ফ্রান্সিস, হ্যারির দিকে তাকাল। বলল ওর খাওয়া-দাওয়া বিশ্রামের ব্যবস্থা করো, পরে শুনবো সব।
ভেন-এর ওষুধ খেয়ে দুপুরে খেয়েদেয়েই ইগনোতি সন্ধের আগেই অনেকটা সুস্থ, হলো। হ্যারি ইগনোতির সঙ্গে কথাবার্তা বলে জানতে পারল—রাতের ঘন কুয়াশার মধ্যে ওদের জাহাজ একটা ডুবো পাহাড়ের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ডুবে গিয়েছিল। ও নিজে একটা ধাক্কা খেয়ে আধভাঙা নৌকোয় চড়ে। কোনোরকমে সমুদ্রে ভেসে পড়েছিল। কতদিন নৌকোয় ছিল, সেটা ইগনোতির মনে নেই।
রাতে খাওয়াদওয়ার পর সবাই শুয়ে পড়েছে। বিকেল থেকেই বাতাসের জোর বেড়েছে। দাঁড় বাইতে হচ্ছেনা। যে কেবিনঘরে ইগনোতিকে রাখা হয়েছিল সেই কেবিনঘরে চারজন ভাইকিং ছিল। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিল।
হঠাৎ কেবিনঘরের দরজায় ঠক্ করে শব্দ হতে একজন ভাইকিং-এর ঘুম ভেঙে গেল। দেখল অন্ধকারে ইগনোতি দরজা বন্ধ করছে। তারপর বিছানায় এসে শুয়ে পড়ল। একবার ভাইকিংটি ভাবল ইগনোতিকে জিজ্ঞেস করে ও বাইরে গিয়েছিল কিনা। কিন্তু ইগনোতি তো ওর ভাষা বুঝবে না। কাজেই ভাইকিংটি পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
ভোর হলো। সকালের খাওয়াদাওয়া চলছে তখনই রাঁধুনি ভাইকিংটি খাবার জলের পিপের ঢাকানা খুলে দেখল জল তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। পরপর সাজানো চারটে পিপের একটিতে কম জল ছিল। ও বুঝে উঠতে পারল না জল এত কমে গেল কি করে। রান্নার জায়গার পাশে যেখানে জলের পিপেগুলো রাখা হয়, সেখানে দেখা গেল জায়গাটা জলময় হয়ে গেছে। এত জল নষ্ট হলো কি করে? রাঁধুনি ভাইকিং ওর সাহায্যকারী ভাইকিং বন্ধুকে বলল সেকথা। দুজনেই অবশিষ্ট জলের পরিমাণ দেখে চিন্তায় পড়ে গেল। দু’জনে পিপেগুলো তুলে ঘুরিয়ে দেখল—পিপেগুলোয় ফুটো হয় নি। অথচ এত জল পড়ে গেল কি করে? ওরা ভেবে পেল না কি করে হল এটা।
রাঁধুনি ছুটল ফ্রান্সিসের কাছে। সকালের খাওয়ার পর সবাই তখন জল খেতে চাইছে। রাঁধুনির সাহায্যকারী একটা পিপে থেকে সবাইকে জল দিল। পিপেটা প্রায় খালি হয়ে গেল। ফ্রান্সিস হ্যারিকে নিয়ে রান্নাঘরে এলো। পিপের ঢাকানা খুলে জলের পরিমাণ দেখল। চিন্তায় পড়ল ফ্রান্সিস এখন খাবার জলে টান পড়লে তো বিপদে পড়তে হবে। এতজনের প্রয়োজনীয় জল এখন কোথায় পাওয়া যাবে? ফ্রান্সিস বাঁধুনিকে বলল—পিপের ফাটা জায়গা দিয়ে চুঁইয়ে জল পড়ে যায় নি তো।
রাঁধুনি বলল-না। কোথাও ফাটা চোখে পড়েনি। আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি দোনিয়ার কাছে এলো। খাবর জলের সঙ্কটের কথা বলল। সব শুনে দোনিয়া বলল—এই অঞ্চলটা আমার ঠিক পরিচিত নয়। তবে আমরা বোধহয় কর্সিকা দ্বীপের কাছে এসেছি।
—কর্সিকা দ্বীপের কোনদিকে পড়বে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
—বাঁ দিকে, দোনিয়া বলল—উত্তর কর্সিয়ার থামতে পারলে হয়তো খাবার জল পাওয়া যাবে।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি জাহাজের ডেক-এ উঠে এলো। জাহাজচালক ফ্লাইজারকে এসে বলল-বা দিক মানে পূর্বদিকে জাহাজ চালাও। কালকের মধ্যে যে করে হোক কর্সিকার উত্তরে কোথাও পৌঁছাতে হবে।
—যা জল আছে তাতে আর কটা দিন যাবে না? ফ্লাইজার বলল।
—জলের তেষ্টা নিয়ে ক’দিন কাটানো যায় বলো। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জল জোগাড় করতে হবে—হ্যারি বলল।
—ঠিক আছে—ফ্লাইজার বলল। তারপর দু’তিনজন ভাইকিং বন্ধুকে ডেকে বলল—পাল ঘোরাও, জাহাজ বাঁদিকে ঘুরবে।
বন্ধুরা মাস্তুল বেয়ে পাল খাটানোর কাঠের টানায় উঠে দড়ি টেনে পাল ঘোরানোর কাজে লাগল। ফ্লাইজার ততক্ষণে শক্ত হাতে হুইল ঘোরাতে লাগল। আস্তে-আস্তে জাহাজের মুখ পুবমুখে হলো।
ফ্রান্সিস দড়িতে ধরে পা রেখে মাস্তুলের কিছুটা ওপরে উঠে। চেঁচিয়ে ডাকল-পেড্রো।
পেড্রো নীচের দিকে তাকাতে। ফ্রান্সিস বলল-ডাঙা দেখলেই বলবে।
পেড্রো চেঁচিয়ে বলল—ঠিক আছে।
ফ্রান্সিস মাস্তুল বেয়ে নেমে এলো। হ্যারি বলল—দাঁড় টানতে হবে। এখন গতি অনেক বাড়াতে হবে।
—তা’ ঠিক, কিন্তু হ্যারি-বন্ধুরা যারা দাঁড় টানবে তারা অল্পক্ষণের মধ্যে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়বে। বারবার জল খেতে চাইবে। বেশি জলের চাহিদা মেটাতে এই জলটুকুও ফুরিয়ে যাবে—ফ্রান্সিস বলল।
হ্যারি সঙ্গে সঙ্গে বলল—সত্যি এটা আমি ভাবিনি।
—কাজেই গতি বাড়াবার প্রশ্ন নেই। এখন বাতাসই ভরসা। ফ্রান্সিস বলল।
এবার হঠাই ফ্রান্সিসের মনে হলো—আচ্ছা ইগনোতিকে জিজ্ঞেস করে এলাকার কোথায় জল পাওয়া যাবে তার হদিশ করা যায় কিনা।
ফ্রান্সিস বলল—হ্যারি চলো তো, ইগনোতিকে জিজ্ঞেস করা যাক ও কোনোভাবে আমাদের সাহায্য করতে পারে কিনা।
দু’জনেইগনোতিকে যে কেবিনঘরে রাখা হয়েছে সেই ঘরে এলো। দেখল—ইগনোতি অনেক সুস্থ এখন। তবে কথাবর্তা বলছে না। কার সঙ্গেই বা কথা বলবে। ওর কথা তো কেউ বুঝবে না। হ্যারিইগনোতিকে জিজ্ঞেস করল—আচ্ছা ইগনোতি—আমরা কি কর্সিক দ্বীপের কাছাকাছি এসেছি?
—তা তো ঠিক বলতে পারবো না তবে কর্সিকা দ্বীপের উত্তর দিকটা আমি মোটামুটি চিনি। এখানে আমি অনেকবার ব্যবসার ব্যাপারে এসেছি।
—তরে তো এখানে কোথায় জল পাওয়া যাবে তাও তুমি জানো? হ্যারি বলল।
—হ্যাঁ, জানি-ইগনোতি বলল।
হ্যারি কথাগুলো ফ্রান্সিসকে বলল। ফ্রান্সিস বলল—তাহলে এখন আমাদের কর্সিকা দ্বীপের উত্তরে পৌঁছুতে হবে।
