা দেখা যাচ্ছে।
একজন ভাইকিং ছুটল ফ্রান্সিসকে খবর দিতে। খবর পেয়েই ফ্রান্সিস হ্যারিকে গিয়ে ডেকে তুলল। চিন্তায় হ্যারি রও ঠিক ঘুম আসছিল না। দু’জনেই ডেক-এ উঠে এলো। রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে দেখল উঁচু-নিচু ডাঙা। কিন্তু জাহাজ কোথায় ভেড়ানো হবে জলের হদিশ কোথায় পাওয়া যাবে? ফ্রান্সিস হ্যারিকে বলল সেকথা। হ্যারি বলল—এখন ইগনোতির সাহায্য নিতে হবে। ওকে ডেকে আনছি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই হ্যারি ইগনোতিকে ডেকে নিয়ে এলো। হ্যারি বলল—ইগনোতি, ঠিক কোন্ জায়গাটায় নামলে আমরা খাবার জলের হদিশ পাবো? তুমি চিনে নিয়ে ঠিক
জায়গাটা বের করতে পারবে?
ইগনোতি তীরভূমির দিকে তাকিয়ে নিয়ে বলল—আরো কাছে যেতে হবে। জাহাজটা আস্তে আস্তে তীরভূমির অনেকটা কাছে চলে এলো। ইগনোতি তীরভূমির দিকে তাকিয়ে থেকে বলল—ঐ যে টিলার মাথায়, ঝাঁকড়া গাছের জঙ্গল ওখানটায় নামতে হবে। ওখান থেকে কিছুটা গেলেই ছোট পাহাড়ি ঢল। ওখানে একটা ঝর্ণও আছে।
হ্যারি কথাটা ফ্রান্সিসকে বুঝিয়ে বলল।
জাহাজটা ততক্ষণে টিলার কাছাকাছি এসেছে। জাহাজ আর যেতে পারবে না। ফ্লইজার ততক্ষণে জাহাজ থামিয়েছে। ফ্লাইজারের কাছে এলো ফ্রান্সিস বলল—জাহাজ কি তীরে ভেড়ানো যাবেনা?
ফ্লাইজার বলল—এখানে জলের গভীরতা নেই। মাটিতে জাহাজ আটকে গেলেই বিপদে পড়তে হবে।
ফ্রান্সিস এসে হ্যারিকে বলল—জাহাজ আর যাবেনা। নৌকোর পিপে নিয়ে জল আনতে যেতে হবে। তুমি ইগনোতিকে সেকথা বলো। হ্যারিই ইগনোতিকে কথাটা ব। তারপর বলল—আমরা নৌকোয় চড়ে জল আনতে যাবো। তুমি আমাদের সাহায্য করতে পারবে?
ইগনোতি মাথা কাত করে জানালো পারবে। তারপর জাহাজটা যখন টিলার কাছে এলো তখন ইগনোতি হাত দিয়ে একটা জংলা গাছের মাথা দেখাল।
এবার তিনটে পিপে একটা নৌকোয় তোলা হলো। অন্য পিপেটায় এখনও সামান্য জল রয়েছে। কষ্ট করে হলেও দু’একটা দিন তো যাবে। ওটা আর ওরা নেবে না ঠিক করল।
যখন ফ্রান্সিস, শাঙ্কো আর হ্যারি ওদের নৌকোয় নামতে যাবে, তখনই দোনিয়া এলো। দোনিয়া ইগনোতিকে আশ্রয় নেবার ব্যাপারটা জানতো না। তাই ইগনোতিকে ফ্রান্সিসদের সঙ্গী হতে দেখে দোনিয়া ফ্রান্সিসকে ইগনোতির কথা জিজ্ঞেস করল। ফ্রান্সিস ইগনোতির জাহাজডুবি হয়ে এসে ওদের জাহাজ আশ্রয় নেওয়ার কথা বলল। দোনিয়া এবার ইগনোতির দিকে তাকাল। দেখল—এখানকার চাষিদের মতোই ওর পোশাক। দোনিয়া ইগনোতির সঙ্গে কথা বলতে লাগল। একটু আঞ্চলিক ভাষার মিশেল থাকায় হ্যারি ঠিক বুঝল না। দোনিয়া কথা শেষ করে ফ্রান্সিসদের কাছে এসে বলল—লোকটার কথাবার্তা শুনলাম। আমার কেমন সন্দেহ হচ্ছে—লোকটা ঠিক কথা বলছে না। আপনাদের বিপদ হতে পারে।
