রূপোর থালায় খাবার পরিবেশন করল রাঁধুনি বুড়ি। তদারক করল নোবাইলের মেয়ে। খেতে খেতে কথাবার্তা চলল। নোবাইল দোনিয়াকে জিজ্ঞেস করলেন—আপনাদের পড়াশুনো কতদূর এগোল?
—মনে হচ্ছে বিকেল নাগাদ প্রয়োজনীয় তথ্যটা পেয়ে যাবো—দোনিয়া বলল।
—আজকে থাকবেন তো? নোবাইলের স্ত্রী বললেন।
—উঁহু—এই ভাইকিং বন্ধুদের সঙ্গে এসেছি। ওঁদের সঙ্গেই থাকতে হবে, ওঁদের জাহাজেই থাকবো—দোনিয়া বলল।
ফ্রান্সিস চুপচাপ খেয়ে নিল। একটু তাড়াতাড়ি খেলো, মাথায় চিন্তা তো রয়েইছে। তার ওপর এই জাঁকজমক এই দামি ঝকঝকে বাসনপত্র টেবিল ঢাকনা আর ধনী পরিবারের সামনে—এসব ভালো লাগছিল না। খাওয়া হয়ে গেছে অথচ অভিজাত মহলের ভদ্রতা। উঠে যেতেও পারছে না। একটু ভেবে ফ্রান্সিস নোবাইল ও তার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললো-যদি অনুমতি করেন তাহলে আমি উঠি।
নোবাইলের স্ত্রী কথাটা না বুঝেও অনুমান করলেন। বললেন—আপনি তো প্রায় কিছুই খেলেন না।
লো লাতিন ভাষা। হ্যারি বুঝিয়ে দিলে ফ্রান্সিস হেসে বলল—মানে খুব একটা খিদে নেই। আমাকে মাফ করবেন।
নোবাইল কোনো কথা না বলে মাথা কাত করে সম্মতি জানাল।
ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে উঠে। চলল গ্রন্থাগারের দিকে। গ্রন্থাগারে ঢুকে ও লেখার আসনের কাছে এলো। দোনিয়া যতটুকু লিখেছে দেখল, বুঝল না কিছুই। মোটা কাঠের তাকে ঠেসান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বেশ ক্লান্ত মনে হচ্ছে নিজেকে।
কিছু পরে দোনিয়ার সঙ্গে হ্যারি আর মারিয়া এলো। দোনিয়া নিজের কাজে মন দিল। ফ্রান্সিস একইভাবে দাঁড়িয়ে রইল। হ্যারি দোনিয়ার পাশে বসল। মারিয়া একপাশে দাঁড়িয়ে রইল। এতক্ষণে মারিয়ার দিকে ফ্রান্সিসের চোখ পড়ল। ফ্রান্সিস কাছে এসে বলল—মারিয়া আমার কেমন মনে হয়েছিল মুবারকের চিঠিটা অসম্পূর্ণ। এবার মুবারকের চিঠির একটা খসড়া পাওয়া গেছে। দোনিয়া সেই কাটাকুটি করা খসড়াটা পরিষ্কার করে লিখছে। এখন দেখা যাক খসড়াটায় কি ছিল।
—সবটাই তো তোমার অনুমান—মারিয়া বলল।
—তা ঠিক। তবে খসড়াটা পাওয়া গেছে আর সেটা এখানেই পাওয়া গেছে—কাজেই আমার অনুমান কিছুটা মিলেছে। এখন বাকিটুকু।
ফ্রান্সিস কথাটা বলে আবার কাঠের তাকে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল। গ্রন্থাগার নিস্তব্ধ। কেউ কোনো কথা বলছে না। দোনিয়া নিজের কাজ করে যাচ্ছে। সময় বয়ে চলেছে। হঠাৎ দোনিয়া আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। লেখা কাগজটার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল—ফ্রান্সিস আপনার অনুমান সত্যি!
ফ্রান্সিস প্রায় লাফ দিয়ে দোনিয়ার কাছে এলো। বলল-কি ব্যাপার বলুন তো। হ্যারি ও উঠে দাঁড়াল। মারিয়া দ্রুতপায়ে এগিয়ে এল। চিঠিটাই তো আমার মুখস্থ। সেই চিঠিতে এই কটা পঙক্তি ছুট পড়েছে অর্থাৎ বাদ গেছে।
—সেই পঙক্তিটি বলুন। অধীর আগ্রহে ফ্রান্সিস বলে উঠল। কাগজটা দেখে দেখে দোনিয়া পড়ল—জলে ঝাপাইয়া পড়িবার মুহূর্তে বিদ্যুতের আলোয় বৃষ্টিধারার মধ্যে দিয়ে এক ঝলক ঝাপসা দেখিলাম হাত তিরিশেক দূরে কালো পাথরের বৃষ্টিভেজা দেয়াল মতো।
পড়া শেষ হতেই ফ্রান্সিস লাফিয়ে উঠে। বলল—দেখুন, বলেছিলাম কিনা।
—কিন্তু দেয়াল বলতে কোনো দেয়াল বোঝাচ্ছে? দোনিয়া বলল।
—কেন? ঐ দক্ষিণ দিকের ভাঙা নুরাঘিটার দেয়ালটা—ফ্রান্সিস বলল।
—কিন্তু দক্ষিণ দিকটা মানে খাঁড়ির দিকটা তো প্রায় ধ্বসংস্তূপ—দোনিয়া বলল।
—ভুলে যাবেন না ঘটনাটা দুশো বছর আগেকার। আর ঐ নুরাঘিটা নিশ্চয়ই অটুট অভগ্ন ছিল—ফ্রান্সিস বলল।
—তাহলে—দোনিয়াকে কথাটা বলতে দিল না ফ্রান্সিস নিজেই বলে উঠল—ঐ ভাঙা নুরাঘিটার হাত তিরিশেক দূরে মূর্তিশুদ্ধ নৌকোটা ডুবে গিয়েছিল। এখন আর অতবড় খাঁড়িটার তলায় খুঁজতে হবে না। অল্প জায়গাটা তো পেয়ে গেলাম। এবার আমাদের চেষ্টা পরিশ্রম। এবার হ্যারি বলল—তাহলে ফ্রান্সিস এখন কি করবে?
—যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সার্দিনিয়া ফিরে যাবো-ফ্রান্সিস বলল। তারপর সোনিয়াকে বলল—আপনি নোবাইলকে বলুন—আমরা এখন জাহাজে ফিরে যাবো।
দোনিয়া চলে গেল। আসন থেকে ফ্রান্সিস লেখা কাগজটা তুলে মারিয়াকে দিল। বলল—এটা যত্ন করে কেবিনঘরে রেখে দিও। মারিয়া চিঠির কাগজটা নিল।
বিদায় নেবার সময় হলো। ফ্রান্সিসরা বাড়ির বাইরে এলো। পেছনে নোবাইল, তার স্ত্রীও এলেন। নোবাইল বারবারই বললেন—অতদূর দেশ থেকে আপনারা এসেছেন। আপনাদের সঙ্গে ভালো করে কথাই বলা হলো না। অনুরোধ রইল—দেশে ফেরার আগে একবার এখানে আসবেন।
ফ্রান্সিস হেসে মাথা একটু ঝুঁকিয়ে সম্মান জানিয়ে বলল—আপনার আপ্যায়ন আমরা ভুলবো না। কয়েকদিন থাকতে পারলে আমাদের বিশেষ করে রাজকুমারী মারিয়ার খুব ভালো লাগতো। কিন্তু বিশেষ একটা প্রয়োজনে আমাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরতে হবে।
—না না, আপনাদের দেরি করিয়ে দেওয়া উচিত হবে না—নোবাইল বলল। ফ্রান্সিস চিলতে পথটা ধরে দেউড়ির কাছে এসে দেখল—দরজা খুলে দিয়ে সেই যুবকটি দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রান্সিস যুবকটির পিঠে হাত রেখে মাথা কাত করে বোঝাল ওরা যাচ্ছে। কাফ্রি যুকটি এতক্ষণে হাসল। ঝকঝকে দাঁত ওর। মাথা একটু ঝুঁকিয়ে সম্মান জানাল।
ফ্রান্সিসরা বড় রাস্তায় এলো। দোনিয়ায় এদিক-ওদিক ঘুরে একটা ভাড়াগাড়ি নিয়ে এলো। ফ্রান্সিসরা গাড়িতে উঠে চলল জাহাজঘাটার দিকে।
