পিসা নগরের বড় বড় রাস্তা বড় বড় অট্টালিকা, সুবেশ নারীপুরুষদের দেখে মারিয়া যেন আপনমনেই বলল—কটা দিন থাকা যেত না?
পাশে-বসা ফ্রান্সিস হেসে বলল—মারিয়া, তোমার অবস্থা বুঝতে পারছি। কিন্তু মূর্তি উদ্ধার ছাড়া আমি এখন আর কিছুই ভাবতে পারছি না।
বিকেল নাগাদ ফ্রান্সিসরা জাহাজঘাটায় এলো। ভাইকিং বন্ধুরা সবাই তখনও ফেরেনি। ফ্রান্সিসের চিন্তা হলো। ও চাইছিল তাড়াতাড়ি সার্দিনিয়া ফিরে যেতে। অনেক কাজ বাকি। এত চিন্তাভাবনা করে সূত্র যখন একটা পাওয়া গেছে, দেখা যাক পরীক্ষা করে। কিন্তু বন্ধুরা কতদিন পরে পিসার মতো একটা জমকালো নগর দেখছে। ওদের তো সাধ হচ্ছে ঘুরে বেড়াতে। একটু আনন্দ ফুর্তি তো করবেই।
অগত্যা কেবিনঘরে ফিরে ফ্রান্সিস কাঠের দেয়ালে পিঠ দিয়ে বসল। বন্ধুদের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল।
মারিয়া জাহাজের রেলিং ধরে পিসার জাহাজঘাটায় লোকজন দেখতে লাগল।
সন্ধের সময় বন্ধুরা দু’জন চারজন দল মিলে ফিরে আসতে লাগল।
হ্যারি এলো ফ্রান্সিসের কাছে। বলল—সবাই তো আরো দু’একদিন এখানে থাকতে চাইছে। ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলল—অসম্ভব। সবাই ফিরলেই জাহাজ ছাড়তে হবে।
রাতের খাওয়াদাওয়ার আগেইসব ভাইকিং বন্ধুরা ফিরে এলো। ফ্রান্সিসের কথা শুনল সবাই। উপায় নেই, ফ্রান্সিস বলেছে। কাজেইখুবইচ্ছে থাকলেও এইনগরে আর থাকা যাবেনা।
রাতের খাওয়াদাওয়া শেষ হতে ঘর ঘর শব্দে নোঙর তোলা হলো। বাতাসের তেমন জোর নেই। পাল খাটানো হলো। সব পালগুলো। কিন্তু জাহাজ ধীরে চলল! ফ্রান্সিস তখন ডেক-এ উঠে এসেছে। বুঝল, জাহাজের গতি বাড়াতে হবে। ও বিস্কোকে ডেকে বলল—দাঁড় বাইতে বলো। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের সার্দিনিয়া পৌঁছাতে হবে।
সারারাত জাহাজ চলল। কিন্তু বাতাসের জোর বাড়ল না। দাঁড় টেনে যতটা জোরে চলার চলল। মাস্তুলের মাথায় নজরদার পেড্রো চারদিকে নজর রাখতে লাগল। বলা যায়
-জলদস্যুদের পাল্লায় পড়তে হতে পারে। আগে থেকে বুঝতে পারলে সাবধান হওয়া যাবে। তাছাড়া দোনিয়া বলছে এই অঞ্চলে ক্রীতদাস ব্যবসায়ীদের অস্তানা আছে। কাজেই চারদিকে নজর রাখা—আগে থেকে সাবধান থাকা।
পূর্ব আকাশে রঙ ফিরতে লাগল। লাল হয়ে উঠল। একটু পরেই সূর্য উঠল। সকালের নরম আলো সমুদ্রের ঢেউয়ের ওপর ছড়ালো। ঠাণ্ডা হাওয়া বইতে লাগল। কিন্তু হাওয়ার জোর বাড়ল না।
হঠাৎ পেড্রোর নজরে পড়ল পূর্বদিকে বেশ দূরে একটা নৌকো ভাসছে। পেড্রো ভালোভাবে চোখ কুঁচকে দেখতে লাগল। নৌকোটার একটা ধার ভাঙা। সেদিকে দু’পা ছড়িয়ে একটা মানুষ নৌকোর গলুইয়ে মাথা রেখে শুয়ে আছে। মা মেরিও জানে না মরে গেছে না বেঁচে আছে।
পেড্রো মাস্তুল থেকে নেমে এলো। ডেক-এ শুয়ে থাকা কয়েকজন ভাইকিংদের মধ্যে দু’একজন মাত্র উঠে বসেছে। পেড্রা তাদের ভাঙা নৌকো আর মানুষটার কথা বলল। ওরা রেলিঙের কাছে এসে দাঁড়াল। ঘুম ভেঙে আরো কয়েকজন এসে ভিড় করে দাঁড়াল। পেড্রো এবার ফ্রান্সিসকে খবর দিতে। সব শুনে ফ্রান্সিস ডেক-এ উঠে এলো। ততক্ষণে হ্যারি, বিস্কোরাও খবর পেয়ে ডেক-এ উঠে এলো।
সবাই তাকিয়ে রইল আধাভাঙা নৌকোটার দিকে। একটুক্ষণ তাকিয়ে দেখে নিয়ে ফ্রান্সিস জাহাজচালক ফ্লাইজারের কাছে এলো। ফ্লাইজারকে দূরের আধাভাঙা নৌকোটার দিকে জাহাজ চালাতে বলল। নৌকোটায় একজন মানুষ আছে, ওকে বাঁচাতে হবে।
ফ্লাইজার জাহাজের মুখ ঘোরাল। জাহজ চলল ঐ আধভাঙা নৌকোটার দিকে। কাছাকাছি এলো ফ্রান্সিসরা জাহাজ থেকে দেখল যে নৌকোর একটা ধার ওপরের দিকে হাত দুয়েক ভেঙে গেছে। তবে নৌকোয় জল ওঠে নি, তাই ডুবে যায় নি। ঢোলা হাতা সবুজে রঙের জোব্বামতো গায়ে একটা লোক গলুইয়ে অসাড় পড়ে আছে। সর্বাঙ্গ জলে ভেজা।
ফ্রান্সিস বিস্কোকে বলল—কি ব্যাপার দেখতে। বিস্কো দড়ির মইটা জাহাজ থেকে নৌকোটার কাছে ফেলল। মই বেয়ে নৌকোটার ওপর নেমে এলো। ঢেউয়ের ধাক্কায় দুলছে নৌকোটা। ঐ দুলুনির মধ্যেই বিস্কো লোকটার নাকের সামনে হাত রাখল। ক্ষীণ শ্বাসপ্রশ্বাস বইছে। বসে পড়ে বুকে কান ঠেকাল। মৃদু ধ ধ শব্দ। বিস্কো উঠে দাঁড়াল। রেলিঙের ধারে দাঁড়ানো ফ্রান্সিসদের হাতের ইঙ্গিতে বোঝাল—লোকটা বেঁচে আছে, দড়ির জালমতো ফেলতে বলল।
জাহাজ থেকে সেটা নামিয়ে দেওয়া হলো। বিস্কো দেশ কসরৎ করে লোকটাকে তুলে জালে বসিয়ে দিল। জাহাজ থেকে ভাইকিংরা ওটা ধরে টেনে টেনে তুলতে লাগল। বিস্কো দড়ির মই বেয়ে উঠে এলো।
লোকটাকে প্রথমে ডেক-এর ওপর শুইয়ে দেওয়া হলো। তখনও লোকটা চোখ বুজে রয়েছে। তারপর কয়েকজন মিলে ওকে কেবিনঘরে নিয়ে গেল। ভেজা পোশাক ছাড়িয়ে শুকনো পোশাক পরানো হলো। বৈদ্যি ভেন লোকটার কপালে গলায় নীলমতো মলম মাখিয়ে দিয়ে আঙ্গুল দিয়ে টিপতে লাগল।
একটু পরে একটু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে লোকটা চোখ মেলে তাকাল। ভেন মুখ নীচু করে স্পেনীয় ভাষায় জিজ্ঞেস করল—তুমি কে? কি হয়েছিল তোমার?
লোকটা তাকিয়েই রইল। তারমানে ভাষা বোঝেনি। এবারহ্যারি থেমে থেমে লো লাতিন ভাষায় একইকথা জিজ্ঞেস করল। এবার লো লাতিন ভাষায় লোকটা বলল—জাহাজডুবি।
ফ্রান্সিস ভেনকে বলল—দেখো তো, অসুখটা কেমন?
মারাত্মক কিছু না। অনাহার জল তেষ্টায় কাহিল হয়ে পড়েছে।
